স্মরণ

জীবন শিল্পী রাজিয়া মাহবুব

সমপ্রতি প্রয়াত লেখক রাজিয়া মাহবুব শুধু একটি নাম নয় প্রতিষ্ঠানও। ষাটের দশকে মানুষকে আলোকিত করার জন্য শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে যে কাজ শুরু করেছিলেন, মৃত্যুর কয়েক বছর আগ পর্যন্ত তা অব্যাহত রেখেছিলেন। বয়স, অসুস্থতা তার মনোবলকে এতটুকু খাটো করেনি। তিনি সারাজীবন অন্যায়, অসত্য, বৈষম্যের বিরুদ্ধে লিখে গেছেন। সামাজিক সংকট, নির্মমতা তাঁকে কষ্ট দিয়েছে কিন্তু পর মুহূর্তেই তিনি প্রতিরোধে উজ্জীবিত হয়েছেন এবং তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা কাজে লাগিয়ে সঠিক নিদের্শনাও দিয়ে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কন্ট্রোলার অব একজামিনেশন মাহবুবুর রহমান খানের স্ত্রী রাজিয়া মাহবুবের জন্ম ১৯২৭ সালে। বাবা ম্যাজিস্ট্রেট আরশাফুজ্জামান এবং মা নূরজাহান বেগম। দেশের বাড়ি মাদারীপুর। রাজিয়া মাহবুব কোলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন করেছিলেন। ঢাকা হলিক্রস কলেজে অধ্যাপনায় কর্মজীবন শুরু করেন। পঞ্চাশের দশক থেকে তাঁর লেখালেখির শুরু। এই চর্চার মধ্য দিয়েই তিনি অনুভব করেন দেশের শিশু সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার তাগিদ। সেই চিন্তা এবং অনুভব থেকেই তিনি ১৯৫৯ সালে গড়ে তোলেন লিটল ফ্রেন্ডস এসোসিয়েশন। এই সংগঠনের শিশু সদস্যরাই পরবর্তীতে ব্রিটিশ কাউন্সিল মঞ্চে তার সুদক্ষ পরিচালনায় তাঁরই লেখা বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করে নতুন করে আলোচনায় আসে। এই সময়ে তিনি শিশুদের জন্য পানতুয়া নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেও নন্দিত হয়েছিলেন। ষাটের দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর লেখা নাটক প্রায় নিয়মিত প্রচারিত হতো। এই নাটকগুলো পরিচালনার দায়িত্বেও থাকতেন তিনি। তখন দেশে বাংলা মাধ্যমের কোন কিন্ডারগার্টেন স্কুল ছিল না। তিনিই প্রথম এর উপযোগিতা গভীরভাবে উপলব্ধি করে ঢাকার ওয়ারীতে নিজ বাড়িতে ১৯৬১ সালে লিটল ফ্রেন্ডস কিন্ডারগার্টেন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সত্তরের দশকে তাকে এবং লেখালেখির বিষয়কে ঘিরে খুব কাছ থেকে তাঁকে জানার সুযোগ পাই। শুধু লেখালেখিই নয়, এই স্কুলকে ঘিরে তার বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনামূলক, আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক কাজকর্ম সেই সময়ে আমাকে অনুপ্রাণিত ও পুলকিত করেছে। শিশুদের এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে এ সময়ে তিনি যেন একটি অধ্যায়ের সূচনা করলেন। উদার দেশপ্রেমিক মন তার চারপাশের পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পেরেছিলেন বলেই মানুষের সাথে তার সকল দূরত্ব ঘুচিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অনন্য, অসাধারণ। দেশ ও মানুষকে ভালবাসার এই তীব্র অনুভব তাঁর লেখালেখির মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে নিরন্তর। তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন মানবিক মনের সৃষ্টিশীল লেখক। তিনি একটি উপন্যাস এবং বহু ছোটগল্প লিখে গেছেন। প্রবন্ধের বই রয়েছে বেশ কয়েকটি। ‘খাপছাড়া’ নামে তাঁর ছোটগল্পের বইটি ১৯৫৭ সালে ইউনেস্কো পুরস্কার পায়। তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসের নাম ‘বন্ধন’। মধ্যবিত্ত বাঙালির মানসিকতার নানা বিচিত্র দিক ও টানাপোড়েন সাবলীলভাবে উঠে এসেছে তাঁর এই উপন্যাসে। পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে থাকায় আমার সুযোগ হয়েছে বিভিন্ন সময়ে তাঁর লেখা বেশকিছু ছোটগল্প পড়ার। তাঁর গল্পের কাহিনীতে বিভিন্ন ধরনের কার্যকারণ, নিরপেক্ষ ভাবাবেগ, নারীর সামাজিক অবস্থান, পরিবারের বিচিত্র জটিল মানসিকতা, বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া চমত্কারভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছে। তাঁর গল্পের কাহিনীর মধ্যে পাঠক একটি জীবন বোধের মান আবিষ্কার করতে পারেন। ‘দুর্ভাগিনী’ ও ‘মুখরিত গহনে’ তার উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প গ্রন্থ। ‘সাগরকন্যা’ ও ‘ভুতভুতুম’ ছোটদের জন্য লেখা নাটক। জীবনঘনিষ্ঠ প্রগতিশীল এই লেখক ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমী, ১৯৬৭ সালে শিশু সাহিত্যের জন্য লন্ডন থেকে ইসাবেলা ইটন পুরস্কার পান। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ তাঁকে পুরস্কৃত করে। ১৯৬৫ সালে স্কুলপড়ুয়া দুটি সন্তান নিয়ে তিনি বিধবা হলেও নিষ্ঠা ও প্রজ্ঞা দিয়ে একটি আলোকিত পরিবার গড়ে তোলেন। মেয়ে মাসুমা খান চারুকলা থেকে গ্রাজুয়েশন করেছেন, বর্তমানে সাউথব্রীজ স্কুলে কর্মরত। ছেলে এস আর খান বিআইটি-র ম্যানেজিং ডিরেক্টর। জানা গেছে ষাটের দশকে তাঁর বাড়িতে নিয়মিত বসতো সাহিত্যের আড্ডা। সেই আড্ডায় মুনীর চৌধুরী, লিলি চৌধুরী, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক অজিত গুহ প্রমুখ অংশগ্রহণ করতেন। তাঁর জীবনের সমস্ত কর্মকান্ড পর্যালোচনার সব শেষে এই সত্যেই উপনীত হওয়া যায়, কাজের মধ্যে সংহতি সৃষ্টি করে, বেশকিছু সার্থক সংকেত রেখে গেছেন, যার ভেতর দিয়ে তিনি নিজের জীবনকে অতিক্রম করে বৃহত্ এক সত্যের ওপর আলো ফেলে গেছেন, যা অমরত্বেরই আলো। এখানেই তিনি অনবদ্য, সার্থক। লেখক : সাংবাদিক ও নারী অধিকার কর্মী