বহুল আলোচিত নতুন ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন-২০১২) আইনের বেশকিছু ধারা পরিবর্তনের বিষয়ে একমত হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গঠিত পর্যালোচনা কমিটি। এর মধ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, দাখিলপত্র, হিসাবপত্র সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও থাকছে। গত ৩ নভেম্বর গঠিত ওই কমিটি ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকে মাঠ পর্যায়ে আইনটি ‘বাস্তবায়নযোগ্য’ করার লক্ষ্যে বিতর্কিত ধারা ও বিধি সংশোধনের বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী মাসের শুরুতে কমিটি সুপারিশসহ এই প্রতিবেদন এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে আইনটি বাস্তবায়নে এনবিআরের সার্বিক প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে আগামী জুলাই থেকে কার্যকর করার কথা থাকলেও তাতে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কমিটির একজন সদস্য ইত্তেফাককে বলেন, নতুন আইনে একই প্রতিষ্ঠানের যত শাখাই থাকুক, কেন্দ্রীয়ভাবে একটি নিবন্ধন নেওয়ার কথা বলা আছে। কিন্তু এটি কার্যকর করা হলে মাঠ পর্যায়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণ ও লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। সেজন্য ১৯৯১ সালের আইনের মতো কমিশনারেটভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন ব্যবস্থা থাকতে পারে। ভ্যাটের একাধিক হার হওয়ায় বিদ্যমান দাখিলপত্রেও পরিবর্তন আনতে হবে। হিসাব সংরক্ষণের কিছু বিষয়ে সমন্বয় করা হবে। স্বয়ংক্রিয় বিন (বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) জারি করার যে বিধান নতুন আইনে রয়েছে, তাও বাতিল হওয়া উচিত। এছাড়া নতুন আইনে পণ্যবাহী গাড়ির সঙ্গে ভ্যাট সংক্রান্ত চালানের কপি না রাখার বিধানও যৌক্তিক নয় বলে মনে করেন কমিটি। অর্থাত্ ’৯১ এর আইন অনুযায়ী, পণ্যবাহী পরিবহনে ভ্যাটের চালানের কপি রাখতে হবে। একই সঙ্গে আইনের দুর্বোধ্য ভাষাও আরো সহজ করা হবে। এসব বিষয়সহ আরো বেশকিছু সংশোধনের বিষয়ে কমিটি ইতোমধ্যে একমত হয়েছে।
নতুন আইনের বিষয়ে মতামত জানাতে মাঠ পর্যায়ে সম্প্রতি চিঠি পাঠায় এনবিআর। এর পর মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন কমিশনাররা নতুন ভ্যাট আইনে কী ধরনের সংশোধন প্রয়োজন, তা এনবিআরের নজরে আনেন। এর ভিত্তিতে সম্প্রতি এক সভায় আইনটি ফের পর্যালোচনার লক্ষ্যে ঢাকা কাস্টম হাউজের কমিশনার আব্দুল মান্নান শিকদারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের ওই একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর আইনের সংশোধনের উদ্যোগ নেবে এনবিআর।
দুই বছর স্থগিত থাকার পর আইনটি আগামী জুলাই থেকে কার্যকর করার কথা রয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে আইনটি বাস্তবায়ন উপযোগী করতে অনেক বিষয়ে এখনো কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। অন্যদিকে ভ্যাটের কয়টি হার হবে, হ্রাসকৃত বা ট্রাঙ্কেটেড হারে ভ্যাট প্রদানের সুযোগ থাকছে কিনা কিংবা প্যাকেজ পদ্ধতির ভ্যাট দেওয়া যাবে কিনা - সেসব বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। অন্যদিকে একাধিক হারে ভ্যাট ব্যবস্থার উপযোগী করে সফটওয়্যার তৈরির কার্যক্রমও এখনো সম্পন্ন হয়নি বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী জুলাই থেকেও নতুন আইনটি বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নতুন ভ্যাট আইনে ব্যবসায়ীরা ১৫ শতাংশের একক হারের পরিবর্তে একাধিক হারে বাস্তবায়নসহ বেশকিছু দাবি জানিয়ে আসছিল। গত বছর আইনটি স্থগিত হওয়ার পর ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, নতুন ভ্যাট আইনে ভ্যাটের একাধিক হার হবে। অবশ্য নতুন আইনটি বাস্তবায়নের পর ভোক্তা পর্যায়ে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ ‘প্রতিক্রিয়া মূল্যায়নের’ দাবি জানিয়ে আসছিল ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। গত ২৯ অক্টোবরও এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহ-সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে একই দাবি জানিয়েছেন।