[ রা জ নী তি ]

খালেদা জিয়া কি আসলেই সবাইকে হতভম্ব করেছেন

ওয়াশিংটন টাইমেস খালেদা জিয়ার পত্রখানি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। মার্কিন মুল্লুকের জনগণ নানাবিধ গরিব দেশের বর্তমান, অতীত বা ভবিষ্যতের রাষ্ট্র-কর্ণধারদের লেখাজোখা নিয়ে বিশেষ উত্সাহী যে হন ইতিহাস এমন কোনো সাক্ষ্য দেয় না। ফলে সাড়া-টাড়া যা পড়েছে তা আসলে বাংলাদেশি মানুষজনের মধ্যেই। নানাবিধ বিতর্ক। নানাবিধ পাবলিক-আলাপ। প্রেস বা ইলেকট্রনিক মিডিয়াও বিশেষ বসে থাকছে না। ফিচার থেকে টক-শো। অধিকাংশ আলাপ-আলোচনাতেই তিনি বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়ে নিতে পারছেন না। কমবেশি নিন্দার মুখোমুখিই হতে হচ্ছে। কিংবা তাঁর এই পদক্ষেপে মানুষজন বিস্ময় প্রকাশ করছেন। সবমিলে একেবারে শোরগোল ফেলে-দেয়া একটা ঘটনার তিনি জন্ম দিয়েছেন। কেন হঠাত্ সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমান বিরোধীদলীয় নেত্রীর একটি পাবলিক পত্র এতখানি হৈ-চৈ জন্ম দিচ্ছে? খালেদা জিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট দূর করবার জন্য সালিশ করতে বলেছেন বলে? তিনিই কি প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ নাককে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ নির্ধারণের জন্য গলাতে বললেন? খালেদা জিয়া কি এই প্রথম মার্কিনানুগ মনোভাব প্রকাশ করলেন? নাকি এই পত্র লেখার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি মার্কিন প্রভাবমুক্ত ছিল? কিংবা এই পত্র ওয়াশিংটন টাইমসে প্রকাশিত না-হলেই আমরা নিশ্চিত থাকতে পারতাম যে তদ্বির ও সুপারিশের কোনো পথ মার্কিন মুল্লুকে খালেদা জিয়া, কিংবা ধরা যাক অন্য কোনো বাংলাদেশি নেতা গ্রহণ করে থাকেন না? খালেদা জিয়ার পত্রটি নিয়ে এই মুহূর্তে দেশাত্মবোধক (নাকি জাতীয়তাবাদী!) যে জোশ চারপাশে বিরাজমান তাকে খুব ভাবগম্ভীর রাজনৈতিক হিসেবে ঠাহর করা বা গ্রহণ করা বিশেষ কঠিন। এই জোশ যে বাংলাদেশের কিংবা বাংলাদেশ-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক-রাজনৈতিক (বা মুরুব্বি-তাঁবেদার) ইতিহাসের দিকে বিশেষ মনোযোগী তাও মনে হয় না। এই জোশটাকে বড়জোর সহজ কিস্তিতে প্রমাণযোগ্য এক ধরনের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা মনে হয়ে থাকতে পারে। জোশকারীদের এমনকি নিজেদের ন্যূনতম একটা সময়কাল ধরে সাম্রাজ্যবাদকে মোকাবিলার ভাবনা-চিন্তার প্রমাণও রাখা লাগেনি। সেটা শিশুতোষ। কিংবা এই জোশ নেহায়েতই খালেদা জিয়াকে আরও একদফা নাজেহাল করবার উদ্যোগ মাত্র। বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে রাজনৈতিকভাবে এবং সরকারের পেশীশক্তি নীতির দিক থেকে তিনি ইতোমধ্যে যথাসম্ভব নাজেহাল হয়ে আছেন। ‘মৃত সর্পকে আরেকবার মারিলে কর্তব্য পালন হইতে পারে, কিন্তু কারো উপকারে লাগে না।’ সেটা বাহুল্য। বারাক ওবামা যখন ২০১২-তে দ্বিতীয়বারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করছেন, বাংলাদেশে বহু সুহূদ-বন্ধুদের উদ্দীপনা রীতিমতো লক্ষ্য করবার মতো ছিল। আমি সমূহ সচেতন আছি যে নানাবিধ রাজনৈতিক মৈত্রী মানুষজন বোধ করে থাকেন। নানাবিধ রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় নানাবিধ সংহতি নানান রূপে নানান সময়ে গড়ে ওঠে। এই সংহতি দীর্ঘকালীন কোনো রাজনৈতিক চর্চা থেকে না-গড়ে উঠতে পারে, নিছকই একটা ছোট সময়কালের পক্ষ-বিপক্ষের বোধ থেকে দানা বেঁধে উঠতে পারে। এ ব্যাপারেও আমি ওয়াকিবহাল আছি। পক্ষ-বিপক্ষ অনুভব করবার সময় আত্ম-পরিচয় খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করেও বটে। ওবামা কৃষ্ণাঙ্গ, ওবামার পূর্বসূরীরা ঘানা থেকে আগত, ওবামা আফ্রিকান-আমেরিকানদের মধ্যে প্রথম রাষ্ট্রনায়ক। এর সবকিছুই খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে। এমনকি বাংলাদেশে অনেক মানুষের মাথায় ওবামার পরিচয় কোনো এক কারণে মুসলমান ধরনের হয়ে আছে। সেই কল্পনাটির গুরুত্বও এতটুকু কম নয়। এসব বিষয় মাথায় রেখে বারাক ওবামার দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হবার সম্ভাবনায় বা আশায় এখানকার সাধারণ মানুষ উল্লসিত থাকলে তাতে দোষ খুঁজবার মতো কিছু হয়নি। কিন্তু আমি নানান ধরনের সাধারণ মানুষের একটা পরিচয়ভিত্তিক আত্মপর ভাবনা বিষয়ে চিন্তিত নই। যে কারণে এই উদাহরণ আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে তা হলো পাবলিক-আলাপ গড়ে তুলবার ক্ষেত্রে যেসব পেশাজীবী বাংলাদেশে বনিয়াদি ভূমিকা পালন করে থাকেন তাঁরাও অনায়াসে এই উল্লাস-উত্সবে মতপ্রকাশ করেছেন জোরে-সোরে। লঘুচিত্ত এই উচ্ছ্বাস আর যাই হোক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী ভূমিকার বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক বোঝাপড়া প্রকাশ করে না। তাহলে হঠাত্ খালেদা জিয়ার বিলাপ নিয়ে অন্যদের বিলাপের মাজেজাটা কী? কখনো কখনো নৈর্লিপ্তি অর্জনও একটা রাজনৈতিক পদক্ষেপ হতে পারে। ইরানীয় শাসকদের যখন দ্বিতীয় বুশের নির্বাচনের কালে জানতে চাওয়া হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে তাঁরা কী ভাবছেন, মনোযোগ দিয়ে নিষ্ঠাবান একটা নৈর্লিপ্তি তাঁরা হাজির করেছিলেন। সেই নৈর্লিপ্তি প্রথাগত নৈর্লিপ্তি সামান্যই। বরং ভীষণ এক তির্যক সমালোচনা খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকেই নিয়েই হাজির করেছিলেন তাঁরা। সেই সমালোচনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দু’পক্ষবিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কটাক্ষই কেবল করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্বের দরবারের জন্য সেই ভিন্নতার অসারতাকেও সামনে এনেছে। তাঁরা বলেছিলেন, ‘রিপাবলিক আর ডেমোক্র্যাট কারা যে আমাদের বড় মিত্র তা আসলে আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। আমাদের মাথাব্যথাও বড় নেই। বড় বুশ একাধিকবার যুদ্ধের ধমক-ধামক দিয়েছেন বটে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধটা শেষমেষ লাগিয়ে দিলেন ক্লিনটন সাহেবই, যে কারণেই হোক না কেন। ফলে এগুলো তোমাদের মাথাব্যথা। তোমরাই সেটা ব্যথা করো গে। আমাদের বিশেষ যায় আসে না যে কে আমেরিকার মসনদে বসছে। আমাদের হকিকতের কোনো বদল নেই।’ বা এরকম কিছু। এই উচ্চারণ মার্কিন নীতি নিয়ে ইরানী শাসকদের গভীর আত্মোপলব্ধিই প্রকাশ পায়নি কেবল, মিডিয়ার আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক মানচিত্রটাকে ঘোষণা করতেও দেখা গেছে। বাংলাদেশের খালেদা নিন্দুকরা কি এরকম একটি পত্র আশা করেছিলেন? কখনো করেছিলেন? বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে এরকম একটি কি মানানসই হতো? উঞ্ছবৃত্তি ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পাশ্চাত্যের সঙ্গে অন্য কোনো সম্পর্ক কি বিএনপির ছিল কোনো কালে? কিংবা অধুনা আওয়ামী লীগও কি এর থেকে ভিন্ন কোনো সম্পর্ক রচনা করতে পেরেছে? ক্ষোভ বা আহাজারিটা আসলে কী নিয়ে? পত্রখানা নিয়ে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখছি সেগুলোকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা গেছে। শুধু পত্রপত্রিকা, টেলিভিশনের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নয়, মোটের উপর নগরের পাবলিক জবানের প্রতিক্রিয়াগুলোও বিবেচনায় আনা দরকার মনে করছি। প্রথমত, ‘তিনি দেশের সার্বভৌমত্বের চরম অবমাননা করেছেন। দেশের ভিতর যাই সমস্যা থাকুক না কেন, খালেদা জিয়ার উচিত ছিল সেগুলো নিজেদের মধ্যেই মিটিয়ে ফেলার। এভাবে নালিশ দেয়া তাঁর ঠিক হয়নি।’ দ্বিতীয়ত, ‘তিনি সাম্রাজ্যবাদকে প্রশ্রয় দিয়েছেন বা সাম্রাজ্যবাদের পক্ষাবলম্বন করেছেন।’ প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থান রাজনৈতিক গভীরতা বিচারে খুব কাছাকাছি মনে হলেও এর উচ্চারণকারীদের রাজনৈতিক বর্গ হিসেব করলে ঘোরতর আলাদা। ‘সার্বভৌমত্ব’ নিয়ে যাঁরা চিন্তিত তাঁরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুনিয়া-জোড়া মাতব্বরি নিয়ে চিন্তিত নন। এমনকি হয়তো তাঁরা আদৌ সার্বভৌমত্ব নিয়েও চিন্তিত নন। সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন যে বিরাট অভিযোগ সেটা তাঁরা অবগত এবং খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সেই অভিযোগ তাঁরা করতে চান। এই বর্গের এক পক্ষ আরও বাড়তি উত্সাহী হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগই আনতে চান। দ্বিতীয় পক্ষের জন্য, তাঁরা সংখ্যালঘু হলেও, খুব গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়টি। বিএনপির ইতিহাস যাই হোক, এঁরা খালেদা জিয়াকে সাম্রাজ্যবাদের চ্যালেঞ্জার হিসেবে দেখতে চান। খালেদা জিয়ার এই পত্র তাঁর রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব প্রমাণ করছে বলে তাঁদের কারো কারো মনে হয়। তৃতীয়ত, ‘তিনি এই কাজটা এই সময়ে এভাবে করে ঠিক করেননি।’ এই পক্ষ আসলে খালেদা জিয়ার এই পত্র প্রকাশে খানিক শারমিন্দা পক্ষ। তাঁরা বেগম জিয়ার এই পত্র প্রকাশে শারমিন্দা, নাকি এটা প্রকাশের কারণে তাঁকে যে এরকম হেনস্থা হতে হচ্ছে সেই পরিস্থিতির কারণে শারমিন্দা সেটা বোঝা খানিক শক্ত। যদি সত্যি সত্যি দ্বিতীয় অংশটি একটু জোরাল হয় তাহলে বিরোধী নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার ভক্তভাগ্য নিয়ে মায়াই লাগবে বরং। বাংলাদেশের শক্তিমান দুই রাজনৈতিক দল বিগত দুই দশকে পাল্লা দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিশ্ব-কর্ণধারদের কাছে ধর্ণা দিয়ে আসছেন। প্রতিটি নির্বাচনের প্রাক্কালে তো বটেই, বাজেট তৈরি করবার সময়, অস্ত্রপাতি কিনবার সময়, ধার করবার সময়, ‘জঙ্গী’-বিরোধী তত্পরতায় নিজেদের অংশগ্রহণ ঘোষণা দেবার সময়। ইউরোপ আর মার্কিনই নয়, পাশের দেশের সঙ্গে সম্পর্কও বিশেষ ভিন্ন কিছু নয় আমাদের শাসকদের। নির্বাচনের প্রাক্কালে এই তদ্বিরের আকুলতা আর গভীরতা হয়তো খানিক বেশি নজর কাড়ে। তবে আমাদের জন্য শাসকদের এই অবয়ব একটা নৈমিত্তিক হকিকত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে খালেদা জিয়ার পত্রখানি আরও ব্যাপকতর একটা সাংস্কৃতিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে। বিরোধীদলীয় নেত্রী তদ্বিরটাকে প্রকাশ্য করে ফেলেছেন বলেই কি তিনি কাঠগড়ায়? তদ্বির সকলে দরজার আড়ালে দেখতেই (বা না-দেখার ভান করতে) পছন্দ করেন মানুষজন। মার্কিন জনগণ ও বাংলাদেশের জনগণকে লুকিয়ে-চুরিয়ে কেবল মার্কিন শাসকদের কাছে নিভৃত তদ্বির বা হস্তক্ষেপ-কামনার কোনো অভিযোগ কি করা হতো তাঁকে? করা হয়ে থাকে কাউকে? বাংলাদেশের কোনো শাসককে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সালিশ দেবার, মার্কিন মুখাপেক্ষী থাকবার এই দেউলিয়াত্বের দায় কেন খালেদা জিয়ার একার বইতে হবে? খালেদা জিয়া বড়জোর মরিয়া হয়ে পড়েছেন। সেই মরিয়া ভাব আওয়ামী লীগের লাগাতার পেটোয়া নীতির কারণে হোক, নির্বাচনী কৌশলে সরকার দুই চাল বেশি দিয়ে ফেলার কারণে হোক কিংবা অন্য কোনো কারণে হোক। কিন্তু খালেদার নিন্দুকেরা একটুও কম মরিয়া নন। বাংলাদেশের মুখ্য রাজনৈতিক বর্গগুলো যে লাগাতার মার্কিন স্নেহ-প্রত্যাশী সেই সত্যটাকে আড়াল করতে মরিয়া। কিংবা খোদ বিএনপির রাজনৈতিক বনিয়াদে মার্কিন প্রশ্রয়ের ইতিহাস আড়াল করতে মরিয়া। প্রথমটি যদি সরকারপন্থিরা করে থাকেন, দ্বিতীয়টি করছেন বিএনপিপন্থিরা। নিছক কয়েকশ’ শব্দের খালেদা জিয়ার একটা পত্র এত ভার কি সইতে পারবে? নাকি আমরা সবাই মিলে আমাদের রাজনৈতিক দায়-দায়িত্ব এড়াতে পারব? আমাদের সকলের বিস্ময়ের থেকে খোদ বিরোধীদলীয় নেত্রীই বেশি বিস্মিত হয়ে পড়তে পারেন। ‘হলোটা কী সবার! কী এমন করেছি আমি!!’ লেখক: শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়