জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও বাস্তবতা

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্ববৃহত্ বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি কলেজের স্নাতক, স্নাতক সম্মান ও মাস্টার্স কোর্স পরিচালনার জন্য। প্রতিষ্ঠার যে উদ্দেশ্য ছিল তা হয়তোবা পূরণও হয়েছে। কেননা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তো তদারকি করছে সকল সরকারি-বেসরকারি কলেজের স্নাতক, স্নাতক সম্মান ও মাষ্টার্স বিষয়ক কোর্স। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য কি এখনো পূরণ হয়েছে? উত্তর হবে না। আমাদের সবারই জানা আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সকল সরকারি-বেসরকারি কলেজের স্নাতক, স্নাতক সম্মান ও মাষ্টার্স কোর্সের সেশনজট মুক্ত করার জন্য। কিন্তু তা আজও সম্ভব হয়নি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট দূর করার পরিবর্তে তা দিন দিন আরো বেশি হচ্ছে। আমরা একটু লক্ষ্য করলেই দেখতে পাই, দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট যেখানে দিন-দিন কমছে সেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট বাড়ছে বাংলাদেশ বিমানের গতিতে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় যে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কতটা শোচনীয়। শিক্ষাবর্ষ-২০০৭-২০০৮ খ্রিস্টাব্দে যে সকল ছাত্র-ছাত্রী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে তাদের স্নাতক সম্মান কোর্সটি এখনো শেষ হয়নি। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক সম্মান কোর্সে যে সকল ছাত্র-ছাত্রী ২০০৭-২০০৮ সেশনে ভর্তি হয়েছে তারা আজ ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে মাস্টার্স পরীক্ষায় অংশ নিতে যাচ্ছে হয়তোবা আগামী দুই অথবা তিন মাসের মধ্যে তাদের মাস্টার্স পরীক্ষা শেষও হয়ে যাবে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ২০০৮-২০০৯ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র-ছাত্রী তারাও আজ স্নাতক সম্মান কোর্সের চূড়ান্ত পরীক্ষার অপেক্ষায় আছে। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৭-২০০৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েও কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৮-২০০৯ শিক্ষাবর্ষ অর্থাত্ একবছরের ছোট শিক্ষার্থীদের চেয়েও দেরিতে স্নাতক সম্মান কোর্সটি শেষ করতে হবে? আরো একটি প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে কি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সরকারি চাকুরীতে প্রবেশের বয়সসীমা দুই বছর বেশি? জবাব হচ্ছে, না। বাস্তবতা হচ্ছে ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সরকারি চাকুরীতে প্রবেশের সময়সীমা ৩০ বছর। অনুরূপভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও সরকারি চাকুরীতে প্রবেশের বয়সসীমা মাত্র ৩০ বছর। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকুরীতে প্রবেশের বয়সসীমা যদি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো মাত্র ৩০ বছর-ই হয় তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে অতিরিক্ত যে দুই বা তিন বছর সময় বেশি লাগছে এর দায়ভার কে নিবে? এখান থেকে কি আমাদের উত্তরণের কোন উপায় নেই? জাতির কাছে জানতে ইচ্ছে করছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সময়ের কি কোন দাম নেই ? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কি পরিবার বলতে কিছু নেই? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কি মা-বাবার প্রতি কোন দায়-দায়িত্ব নেই ? থাকলে কিভাবে পালন করবে সে দায়িত্ব ? আমার আরো জানতে ইচ্ছে করছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলেই কি এতো অবহেলা ? শেষ পর্যায়ে এসে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি এই অবহেলা আর কত দিন চলবে ? আমরা জানি যে, মহামান্য রাষ্ট্রপতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত আচার্য। আমি আশা করছি মহামান্য রাষ্ট্রপতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট নিরসনে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনের অনিশ্চয়তা দূর করে আলোর পথ দেখাবেন। আমি আরো আশা করছি বর্তমান সরকারের সফল মন্ত্রী মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপিও বিষয়টি একবার ভেবে দেখবেন। শুধুমাত্র মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নন, আমি আরো আশা রাখছি যে, জাতির জনক ও স্বাধীনতার স্থপতি এবং মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কন্যা- দেশরত্ন ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট নিরসনে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করবেন এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মুক্তি পাবে সেশনজট নামক অভিশাপ থেকে, না হলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হারিয়ে যাবে অথৈ সাগরে। পরিশেষে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, এখনই যদি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট কমাতে কর্তৃপক্ষ গ্রহণযোগ্য কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করেন তবে সেদিন হয়তোবা খুব বেশি দেরি নেই যেদিন এদেশের মানুষ বলবে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে একটি জাতীয় জেলখানা! অতএব, এ ব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ নেয়া উচিত।  লেখক : শিক্ষার্থী, স্নাতক (সম্মান), বাংলা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। email: tareq.rahman11@yahoo.com