কর্মস্থলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা

কর্মস্থলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা লইয়া উদ্বেগ নূতন নহে। একের পর এক ট্র্যাজিক অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনার কারণে সেই উদ্বেগ ক্রমেই বাড়িয়া চলিয়াছে। সর্বশেষ গত নভেম্বর মাসে সংঘটিত সাভারের তাজরীন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করিয়াছিল। সেই দুর্ঘটনা কাড়িয়া নিয়াছিল শতাধিক শ্রমিকের প্রাণ। তাহার ক্ষত শুকাইবার আগেই সমপ্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে স্মার্ট গার্মেন্টসে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে হতাহত হইয়াছে আরও কমপক্ষে ১০ জন শ্রমিক। গত সোমবার রাত্রে আশুলিয়ার মানামি ফ্যাশন নামের একটি কারখানায় আবারও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। ভাগ্যক্রমে কোনো প্রাণহানির ঘটনা না ঘটিলেও ভয়াবহ এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনিতে ফায়ার সার্ভিসের ৭টি ইউনিটকে গলদঘর্ম হইতে হইয়াছে। অগ্নিকাণ্ড শুধু নয়, নানা ধরনের দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের হতাহত হইবার বিষয়টি যেন একটি নৈমিত্তিক বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। এইগুলি নিছক দুর্ঘটনা হইলে কাহারো কিছু বলিবার ছিল না। কিন্তু প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যাইতেছে যে, এইসব দুর্ঘটনার মূলে রহিয়াছে অতি নিম্নমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, দায়িত্বে অবহেলা এবং চরম অসতর্কতা ও অসচেতনতা। সেই সাথে একদিকে যেমন রহিয়াছে বিদ্যমান নিরাপত্তামূলক নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করার প্রবণতা, অন্যদিকে তেমনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক উদাসীনতা। সব মিলাইয়া যে চরম হতাশা ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়াছে তাহা শুধু ভুক্তভোগী শ্রমিক কিংবা দেশের চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ নাই। বস্তুত আমাদের শিল্প-কারখানার বৃহদংশই রফতানি নির্ভর। গত ২৬ জানুয়ারি ভয়েস অব আমেরিকা পরিবেশিত এক সংবাদে বলা হইয়াছে যে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার পোশাক কারখানা রহিয়াছে— যাহারা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্রান্ডের পোশাক প্রস্তুত করিয়া থাকে। পোশাক রফতানি বাবদ আমাদের বার্ষিক আয় আনুমানিক ২০ বিলিয়ন ডলার— যাহা আমাদের বৈদেশিক আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ। শুধু তাহাই নহে, শ্রমঘন এই শিল্পে কর্মরত আছে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক। ইহা যে আমাদের বিপুল বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত তাহা লইয়াও দ্বিমত নাই। উপর্যুপরি দুর্ঘটনার কারণে শুধু যে এই শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হইতেছে তাহাই নহে, একই সাথে তৈরি পোশাকের বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যেও অসন্তোষ ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতেছে। বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও শ্রমিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় নিজ নিজ দেশে তাহারাও নানামুখী চাপের মুখে পড়িয়াছেন। তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় কোনো ক্রেতাই যে এইসব অনভিপ্রেত দুর্ঘটনার দায়দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে লইতে রাজি হইবেন না— তাহা সহজেই অনুমেয়। নিরাপদ কর্মস্থলের দাবিতে ইতোমধ্যে শ্রমিকরাও সোচ্চার হইয়া উঠিয়াছেন। কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে গার্মেন্ট শ্রমিক সংগঠনগুলির নেতাকর্মীরা শ্রমভবন ঘেরাও করিয়াছেন গত রবিবার। ঘোষণা করিয়াছেন সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি। বাস্তবতা হইল, সমস্যাটি সংশ্লিষ্ট সকলেই জানেন। দুর্বল কারখানাগুলি চিহ্নিতও করা হইয়াছে বিভিন্ন সময়ে। পোশাক মালিকদের সংগঠন এবং সরকারের তরফ হইতে বহুবার আশ্বাসও দেওয়া হইয়াছে এইসব সমস্যা সমাধানের। কিন্তু আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটিয়া যাইবার পরই কেবল জানা যায় যে, কাজের কাজ কিছুই হয় নাই। তখন আবার নূতন করিয়া দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। ইহার পরিণাম যে ভালো হয় নাই বা হইতেছে না— তাহা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে। রোগকে আড়াল করিলে তাহা যে আরও গুরুতর হইয়া ওঠে বা উঠিতে পারে— তাহা কোনো নূতন কথা নহে। সমাধানের পথ একটাই। সেইটি হইল— কর্মস্থলের নিরাপত্তার বিষয়টিকে অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হইবে। তবে এই দায়িত্ব শুধু মালিকদের উপর ছাড়িয়া দিয়া বসিয়া থাকিলেও চলিবে না। এই ক্ষেত্রে সরকারের যেমন অবশ্যপালনীয় কিছু দায়িত্ব আছে, তেমনি শ্রমিকদের ভূমিকাও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। কারণ শ্রমিকরা তাহাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে সচেতন না হইলে কোনো মালিকের পক্ষেই এককভাবে কারখানার নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভব নহে।