[ অ র্থ নী তি ]

অমিত সম্ভাবনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি

বিশ্বেরই হউক অথবা কোন একটি দেশের, ইহার অর্থনৈতিক উত্থান-পতন গতি-প্রকৃতি বিচ্ছিন্নভাবে চলে না। অর্থনীতির উন্নয়নের চলার পথ, রাজনীতি, প্রশাসন, সমাজ ব্যবস্থা, ইতিহাসের ধারা, ধর্ম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান দ্বারা প্রভাবিত হয়। আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গৌরবে দীপ্ত মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নাত ফসল স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্ম। প্রায় দু’শ’ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণ ও তত্পরবর্তী তেইশ বছরের ধর্মভিত্তিক পশ্চাত্মুখি দখলদার পাকিস্তানি শোষকদের অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের টুঁটি চেপে ধরা থেকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে স্বাধীন হলো বাংলাদেশ। সাড়ে সাত কোটি মানুষের গগনচুম্বী প্রত্যাশায় জন্ম নিল অর্থনৈতিক ও সাহিত্য সংস্কৃতির মুক্তির অন্বেষা। তাত্ক্ষণিক পেক্ষাপটে জাগ্রত রইল ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যার ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মবলিদান ও তিন লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির আর মানবতা বিরোধী অপরাধ। অন্যদিকে কঠিন বাস্তবতায় এসে গেল দখলদার বাহিনী আর এদেশীয় দালাল দোসরদের জঘন্যতম ধ্বংসলীলায় বিধ্বস্ত অবকাঠামো, শূন্য খাদ্য ভাণ্ডার, লণ্ডভণ্ড ক্ষেত-খামার, স্কুল-কলেজ ও শিল্প-কারখানা, কপর্দকশূন্য দেশি ও বিদেশি মুদ্রার রাজকোষ এবং তলাবিহীন ঝুড়ির সমূহ বিনাশের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভবিষ্যদ্বাণীর নিরাশাবাদ। বিয়াল্লিশ বছর পর ২০০৭-১০ সময়কালের বৈশ্বিক মহাবিপর্যয়ের মহামন্দাকে মোকাবিলা করে প্রভাবশালী ও রক্ষণশীল দ্য ইকনমিস্ট (নভেম্বর ০৩, ২০১২) এর ভাষায় ‘বাংলাদেশ আউট অব বাসকেট’। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে উন্নয়ন অর্থনীতির একটি রহস্যময় ধাঁধা হিসাবে উল্লেখ করেছে সাপ্তাহিকীটি। সাধারণভাবে বর্তমান শাসককুলের সমালোচনামুখর দ্য ইকনমিস্ট প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মাঝেও দ্রুতগতি সমৃদ্ধির কারণ হিসাবে যে সকল উপাদানের উল্লেখ করেছে তার মধ্যে রয়েছে পরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিতে বৈপ্লবিক সংস্কার ও সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষাখাতের অগ্রগতি, ভাষা ও সংস্কৃতিতে সহঅবস্থানিক উদারমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ধর্মীয় সহনশীলতা তথা জঙ্গিবাদ নির্মূলের সাফল্য। বলা বাহুল্য বিশ্বের প্রভাবশালী সাময়িকীর মধ্যে অন্যতম দ্য ইকনমিস্ট কিষাণ-কিষাণীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে খাদ্য উত্পাদনে বিপুল অগ্রগতি ও শ্রমজীবী মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উত্পাদিত তৈরি পোশাকের কথাও উল্লেখ করেছে। আর নারীর ক্ষমতায়ন ও জাগরণের কথাটি বিশেষ গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করা হয়েছে বিশ্লেষণটিতে। লক্ষ্য করা যেতে পারে যে, উল্লেখিত সংস্কারগুলোর অধিকাংশই শুরু করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাকিগুলো শুরু অথবা লালন করেছেন বর্তমান সরকার। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নব্বই-এর দশকের শুরুতে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ছিনিয়ে এনে পুনঃপ্রবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ইহার সামাজিক রূপান্তর ঈর্ষণীয় সাফল্যের দাবিদার। দেশের বর্তমান বার্ষিক সামস্টিক আয় ১০৭ বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় প্রায় ৮০০ ডলার, গড় আয়ু ৬৯ বছর *(৪৩) বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শতকরা ১.৩ *(৩.২), শিশুমৃত্যুর হার হাজারে ৩৯ *(১৫৭), সাক্ষরতার হার ৫৮ ভাগ, তবে শিক্ষার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে, প্রাইমারি ও মাধ্যমিকে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি জনসংখ্যায় পুরুষ :মহিলার আনুপাতভিত্তিক, পরিবারের গড় সদস্যসংখ্যা ৪.২ *(৬.১), নারীর সন্তানধারণ প্রবণতা ২.৩ *(৫.৩), গর্ভনিরোধ প্রবণতা শতকরা ৬৬.৮, সুপেয় পানি গ্রহণকারী শতকরা ৯৭.৮ এবং স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা গ্রহণকারী শতকরা ৫১.৫ ভাগ। অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর অমর্ত সেন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও এর সামাজিক রূপান্তরকে চমত্কার এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোত্তম বলে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তানের ড. মাহবুবুল হক বাংলাদেশের মানব উন্নয়নের অগ্রগতিকে বিস্ময়কর বলে উল্লেখ করেছেন। বিশ্ববিখ্যাত ঋণমান নির্ণয়কারী স্ট্যান্ডার্ড এন্ড পুওর পর পর তিন বছর বাংলাদেশকে পাকিস্তানের তিন ধাপ উপরে, ভারতের এক ধাপ নিচে এবং ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও ফিলিপিন্স-এর সমপর্যায়ে বলে উল্লেখ করেছে। মুডিস ইনভেস্টর সার্ভিসের মূল্যায়নে বাংলাদেশের সামস্টিক অর্থনীতিকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে স্থিতিশীল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি নিবন্ধে এস ঢুম বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার স্ট্যান্ডার্ড বেয়ারার হিসাবে উল্লেখ করে দেশটি সম্পর্কে লিখেছেন, “ক্যান টিচ এ লেসন অর টু টু অল আদার রিজিওন্যাল অ্যাক্টরস”। ঐ নিবন্ধে ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে জঙ্গিবাদ নির্মূলের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। গোল্ডম্যান স্যাকস এক দশক আগে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা পাশ কাটিয়ে প্রথমে ‘ব্রিক’ ও পরে ‘ব্রিকস’ (ব্রাজিল, ইন্ডিয়া, চায়না, রাশিয়া ও সাউথ আফ্রিকা) এর গুণগান করলেও তিন বছর আগে বাংলাদেশকে নেক্সট ইলেভেন সম্ভাবনাময় বৃহত্ অর্থনীতি বলে উল্লেখ করেন। বর্তমানে অবশ্য গোল্ডম্যান স্যাকস বাংলাদেশকে সাতটি সবচেয়ে অগ্রসরমান অর্থনীতি হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সাম্প্রতিককালে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড আহরণের সুযোগে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সুসংহত। এর একটি বড় জনসংখ্যা রয়েছে যাতে শতকরা ৬৩ ভাগ লোক অর্থাত্ প্রায় দশ কোটি কর্মক্ষম বয়সসীমায় অবস্থান করছেন। বাড়ছে শিক্ষার হার। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা, বিনামূল্যে আটাশ কোটি নতুন বই বিতরণ, নকলমুক্ত পরীক্ষা এবং ক্ষমতায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ শতকরা ৩০ ভাগে বৃদ্ধি পাওয়া সৃষ্টি করেছে নবতর উন্নয়ন সম্ভাবনা। তবে মাধ্যমিক পর্যায়ে বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপে বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি উদ্যোগ নেয়া হলেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের পূর্ণ ফসল ঘরে উঠবে। বাংলাদেশের কিষাণ-কিষাণীর কঠোর পরিশ্রম, সরকারের অত্যন্ত উদারহস্ত ভর্তুকি মূল্যে যথাসময়ে বীজ, সার ও কৃষিঋণসহ অন্যান্য উপাদান প্রাপ্তি ও সরব নগরবাসীর সাময়িক অসুবিধাজনক লোডশেডিং বৃদ্ধি করে গ্রামে-গ্রামে কৃষিতে সেচের জন্য অব্যাহত বিদ্যুত্ সরবরাহ করার ফলে ১৯৭২ সালের এক কোটি দশ লক্ষ টন খাদ্য উত্পাদনের তুলনায় এখন উত্পাদিত হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন। জমি কমেছে শতকরা ১৫ ভাগ। কিন্তু বেড়েছে উদ্যোগ, পরিশ্রম, প্রণোদনা এবং কৃষিজীবী ও জমির উত্পাদনশীলতা। আরও প্রয়োজন পল্লী অঞ্চলে গুদামজাত ধারণ ক্ষমতা (বর্তমানে ধারণক্ষমতা পনের লক্ষ টন অথচ উদ্বৃত্ত তেইশ লক্ষ টন), কৃষি উত্পাদন ও বিপণনের সমবায়, অত্যন্ত স্বল্পসুদে কৃষিঋণ বিতরণ, স্থানীয় কাঁচামাল অর্থাত্ কৃষি, মত্স্য, ফল ও ফুল ভিত্তিক ব্যাপক কর্মসংস্থানমূলক শিল্পায়ন (মাইক্রো, স্মল, মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ এমএসএমই) যাতে পুঁজি ও সময় কম লাগে এবং প্রযুক্তি ও আমদানিনির্ভরতা নেই। এই কৌশলে উত্পাদিত পণ্যের বাজার দেশে-বিদেশে সম্প্রসারণ করেই অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরসন এবং আয় ও সুযোগের বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব। অবশ্যই ভর্তুকি মূল্যে শস্যবীমা ও কৃষি ও শ্রমজীবিগণের জন্য স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থায় অগ্রাধিকার কাম্য। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে কিছুটা মন্দগতির পর এখন আবার তা ঊর্ধ্বমুখি। এর তিন- চতুর্থাংশ আসে তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যার রপ্তানি থেকে, যার পরিমাণ ২০১১-১২ সালে ছিল বিশ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। এ খাতের বাজারে গণচীন বিশ্বের সর্বোচ্চ অংশীদার, শতকরা ৩৭ ভাগ এবং বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে, তবে বাজারের শতকরা ০৫ ভাগের অংশীদার। বিশ্বের তাবত্ বড় বড় তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যার আমদানিকারকগণ ২০১২ সালের নভেম্বরে ঢাকায় এসে বলে গেছেন যে, গণচীনে শ্রমিকের সংখ্যাস্বল্পতা (ভ্রান্ত জনসংখ্যানীতির ফল) এবং উচ্চ মজুরির ফলে দেশটি ক্রমেই তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে এবং বাংলাদেশ তাদের সবচেয়ে পছন্দের ক্রয়সূত্র। অর্থাত্ এ খাতে ২০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানিকে ৫০, ৬০ এমনকি ৭০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানিতে উন্নীত করা যেতে পারে। তবে এর জন্য বর্তমানের চমত্কার উদ্যোক্তা শ্রেণির সৃজনশীল আইন মানা যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন ত্রিপক্ষীয় (শ্রমজীবী, মালিক ও সরকার) কার্যকর গবেষণা, বিশ্লেষণ, নীতি সংস্কার ও কৃতসংকল্প সহযোগিতা। ৪০০ অবৈধ ফ্যাক্টরিতে অসাধু সাবকন্ট্রাক্ট বন্ধ করা, ২৫০ ফ্যাক্টরিতে অগ্নিনির্বাপণের কোন ব্যবস্থা না থাকার বিরুদ্ধে যথোপযু্ক্ত প্রতিবিধান করা, হাতিরঝিল প্রকল্পের নাকের ডগায় বিজিএমইএ স্থাপনার স্থানান্তর এবং তাজরীন ফ্যাশনস ও অন্যান্য শ্রমিক হত্যাকারী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারগণকে আইনের শাসনে আনা জরুরি। তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যার শিল্পের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা, ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা চালু করা হলে আপাতদৃষ্টিতে যে বাড়তি খরচ হবে তার চেয়ে বহুগুণ লাভ হবে শ্রমজীবিগণের উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে খরচ কমে যাওয়াতে। শ্রমিক বন্ধুগণকেও মিথ্যা প্ররোচনায় বিভ্রান্ত না হয়ে ভাংচুর থেকে বিরত থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে দাবি-দাওয়া আদায়ের দেনদরবার করতে হবে। গণচীন ও রাশিয়াসহ প্রাচ্য বাজার সম্প্রসারণে সুফল আসছে, আরও উদ্ভাবনী মনোযোগ প্রয়োজন। জরুরি ডিজাইনের বহুমুখিকরণ বিশেষ করে বিত্তবানদের চাহিদা পূরণকারী ডিজাইনও পোশাকে যাওয়া। বাংলাদেশ এখন রেমিটেন্স আহরণে পৃথিবীতে সপ্তম স্থানে। কারণে-অকারণে সমালোচনাকারিগণের নেতিবাচক ভবিষ্যদ্বাণীকে মিথ্যা প্রমাণিত করে ২০১২ সালে দেশে রেমিটেন্স এসেছে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ইহার গতি ঊর্ধ্বমুখি। পশ্চিমা বিশ্বে আপাতদৃষ্টিতে জনশক্তি সেবা রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম বলে মনে হতে পারে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি শূন্যের কোঠায় এমনকি নেতিবাচক হবার ফলে ঐ সকল দেশে সব ধরনের শ্রমজীবীর সেবা, বিশেষ করে আধাদক্ষ শ্রমের চাহিদা বাড়তে বাধ্য। নইলে শ্রমের বদলে যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের সীমাবদ্ধতায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন একেবারেই ঠেকে যাবে। তাছাড়া সঠিকভাবে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন-নতুন বাজার সন্ধানে সফলতা আসছে। তবে বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যাকে মাধ্যমিকে বৃত্তিমূলক ও উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তি-প্রবণতায় জনশক্তি সম্পদে রূপান্তর করার কোন বিকল্প নেই। অর্থনীতির প্রখ্যাত পণ্ডিত আলবার্ট হারশম্যান বলেছেন যে, অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলোকে চিহ্নিত করে সে সকল ক্ষেত্রে বেশুমার বিনিয়োগ করে জোগান বাড়ালে অর্থনীতির চাকা সচলতর হতে বাধ্য। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এ সকল প্রতিবন্ধকতার একটি হলো অবকাঠামোর অপ্রতুলতা, যেমন যাতায়াত, বন্দর, বিদ্যুত্, গ্যাস, টেলিকম, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। আপাতভাবে বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধান হয়েছে বটে কিন্তু আগামীতে দুই অংকের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির অর্থনীতিতে বিদ্যুত্ উত্পাদন ও সঞ্চালনার জোগান ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। ভারতের সাথে যৌথ উদ্যোগে রামপালে কয়লাভিত্তিক ১২৩০ মেগাওয়াটের প্রকল্পটির চিহ্নিত বাধাগুলোকে দ্রুতগতিতে দূর করা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রংপুর দিনাজপুরের একশ’ বর্গকিলোমিটার এলাকায় যে ২৮০০ এম এম পিটিএ উন্নতমানের বিটুমিন জাতীয় কয়লার মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে খনির মুখে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে (উত্পাদনশীলতা শতকরা ৮০ ভাগ, সনাতনী খনি পদ্ধতিতে যা শতকরা ২০ ভাগ) কয়লা আহরণ করে ৫০ বছর যাবত্ ২০০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন সম্ভব। এহেন কল্যাণকামী সম্ভাবনায় জাতীয় ঐকমত্য গড়ে ঐ এলাকায় কয়েক লক্ষ বাসিন্দা মালিককে জমির বিনিময়ে উদারভাবে বিপুল মূল্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে, কোম্পানির ইকুইটি ও চাকরি দিয়ে এবং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারমূলক সন্তোষজনক স্থানান্তর ও পুনর্বাসন করে এ সুবর্ণ সুযোগ অচিরেই কাজে লাগানো প্রয়োজন। তাতে অবশ্যই জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হতে হবে। এ ছাড়া গ্যাস উন্নয়ন করে, জলবিদ্যুতের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে এবং সৌর ও বায়োগ্যাস ভিত্তিক নবায়নযোগ্য বিদ্যুত্ ও জ্বালানির ব্যবস্থা করে মাথাপিছু বছরে মাত্র ২৬৫ কিলোওয়াট সর্বনিম্ন বিদ্যুত্ ব্যবহারকারী দেশের (ভারতে ৭৫০ কিঃ ওঃ, পাকিস্তানে ৪৫০ কিঃওঃ) কালিমা দূর ছাড়াও আর্থ-সামাজিক অগ্রগতিতে তেজী ভাব আনতে হবে। সমপ্রতি অর্থাভাবে আরও ১২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনে সক্ষম প্রস্তাবিত পাঁচটি প্ল্যান্টে দেশের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থায়ন করা কেন যাবে না। রেলের আশু সমপ্রসারণ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম ফোর লেইন মহাসড়কের দ্রুত সমাপ্তি অর্থনীতির পালে জোরদার গতি সৃষ্টি করবে নিঃসন্দেহে। কর্মসংস্থানমূলক শিল্প প্রসারের ক্ষেত্রসমূহ যেমন চামড়া শিল্প, জাহাজ নির্মাণ, সিরামিকস, খেলাধুলার সরঞ্জাম, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, টায়ার টিউব নির্মাণ, সাইকেল, রাবার, প্লাস্টিক ইত্যাকার শিল্পে উদ্ভাবনী অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি। আশু প্রয়োজন সাভারের চমত্কার শিল্প নগরীতে সিইটিপি স্থাপনের উদ্যোগটিকে সকল মহলে গ্রহণযোগ্য করে অবিলম্বে সম্পন্ন করা। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার একটি বড় কন্টক এর নেতিবাচক ভাবমূর্তি যার অনেকটাই মুছে যাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজের সফল সমাপ্তিতে। সে সাথে ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদ নির্মূল করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতে, ইসলামের ধর্মান্ধ বিরোধিতার উত্তম রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও অপেক্ষার পর যুদ্ধাপরাধী বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির দণ্ডাদেশ সম্পর্কে ২৬ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখের দ্য ইকনমিস্ট মন্তব্য করেছে যে, ত্রিশ লক্ষ নারী-পুরুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে একচল্লিশ বছর পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছে তাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ হয়েছে, বিরাট জয় হয়েছে তার। বাংলাদেশকে পেছনে টানার আরো একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি গড়েছে একটি প্রতিষ্ঠান, যার উদ্দেশ্য দুর্নীতিগ্রস্ত লেভেল পরানোর জন্য প্রশ্নবিদ্ধ মেথড ও ধারণাপ্রসূত পক্ষপাতদুষ্ট মিডিয়া প্রচারণা। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যেভাবে বাড়ছে, যে হারে হ্রাস পাচ্ছে দারিদ্র্য এবং যে কৃতসংকল্পতায় ঘটছে কল্যাণরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা বলয় ও মানব সম্পদের দৃঢ় পদযাত্রা তাতে আশা করাই যেতে পারে যে, ঐ সকল অসত্য প্রচারণা মিথ্যা প্রমাণিত হবে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর বছর ২০২১ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে বর্তমানের মধ্যম পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, কারণ মানব উন্নয়ন সূচকে দেশ প্রতি বছর শতকরা চার ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। দ্রুতগতি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও এ থেকে সামাজিক অগ্রগতি সাধনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির মাধ্যমে। তাই বুঝি এশিয়ান টাইমস এর আর.এম.কাটলার বলেছেন, “বাংলাদেশের নি:শ্বাস-প্রশ্বাসে বইছে আশাবাদ। এর অর্থনীতি সদা কর্মচঞ্চলময়।” লেখক :অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক