[ স ং স্কৃ তি ]

সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিকট বাত্সরিক প্রার্থনা

২০০৭ থেকে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে একটি বিশেষ নিবেদন নিয়ে পত্রিকায় কলাম লিখি। প্রার্থনা নিবেদন করি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সকল অঞ্চলের এদেশের বাঙালির কাছে। যাতে ছিনতাই হওয়া প্রভাতফেরিকে ফিরিয়ে আনার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারেন সকলে। কিন্তু অনেকের চৈতন্যেই বিষয়টি নাড়া দিতে পেরেছে মনে হয় না। অতঃপর ইতিহাসের দিকে তাকাতে হলো। বাংলা ভাষার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বৈরী দৃষ্টি দেখে ১৯৪৮ সালেই প্রথম আতঙ্কিত হয়েছিলেন এদেশের সাংস্কৃতিক কর্মীরা। সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় প্রথম সোচ্চার হয়েছিল সাংস্কৃতিক অঙ্গন। বায়ান্নের পর থেকে প্রতিটি একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জন্য নতুন উদ্দীপনা নিয়ে এসেছে। বাঙালি সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। আমাদের স্বতন্ত্র মনন এবং আত্মিক শক্তির প্রণোদনা একুশে ফেব্রুয়ারি। আমরা যারা ষাটের দশকে শৈশব অতিক্রম করছিলাম তখন থেকে শুরু করে প্রায় দেড় দশক আগ পর্যন্তও একুশে ফেব্রুয়ারির পাশাপাশি প্রভাতফেরি শব্দটিকে অভিন্ন ভাবতে শিখেছি। মনে হয়েছে প্রভাতফেরি শব্দটির জন্ম এবং প্রয়োগ যেন শুধু একুশের জন্যই। এ কথা সকলেই মানবেন একুশে পালনের ধারাবাহিকতা যারা দেখে এসেছেন তারা উপলব্ধি করেন অন্য যে কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবস পালনের আয়োজন ও সুর থেকে একুশ বরাবরই আলাদা ছিল। পাকিস্তানি শাসনামলের শেষ কয়েকটি বছর স্মৃতিতে রয়েছে। তখন জাতীয় জীবনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস পালিত হতো সাড়ম্বরে। ১৪ আগস্ট, ২৩ মার্চ এবং ২১ ফেব্রুয়ারি। প্রথম দুটোতে ছিল উত্সবের মেজাজ। আর আলাদা রকম ভাবগাম্ভীর্য, শোক ও শপথের অঙ্গীকার নিয়ে উপস্থিত হতো একুশের কাকডাকা ভোর। মানতেই হবে একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জীবনে—এর সংস্কৃতি-ভাবনায় ভিন্ন আবেগ যুক্ত করেছে। নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করতে তাই মৌলিক আবেগ থেকে একুশে তর্পণের বিকল্প নেই। কিন্তু নাগরিক জীবনে একুশের আবেগকে খণ্ডিত করে ফেলা হয়েছে। প্রায় দুই যুগ আগে সামরিক শাসক নিজের নিরাপত্তার দিক বিচারে একুশের প্রথম প্রহর নাম দিয়ে রাত ১২ টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের রেওয়াজ চালু করে। একে বিনা প্রশ্নে মেনে নেয় নগরবাসী সংস্কৃতিকর্মীসহ সর্বশ্রেণীর মানুষ। আর সেইসঙ্গে একুশের চেতনায় জড়িয়ে থাকা প্রভাতফেরি নতুন প্রজন্মের কাছে ক্রমে অচেনা হয়ে যায়। ভুলে যাই বায়ান্ন থেকে গড়া একুশের আবেগকে। সেই প্রত্যুষে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ নগ্ন পায়ে কালো পতাকা, একুশের ব্যানার আর ফুল হাতে মিছিল নিয়ে এগুতো শহীদ মিনারের দিকে। কণ্ঠে থাকত একুশে গানের সুরমূর্ছনা। প্রভাতফেরি শব্দটি শুধু একুশের মিছিল বোঝাতেই যেন জায়গা করে নিয়েছিল। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনে লাল সূর্যটাও তো একুশে ভাবনা, প্রত্যয় ও প্রত্যাশার প্রতীক। প্রভাতফেরি এসে মিশেছে শহীদ মিনারে। সামনে লাল সূর্য যেন নতুন দিনের ইঙ্গিত নিয়ে উদিত হচ্ছে। এখন মাঝরাতে আলোর কারসাজিতে লাল সূর্যের উদয় ঘটে শহীদ মিনারে। কৃত্রিম আবেগ দিয়ে ইতিহাসকে ঢেকে রাখার এক অদ্ভুত নাগরিক প্রয়াস। বাঙালি সংস্কৃতি রাত ১২টা ১ মিনিটকে দিনের প্রথম প্রহর বিবেচনা করে না। আবহমান বাংলার দিনের শুরু প্রত্যুষে আর দিনের অবসান সন্ধ্যায়। পাশ্চাত্যের চব্বিশ ঘণ্টা গণনায় দিনের প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১ মিনিট। পাশ্চাত্যের অনুসরণেই যেন মাঝরাতে চলে গেলো একুশে তর্পণ এবং প্রায় বিনা প্রতিবাদেই। কিন্তু স্বাধীনতা দিবস আর বিজয় দিবসে তো প্রত্যুষে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। প্রভাতফেরি একুশের সকালে শহীদ মিনারে বাঙালির শ্রদ্ধা নিবেদনের মিছিলের প্রতীকী শব্দ। শ্রদ্ধাবনত বাঙালির শহীদ মিনারে যাত্রার প্রভাতি এই মিছিল তো প্রভাতফেরিতেই জড়িয়ে আছে। আমাদের নাগরিক জীবনের বাইরে গ্রামগঞ্জে এখনো বাঙালি একুশের শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রভাতফেরির মধ্য দিয়ে। একুশের গানের মূর্ছনায় প্রভাতফেরির যাত্রার এই অভিনবত্ব নতুন প্রজন্মকে কৌতূহলী ও আবেগাপ্লুত করে তুলবে। খোঁজ করবে আমাদের ভাষাপ্রেম আর দেশপ্রেমের ইতিহাস। এভাবেই প্রাণিত হবে তারা। এখন একুশে শুধু বাংলাদেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে বিশ্ববাসী। এই ভাষা দিবসে একবার বিশ্ববাসী ফিরে তাকাবে ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার এদেশটির দিকে। অনুকরণ করবে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলির রেওয়াজকে। বহুকাল আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মীরা একুশের প্রত্যুষে প্রভাতফেরি করে আসছেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে উত্সভূমির অনুকরণে বিশ্ববাসীও প্রভাতফেরিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। অথচ আমরাই হঠকারী সিদ্ধান্তে প্রভাতফেরিকে বিসর্জন দিয়ে মধ্যরাতে একুশের চেতনা খুঁজে ফিরছি। আমাদের ধারণা ছিল প্রভাতফেরি হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট এদেশের মুক্তমনের সংস্কৃতি কর্মীদের মর্মে আঘাত করবে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াহীনতায় বুঝতে পারলাম সর্বংসহা আমরা সবই সয়ে গেছি। মনে পড়ে ২০০৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মীয়মাণ শহীদ মিনারের পাদদেশে আয়োজিত একুশে অনুষ্ঠানে আমি প্রভাতফেরির সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম। এই আহবান আমার ছাত্র-ছাত্রীদের মনে নাড়া দিয়েছিল। তাই ২০০৮-এর একুশের প্রত্যুষে প্রভাত ফেরিতে ফিরে যাওয়ার একটি প্রত্যয় ওদের অনেকের মধ্যে তৈরি হয়। ২০০৭-এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একুশে উদ্যাপনের প্রস্তুতিসভায় আমি একই আহ্বান জানিয়েছিলাম। এর গুরুত্ব মেনে নিয়েছিলেন উপস্থিত সকলেই। তবে মানসিক প্রস্তুতির জন্য সে বছরটি রেখে ২০০৮-এ ২১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ১ মিনিটে নবনির্মিত সুউচ্চ শহীদ মিনারের পাদদেশে পুষ্পস্তবক অর্পণের পাশাপাশি প্রভাতফেরির জন্যও প্রত্যুষ উন্মুক্ত রাখা হয়। প্রচণ্ড ভাললাগার একুশে ফেব্রুয়ারির প্রত্যুষ আসে ২০০৮-এর জাহাঙ্গীরনগরে। জমজমাট হয়ে ওঠে প্রভাতফেরি। রাতের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া ক্লান্ত ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অনেকে প্রভাতফেরিতে অংশ নিতে না পারলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, দুই একটি হলসহ কোনো কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মী, ছাত্র-ছাত্রীরা প্রভাতফেরিতে অংশ নেয়। সকাল সাতটার মধ্যেই এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয় শহীদ মিনার চত্বরে। কয়েক শ’ শিক্ষার্থীর বিশাল মিছিল নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজের শিক্ষকরা এসে জড় হন। এরপর বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে থাকে তিন-চার কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের সুবিশাল মিছিলের বহর। একের পর এক প্রভাতফেরিতে সয়লাব হয়ে যায় চারপাশ। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ মিনারের বিশাল চত্বর। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সঙ্গীত স্কুলের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারের বেদিতে চলতে থাকে ভাষার গান। এরপর থেকে প্রতি বছরেই সরকারি নিয়মে মধ্যরাতের একুশে তর্পণের পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাতফেরিরও আয়োজন থাকে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন আরেকটু উদ্যোগী হলে আমরা নিশ্চয় মধ্যরাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো। প্রভাতফেরি তার পূর্ণ ঔজ্জ্বল্য নিয়ে জাহাঙ্গীরনগরের ক্যাম্পাসে পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাবে। আর তা অনুকরণীয় হয়ে দেশজুড়ে একুশের গৌরব ফিরে আসবে। ভাষা আন্দোলনের ভেতর রাজনৈতিক আবেদনের চেয়ে সাংস্কৃতিক আবেদন ছিল সবচেয়ে প্রত্যক্ষ। সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী সবসময় প্রতিপক্ষের সাংস্কৃতিক শক্তিকে ভয় পায়। মনে করে সাংস্কৃতিক শক্তি একটি জাতিসত্তাকে আলোকিত ও স্বাজাত্যবোধে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে সেই জাতিকে বশংবদ করে সুবিধার ফসল ঘরে তোলা কঠিন। প্রাচীন বাংলায় এগারো-বারো শতকে বাঙালি পাল রাজাদের সেনাবাহিনীতে চাকরি করতে আসা দাক্ষিণাত্যের সেন বংশীয় ব্রহ্ম-ক্ষত্রীয় সেনাপুরুষরা বাংলার সিংহাসন দখল করেছিল। বেআইনিভাবে সিংহাসন দখল করা সেন রাজারা মানসিকভাবে ছিল ভীত। বাঙালির সংগ্রামী ঐতিহ্যের কথা তাদের অজানা ছিল না। তাই নতুন প্রজন্মের বাঙালি যাতে তাদের সংগ্রামী ঐতিহ্যের খোঁজ পেয়ে প্রতিবাদী হতে না পারে তাই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যশূন্য করতে চেয়েছে। দেশীয় ভাষা চর্চা নিষিদ্ধ করেছে। শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। অনেককাল পর একই কাণ্ড করেছিলেন পাকিস্তানি শাসকরা। বাঙালি নেতৃত্ব অখণ্ড পাকিস্তানের স্বপ্ন নিয়েই আন্দোলন করেছিলেন। ‘হাত মে বিড়ি মু মে পান/ লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান শ্লোগান’ দিয়েছেন অন্তরের তাগিদ থেকেই। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা সে মূল্য দেননি। তাদের চোখে ছিল পূর্ব বাংলা অর্থাত্ পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ শোষণের নেশা। সুতরাং প্রতিবাদী বাঙালিকে প্রশমিত করতে তারা পরবর্তী প্রজন্মের বাঙালিকে নিজেদের অনুগত বশংবদ বানাতে চেয়েছে। তাই নতুন প্রজন্মের বাঙালির বোধ থেকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মুছে ফেলা ছিল জরুরি। সাহিত্য ও সংস্কৃতির বাহন ভাষার ওপর তাই তারা প্রথম আঘাত হানে। জাতীয় আন্দোলনের এক একটি প্রতীক যুগ যুগ ধরে প্রজন্মকে প্রণোদনা দেয়। একারণে অশুভ শক্তি সবসময় এসব প্রতীককে ভয়ের চোখে দেখে। প্রতীক উপড়ে ফেলতে চায়। বায়ান্নের প্রথম শহীদ মিনারকেও ভেঙ্গে ফেলেছিল পাকিস্তানি শাসকচক্র। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও গণহত্যার পাশাপাশি শহীদ মিনার ধ্বংস করাটা ছিল হানাদারদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির একটি উল্লেখযোগ্য প্রেরণাদায়ী শ্লোগান ছিল ‘জয়বাংলা’। সংগ্রামী বাঙালিকে তেজদীপ্ত করে তোলায় জয়বাংলা শ্লোগানের অনন্য ভূমিকা ছিল। আজ তাই প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলো ‘জয়বাংলা’ শ্লোগানকে সযত্নে এড়িয়ে চলে। চারিত্রিক দিক থেকে ভাষা আন্দোলন ছিল সাংস্কৃতিক আন্দোলন। অতীতেও যেমন ছিল ভবিষ্যতেও তেমনি বাঙালির অধিকার আদায়ের দাবিতে ভাষা আন্দোলনের চেতনা ভূমিকা রাখবে। সকল আন্দোলনের চেতনা আসবে ভাষা আন্দোলন থেকে। প্রভাতফেরি হবে সে সব আন্দেলনের প্রতীকী শক্তি। একারণে সংস্কৃতি ভাবনার সুস্থ ধারা বলবে আমরা প্রভাতফেরিকে হারাতে চাই না। হারাতে চাই না একুশের আবেগকে। এই আবেগকে ধারণ করে দ্রোহ জাগাতে আজ তাই সাংস্কৃতিক কর্মীদের জেগে ওঠা জরুরি। রাত ১২টা ১-এর বৈরী সংস্কৃতি থেকে মুক্ত করে আবার প্রভাতফেরির একুশে উদযাপনে ফিরে যেতে চায় একুশের চৈতন্যস্নাত মানুষ। কারণ একুশকে এর স্বমহিমায় পুনঃস্থাপন না করে প্রজন্মকে অন্তত ভাষাপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা যাবে না। সকলেই জানেন, দেশপ্রেমের জন্ম তার ভাষা প্রেমের মধ্য থেকেই।  লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। shahnawazju@yahoo.com