হরতালে সরকারি গাড়ি নাই কেন

দেশবাসী বেশ কিছুদিন ধরিয়া হরতালের মধ্যে বসবাস করিতেছেন। হরতালের অভিজ্ঞতা আমাদের নূতন নহে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে আমরা বড় বড় হরতাল দেখিয়াছি। স্বাধীন বাংলাদেশেও হরতাল আমাদের পিছু ছাড়িতেছে না। ইহা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। অনেকে মনে করেন, ভারতীয় উপমহাদেশে আজ হরতালের যে রূপ ও মূর্তি দাঁড়াইয়া গিয়াছে তাহা বামাচরণের মধ্যে পড়ে। উদার গণতান্ত্রিক ও উন্নত দেশে ইহার কোন স্থান নাই। সেখানকার মানুষ একদিনের জন্যও তাহাদের পথ-ঘাট ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকিবে তাহা আদৌ ভাবিতে এমনকি কল্পনাও করিতে পারেন না। গুজরাটি শব্দ ‘হরতাল’ অর্থ তালের সংহার বা হরণ। ইহাতে দোকান-পাট, হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাট ও স্বাভাবিক কাজকর্ম সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে বলিয়া যাপিত জীবনে দেখা দেয় ছন্দপতন ও বিভ্রাট। সাধারণত সরকার বিরোধীরা সরকারকে শায়েস্তা করিতে বা বিপাকে ফেলিতে এবং তাহার মাধ্যমে ক্ষমতার রাজনীতির অভীষ্ট পূরণে হরতালের আয়োজন করিয়া থাকে। কখনও কখনও সরকারি সহযোগিতায়, সরকারি দলের সমমনাদের পক্ষ হইতেও হরতাল ডাকা হইতেছে আজকাল। ইহা হরতালের নূতন সংস্করণ এবং রসিকতা করিয়া অনেকে ইহার নাম দিয়াছেন ‘সরকারি হরতাল’। আমাদের দেশে বিরোধীরা হরতাল ডাকিলে জনগণের প্রতি তাহা মানিয়া চলার উদাত্ত আহ্বান জানান। হরতাল শেষে জনগণের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। পক্ষান্তরে সরকারি দল সেই হরতাল সর্বাত্মকভাবে প্রতিরোধের আহ্বান জানান। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় হরতাল শেষপর্যন্ত কোন না কোনভাবে সফল হইয়া যায়। অর্থাত্ মার-পিট, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, গাড়ি ভাঙচুর, গাড়িতে আগুন ধরাইয়া দিয়া মানুষকে পোড়াইয়া মারা, হামলা-মামলা ইত্যাদি কোনকিছুই বাকি থাকে না। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি বলিয়া কথা নহে, সব আমলেই আমরা ইহা লক্ষ্য করিয়া আসিতেছি। কিন্তু একটি বিষয় আমাদেরকে বিচলিত না করিয়া পারে না। তাহা হইল— সরকার হরতাল প্রতিরোধের ডাক দিয়াই বসিয়া থাকে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে মাঠে নামাইলেও নিজেরা ঘরে বসিয়া থাকিয়া প্রকারান্তরে হরতালের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। মন্ত্রী-এমপিদের বেশিরভাগেরই কোন খবর থাকে না। তাহাদের অনেকে অফিসেও আসেন না। তাহারা অন্যের গাড়ি রাস্তায় নামানোর কথা বলিয়া নিজেদের গাড়ি গ্যারেজ হইতে বাহির করেন না। অন্যদের জান কুরবান করিতে বলিলেও নিজের জান লইয়া ঘরে টিভি সেটের সামনে বসিয়া থাকেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে যত সরকারি গাড়ি আছে তাহা যদি হরতালের দিন একযোগে রাস্তায় বাহির হয়, তাহা হইলে সেই হরতালকে সফল বলিবার কোন উপায় থাকে না। কিন্তু সরকার কেবল প্রাইভেট গাড়িকেই রাস্তায় নামাইবার ফন্দি-ফিকির করেন। ইহা কি পরের মাথায় কাঁঠাল ভাঙ্গিয়া খাইবার মত আচরণ নহে? আমাদের জানা মতে, দেশে তিন লক্ষাধিক সরকারি গাড়ি রহিয়াছে। এই গাড়িগুলি হরতালের দিন যেন আস্তাবলের অলস ঘোড়ার ন্যায় দাঁড়াইয়া ঘুমায়। শুধু তাহাই নহে, যখন যেই সরকার ক্ষমতায় আসে, অমনি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা সেই দিকে ঝুঁকিয়া পড়েন হালুয়া-রুটিতে ভাগ বসাইবার জন্য। কিন্তু তাহারাও গাড়ি বাহির করেন না, বরং টার্মিনালগুলিতে সারি সারি গাড়ি রাখিয়া দেন। এইভাবে সামান্য হরতালেও দূরপাল্লার কোন গাড়ি চলে না। কখনও কখনও পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয় যে, হরতাল হইয়াছে ঢিলাঢালা। তাহারা এজন্য ফার্মগেট কিংবা মতিঝিল শাপলা চত্বরে চলমান বিআরটিসিসহ কয়েকটি লক্কর-ঝক্কর মার্কা বাস বা গাড়ি চলার চিত্র তুলিয়া ধরিয়াই এরূপ মন্তব্যধর্মী রিপোর্ট লিখেন বা টিভি-চ্যানেলে পরিবেশন করেন। কিন্তু সেই গাড়িতে যে অনেক সময় পুলিশ বা দলীয় মাস্তান বা ক্যাডার বাহিনী থাকে তাহা উল্লেখ করা হয় কদাচিত্। সবচাইতে বড় কথা হইল, ঢাকায় দুই-একটি গাড়ি চলিলেও আন্ত:জেলা গাড়িগুলি একদম বিশ্রাম নিতে থাকে। আমরা জানি, সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির আন্ত:জেলা বাস সার্ভিস রহিয়াছে। চট্টগ্রাম, বগুড়া, কুমিল্লা, পাবনা, রংপুর, বরিশাল ও সিলেটে নিজস্ব বাসডিপোও আছে। আছে অনেক কার্গো বা ট্রাক। কিন্তু আন্ত:জেলা রুটে তাহাও বাহির হয় না। যদি সরকার ঘোষণা করে যে, হরতালে সরকারি গাড়ির ক্ষয়ক্ষতির জন্য অতিরিক্ত ট্যাক্স ধরা হইবে বা জরিমানা আদায় করা হইবে, তাহা হইলে হরতাল সংস্কৃতির অবসান হইতে পারে। তখন হরতালের বিকল্প নিয়া চিন্তা করা সকলের জন্য অপরিহার্য হইয়া পড়িবে বৈকি। মার্কিন রাষ্ট্রদূত হইতে শুরু করিয়া অনেকেই বলিতেছেন বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক। বিশেষত সমৃদ্ধ অর্থনীতির কথা বলা হইতেছে। এইজন্য যাহাতে হরতাল ডাকিতে না হয়, এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন সর্বাগ্রে। গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি সকলে ন্যায়-নিষ্ঠাবান থাকিলেই কেবল ইহা সম্ভব।