অনেক গুণের একজন
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৬:০৮
‘কমলাকান্তের জবানবন্দি’র কথা মনে আছে নিশ্চয়, বেচারাকে কত অজ্ঞের মত প্রশ্ন করেছিলেন সেদিনের আইনজ্ঞ। আজকের চিত্রটা কিন্তু ভিন্ন। আমাদের দেশেই হচ্ছে আইনের উচ্চতর পড়াশোনা। অনেক ছেলেমেয়েরা তাদের মেধায় মননে দেখিয়েছে, কত এগিয়েছি আমরা। এদেরই একজন তামজিদ হাসান। বাংলাদেশ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে সে আইন বিষয়ে, যুক্তির আনন্দে করে চলেছেন বিতর্ক, সৃষ্টির আনন্দে করছেন লেখালেখিও, আঁকতেও কম যান না। বহুগুণের এই তরুণ তাই আমাদের আজকের অন্যতারুণ্যে, তাকে নিয়ে লিখেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
শুক্রবার বিকেলবেলা, বাংলাদেশ টেলিভিশনে বাংলা সিনেমা চলছে। ছোট এক ছেলে গভীর আগ্রহে বসে থাকে আদালতের দৃশ্য দেখার জন্য। কালো কোট গায়ে মানুষগুলো কী জাদুবলেই না ঘায়েল করে প্রতিপক্ষের বক্তাকে, তারাও কম যান না। শুরু হয় পালটা কথার যুদ্ধ। এই দৃশ্যগুলো উপভোগ করে ছেলেটি ভাবত তার গায়েও একদিন কালো কোট উঠবে। সেই বালক ভাবনায় আর লক্ষ্যে অটুট ছিলেন, এগিয়ে গিয়েছেন তার পথ ধরে। আইনের শিক্ষার্থী তামজিদের শুরুটা এভাবেই। তামজিদের বাবা মো. জাহাঙ্গীর আলম আর মা সেলিনা আক্তার, তাদের গ্রাম বগুড়ার তেলকুপীতে, সেখানেই কেটেছে তার ছেলেবেলা। তিন ভাই এক বোনের পরিবারে তার অবস্থান দ্বিতীয়, বাংলাদেশ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকাতে এলএলবি করছেন তিনি এখন। তামজিদের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু স্থানীয় আটবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরাসরি দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তির মাধ্যমে। এরপর ২০০৬ সালে পীরগাছা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ হতে এ গ্রেডে এসএসসি ও ২০০৮ সালে সৈয়দ আহম্মদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, গাবতলী বগুড়া থেকে মানবিক বিভাগ হতে এ গ্রেডে এইচএসসি পাস করেন। ছোটবেলায় সিনেমা নাটকে আদালতের দৃশ্য দেখে স্বপ্ন দেখেন বড় হয়ে অ্যাডভোকেট হওয়ার। কিন্তু সে স্বপ্নের কথা কখনোই ব্যক্ত করা হয়নি। মা-বাবার ইচ্ছায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করলেও সুপ্ত স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ করতে স্বেচ্ছায় এইচএসসি-তে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। এরপর এলএলবি অনার্সে ভর্তি হন বাংলাদেশ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে, যা সম্প্রতি সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করেছেন। আইন বিষয়টির প্রতি প্রবল ভালোবাসার কারণে এ বিষয়টিকে পেশা হিসেবে নয়, নেশা হিসেবে গ্রহণ করতে চান। তামজিদ মনে করেন, অনেকেই আইন বিষয়ে পড়াশোনা করলেও এ বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান না। যার মূল কারণ আত্মবিশ্বাসের অভাব। যারা এ বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান তাদের জন্য তিনি বলেন, এ বিষয়টিতে ভালো করতে হলে জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে হবে, শুধু সিলেবাসে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এজন্য মুটকোর্টে বেশি বেশি অনুশীলনের মাধ্যমে, বিতর্কের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস বাড়ানো যেতে পারে। তামজিদ বলেন, ‘আমি নিজেও বিভিন্ন সংগঠনের সাথে কাজ করছি। ছোটবেলা থেকেই বিতর্কের প্রতি ভালোলাগা-ভালোবাসা থেকে এবং বিতর্কের প্রতি দ্বায়বদ্ধতা থেকে বিতর্কের তথা যুক্তির রং ছড়িয়ে দিতে দেশের বিতর্ক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সংগঠন ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ (এনডিএফ বিডি)-এর সাথে দেশব্যাপী কাজ করে যাচ্ছি। আমি বর্তমানে এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির পরিচালক এবং রাজশাহী বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্ব পালন করছি। এরই অংশ হিসেবে গতবছর ২৯ জুন আমার নিজ জেলা বগুড়ায় ১ম রাজশাহী বিভাগীয় বিতর্ক কর্মশালা ও উত্সবের আয়োজন করি। সারাদেশব্যাপী বিভিন্ন মডেলের প্রদর্শনী বিতর্কে এবং টিভি ও রেডিওর বিভিন্ন বিতর্কের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছি। এ ছাড়া টিআইবি, রেড ক্রিসেন্ট ছাড়াও আরও কয়েকটি সংগঠনের সাথে জড়িত আছি।’
তামজিদ বর্তমানে মৌচাক ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘ফুলের হাসি’ নামের দ্বি-মাসিক একটি শিশুতোষ পত্রিকা সম্পাদনা করছেন। লেখালেখি করেন ও একটি জাতীয় শিশুকিশোর পত্রিকায় ধারাবাহিক কার্টুন আঁকছেন। শ্রেণীতে সবার ছোট এবং মেধাবী হওয়ার কারণে শিক্ষকদের এবং গ্রামের সবার অন্যরকম ভালোবাসা পেতেন। ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনচেতা স্বভাবের হওয়ায় কোনোকিছুই তাকে শৃঙ্খলিত করতে পারেনি। পড়াশোনাকে কখনই চাপ হিসেবে গ্রহণ করেননি বরং পড়ার মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেন। তামজিদের অন্য ভাইবোনেরাও তাদের স্ব-স্ব ক্ষেত্রে মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তামজিদদের মতো তরুণরাই এগিয়ে দেবে আমাদের, সেই বিশ্বাস হূদয়ে।