[ আ ন্ত র্জা তি ক ]
রাজনীতির জটিল আবর্তে ভারত সেক্যুলার ও নন সেক্যুলারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা
প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৩৭
ভারতকে ভাগ করার দায়ে অতিশয় গোঁড়া হিন্দু নাথুরাম গডসে ৩০ জানুয়ারি গুলি করে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করেন। নাথুরাম গডসে এজন্য শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত হননি। পাঞ্জাব হাইকোর্টে এই মামলার শুনানিকালে তিনি গান্ধীকে একজন ভণ্ড বলে অভিহিত করেন। নাথুরাম গডসে একথাও বলেন, মুসলমানদের দ্বারা হিন্দুদের নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে নিহত হতে দেখলেও গান্ধী খুশি হতেন। হিন্দুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হত্যাযজ্ঞ যত বেশি সংঘটিত হবে গান্ধীর ধর্মনিরপেক্ষতার নিশান বরদার তত উঁচু হবে। বহুত্ববাদের মূল্যবোধ ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে ভারত চরম মূল্য দিয়েছে। লক্ষণীয়, আজ ভারতে এমন একটি গোষ্ঠীর জন্ম হচ্ছে যারা হামাগুড়ি দিয়ে ক্রমশ এগিয়ে আসছে। এদের উদ্দেশ্য—এরা ভিন্নধর্মাবলম্বী, একই সাথে বহুত্ববাদের আদর্শ বুকে লালন করেন, স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা যাদের আদর্শ; তাদের মূলোত্পাটন। এই গোষ্ঠীটি অপেক্ষাকৃত কম নির্দয়তার সাথে ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে আক্রমণ করে চলেছে। একই সাথে তারা ধর্মের নামে দল বড় করছে, ভক্ত বাড়াচ্ছে।
জাতীয় তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনের উল্লেখ করে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্দে বলেছেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ব্যাপক বিস্তারে বিজেপি এবং আরএসএস বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করেছে। তিনি আরও বলেন, সমঝোতা এক্সপ্রেস ট্রেন ও মক্কা মসজিদে বোমা ফিট করা হয়েছিল। বোমা ফাটানো হয়েছিল মালে গাঁওতে। আমরা এই কর্মকাণ্ড উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি....।
ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই অভিমতকে কিছুটা সংবেদনশীল বা উত্তেজক ধরে নিলেও আমি আশা করি, সীমান্তে সংঘটিত ঘটনাবলী ও ভারতের অন্যান্য ক্ষেত্রের গোলযোগপূর্ণ অবস্থাকে সামনে রেখে তিনি এই মন্তব্য করেননি। এসব কথা তিনি বলেছেন জয়পুরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের রুদ্ধদ্বার সভায়। অবশ্য তার এই অভিযোগ সন্দেহের উদ্রেক করেছে। অনুমিত হচ্ছে, বিজেপি ও আরএসএসকে অপবাদ দিতেই তিনি এসব কথা বলেছেন।
আমার সাথে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক্ষেত্রে কোন কলহ নেই। কেননা সেক্যুলারিজমের মূল নীতিমালা থেকেই উল্লেখিত দুটি গ্রুপ সরে গেছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিন্দের যা করণীয় ছিল তা হলো গোয়েন্দাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি প্রমাণসহ উপস্থাপন করা। ফেব্রুয়ারির সংসদ অধিবেশনে এ সম্পর্কিত একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের ব্যবস্থাই ছিল তার জন্য উপযুক্ত কাজ। একই সাথে ইসলামী মৌলবাদ যেখানে প্রশাসনের জন্য একটা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে সেখানে হিন্দু টেরোরিজম একটা বড় ধরনের বিপজ্জনক হুমকি বটে। কেননা ভারতে হিন্দুরা সংখ্যাগুরু। এর ফলে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল সন্ত্রাসের মাধ্যমে দূষিত একই সাথে সংক্রমিত হওয়ার আশংকা। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প সামাল দেয়া গেলেও সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় ফুঁসে উঠলে তা আরও বিপজ্জনক, যা ফ্যাসিজমে পরিণত হতে পারে।
জয়পুরের ঐ রুদ্ধদ্বার সভাতেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আরও অভিযোগ তুলেছেন যে, হিন্দুু জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাস মুসলমানদের প্রতি জবাব স্বরূপ, কথিত আছে যা পাকিস্তান থেকে আগত। কথাটা হয়ত সত্যি; কিন্তু দেশের পরিস্থিতি যেভাবে এগুচ্ছে তাতে এই বক্তব্যে কোন প্রতিকার মিলবে না।
পাকিস্তানের এক বুদ্ধিজীবী এই মর্মে ই-মেইল করেছেন যে, ভারতের বহু সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় পাকিস্তানের যে সম্পৃক্ততা বিদ্যমান তা অস্বীকার করা যাবে না। বিশেষ করে ২৬ নভেম্বরের ঘটনার কথা। একই সাথে একথাও অনস্বীকার্য যে, ভারতের বুকে ভারতীয় মুসলমানদের ঘুরে দাঁড়ানোর অনেক সংগত কারণ রয়েছে। সব মিলিয়ে আজ থেকে ষাটটি বছর ধরে তাদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে যেসব বৈষম্য হয়েছে তাও ভাবতে হবে। বাবরী মসজিদে আক্রমণ এবং গুজরাটে মুসলিম নিধনের বিষয়টিও স্মরণে রাখতে হবে।
পাকিস্তানের ঐ বুদ্ধিজীবী আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, ক্রমবর্ধমান সহিংস বিশ্বে পশ্চিমা দেশগুলো প্রাকৃতিক সম্পদ কুক্ষিগত করতে সর্বত্রই রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে লিপ্ত। কারোই এক্ষেত্রে বিস্মিত হওয়া উচিত নয় যে, সহিংসতা নতুন করে সহিংসতার জন্ম দেয়। এভরি এ্যাকশন হ্যাজ এ রিএ্যাকশন, যা সম্প্রতি আমরা দেখেছি মালি ও আলজেরিয়ায়, ফ্রান্সের ‘মিসএডভেঞ্চারে’।
বিজেপির রেসপন্স সংগত কারণেই বৈরিতাপূর্ণ। বিজেপি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়েছে, একই সাথে ভারত জুড়ে হরতাল আহবানের হুমকি দিয়েছে। উল্লেখ্য, কল্যাণ সিংকে দলে ফিরিয়ে নেয়ার পরে তার মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময় বাবরী মসজিদের শেষ ইটটিও খুলে নেয়া হয়েছিল। ফলে বিজেপিও হুল ফোটানোর ক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে বিজেপিও স্বভাবত আত্মরক্ষায় ব্যাপৃত হবে।
কংগ্রেসে রাহুল গান্ধী নাম্বার টু ব্যক্তিতে পদোন্নতি পেয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিন্দে তার জেল্লা, গুণগরিমা আবিষ্কার ও প্রচারে ব্যস্ত হতে পারেন। অনেক বিষয় তার দৃষ্টিগোচরেও আগ্রহী হবেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো দলীয় লোকজনের কাছে এই আচরণের মূল্য যত্সামান্য। কেননা দলীয় লোকেরা রাহুল গান্ধীর নাম্বার টু হওয়ার পর তাকে আর ‘রাহুল’ ‘মি. রাহুল’ নামে সম্বোধনের পরিবর্তে ‘রাহুলজী’ বলে ডাকতে শুরু করেছেন।
সেক্রেটারি জেনারেলের পদ থেকে দলের ভাইস প্রেসিডেন্টের পদে উন্নীত হওয়ার মাধ্যমে এমনটি প্রতীয়মান হয় না যে, ২০১৪ সালে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রিত্বের পদে নমিনি হয়ে উঠেছেন। রাহুল বলেছেন, তিনি পার্টিকে গড়ে তুলবেন। এটা দেখতে দৃষ্টিকটু যে, দলের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, যিনি রাহুলের মাতা এবং দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছেলে রাহুল যৌথভাবে দল গড়ে তুলবেন। কিন্তু এটাই ভবিতব্য যে, বংশপরম্পরায় রাজনীতিতে অধিকাংশ কংগ্রেসী বিশ্বাসী এবং এক্ষেত্রে কোনই বিকল্প নেই।
এ দলে সোনিয়া গান্ধীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাই পালনীয়। যদিও মনমোহন সিংয়ের যথেষ্ট গুরুত্ব বিদ্যমান; কিন্তু তিনি ‘লেইম ডাক প্রাইম মিনিস্টার’-এ পরিণত হয়েছেন।
একথা সত্যি, রাহুল চমত্কার ও আবেগপূর্ণ ভাষায় জয়পুরে বক্তৃতা করেছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশ্ন করা যায় যে, এ বক্তৃতা কী তিনি নিজে লিখেছেন? দুর্নীতির মূলোত্পাটন অথবা দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ জরুরি শীর্ষক যে অবজারভেশন রাহুল গান্ধী দিয়েছেন তা খালি কলসি বাজানোর মতোই। দুর্নীতি উচ্ছেদে রাহুল কী করে কঠিন ও কঠোর হবেন যখন তিনি জানেন যে, তার একমাত্র ভগ্নিপতি রবার্ট ভদ্র অসাধু পন্থায় হরিয়ানায় জমি দখল করেছেন?
ভারতের জনগণ এবং দেশের বাইরের মানুষ দেশের বিদ্যমান সমস্যাদি রাহুল কীভাবে সমাধান করবেন তা জানতে উদগ্রীব। তার ভাল ভাল কথা শুনতে মানুষ সত্যিই অনাগ্রহী। আন্তর্জাতিক বিষয়াদি নিয়ে রাহুলের মুখ দিয়ে কখনোই একটি শব্দও শোনা যায়নি। কিন্তু যেহেতু তিনি প্রধানমন্ত্রী পদের একজন প্রার্থী সেক্ষেত্রে তার ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে বিশ্ববাসীর জানার আগ্রহ থাকবে বৈকি।
আমার ধারণা আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী পদের প্রার্থী হয়ত হবেন না।
সোনিয়া গান্ধী কান্না বিজড়িত কণ্ঠে রাহুলকে বলেছিলেন, ক্ষমতা হলো বিষের মতো। একথাও গভীরভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, মনমোহন বিদায় নিলেই রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হবেন। তবে আরও কিছু ব্যক্তিরও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম হিন্দী শেখার জন্য একজন গৃহশিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন।
সোনিয়া গান্ধী স্বয়ং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কমলনাথকে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে চলেছেন। কমলনাথ ডাভোসের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন। বাণিজ্যমন্ত্রী আনন্দ শর্মা দলের একজন সদস্য মাত্র। অতীতে বাণিজ্যমন্ত্রীই এ ধরনের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতেন।
তবে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন হবে ‘সেক্যুলার ও নন সেক্যুলার’ এই দুই ধারায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ; যদিও বিজেপি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নমিনেশন দেয়ার ব্যাপারে দু’বার চিন্তা করবে। প্রথমত মোদী সারাদেশকে পোলারাইজ করবেন, দ্বিতীয়ত মোদীকে হবু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলে বেজিপি মিত্রদের সংগঠিত করতে সমস্যায় পড়বে। বিজেপির মনে রাখা দরকার যে, বাজপেয়ীর প্রথম সরকারকে ১৩ দিনের মাথায় পদত্যাগ করতে হয়েছিল। কেননা অন্য দলগুলো কোয়ালিশন গড়তে অনাগ্রহী ছিল। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে ইতিহাসের যে পুনরাবৃত্তি ঘটে তা বলাই বাহুল্য।
ভাষান্তর :কায়কোবাদ মিলন
লেখক : উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক