অন্য তারুণ্য

মুক্তির আলোয়

ছোটবেলায় ভীষণ দুরন্ত স্বভাবের ছিলেন। সারাদিন খেলাধুলা, দুষ্টুমি আর ছোটাছুটি। একটু বড় হয়ে উদাস হয়ে যখন তখন ইচ্ছেমতো হারিয়ে যাওয়ার স্বভাবটা বেশ ভালোমতোই জেঁকে বসল। বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে পড়তেন প্রায়ই। প্রিয় বন্ধুদের কাছে খুব আড্ডাবাজ আর চঞ্চল বলেই পরিচিত হলেন। ভাইয়ের সাথে সারাক্ষণ চলে তার খুনসুটি। ইচ্ছে করেই মাকে রাগিয়ে দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বকুনি খাওয়া হয়। এমন সৃষ্টিছাড়া স্বভাবের হলে কি হবে, কাজের বেলায় একদম ঠিকঠাক। মায়ের সব কাজে সাহায্য করা, ছোট ভাইয়ের দেখাশোনা করা, মন দিয়ে লেখাপড়া করা আর পাশাপাশি নানা রকম সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণ। সব সময় ভালোকে ভালোবাসা আর ভালো কিছু করার আগ্রহ। আর তাই মা-বাবা আর একমাত্র ভাইয়ের ভীষণ আদরেরই শুধু নয়, সবার কাছেই ‘খুবই লক্ষ্মী মেয়ে’। বলছিলাম সুহাসিনী মিষ্টি মেয়ে মুক্তির কথা। রশনী ফাতিমা মুক্তি। পিতা মরহুম মোসলেহ উদ্দিন (বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯৯৭ সালে নিহত), মা ফেরদৌসি আক্তার। অসাধারণ বিতর্ক করেন, ভালো আবৃত্তি আর চমত্কার অভিনয়ও করেন। বিতর্ক, আবৃত্তি আর অভিনয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পুরস্কার জিতে নিয়েছেন জেলা পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত। সাংগঠনিক কাজেও সক্রিয় রয়েছেন। যুক্ত রয়েছেন এনডিএফবিডির (ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন অব বাংলাদেশ) সাথে। নিজেকে এনডিএফবিডির একজন বিতর্কশ্রমিক বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন তিনি। আগামী ‘ট্রাস্ট ব্যাংক ৭ম এনডিএফবিডি জাতীয় বিতর্ক উত্সব-২০১৩’ আয়োজনে এনডিএফবিডির সাথে কাজ করে যাচ্ছেন এ মুহূর্তে। এত কিছু করার পরও লেখাপড়ায় বরাবরই ভালো তিনি। মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, হলি ক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপ্রযুক্তি ও জিন প্রকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান), সব ক্ষেত্রেই ভালো রেজাল্ট করেছেন। বর্তমানে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। বিশ্ববিদ্যালয়ে খুবই জনপ্রিয় একটি মুখ মুক্তি। ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে লাইফ সায়েন্স অনুষদে প্রথম স্থান লাভের কৃতিত্ব অর্জন করেন সিজিপিএ ৪.০০-এর মধ্যে ৩.৮৭ পেয়ে। পাশাপাশি ২০০৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সেরাবক্তার গৌরবসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় সেরার পুরস্কার জিতে নিয়েছেন। মুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আয়োজনে সক্রিয় সংগঠক হিসেবে কাজ করছেন নিষ্ঠার সাথে, যুক্ত আছেন একাধিক সংস্কৃতি, সাহিত্য ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে। বর্তমানে তিনি মাভাবিপ্রবি ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি ও বায়োটেক ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়া স্বনামে কিংবা ছদ্মনামে পত্রিকা ও ব্লগে লেখালেখিও করেন তিনি। সুযোগ পেলে কাব্যচর্চার চেষ্টাও চলে। প্রকৃতি, ষড়ঋতু, জোছনা-বিলাস, জোনাকির দল অথবা তারার মেলা, এমনকি নানান মানুষের নানান রকম জীবনধারণ আর বিচিত্র কর্মকাণ্ড সবই ভালো লাগে তার। ভালো লাগে না মানুষের দুঃখ-কষ্ট আর পত্রিকার খারাপ খবরগুলো। ‘চারিদিকে কেবল আনন্দ আর আনন্দ’—এমন একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন। জীবপ্রযুক্তি তার ভালোবাসা। তার মতে, এটি এমন একটি বিষয় যা প্রয়োগ করে মানুষের প্রতিটি মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য কাজ করা সম্ভব। বিশেষত খাদ্য সঙ্কট নিরসন ও বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিত্সায় জীবপ্রযুক্তিভিত্তিক গবেষণা অপরিহার্য অবদান রাখা সম্ভব হয়। ভবিষ্যতে উচ্চতর পড়াশোনা শেষে গবেষণায় নিয়োজিত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। পছন্দের পেশা কী? উত্তরে তিনি বলেন, ‘শিক্ষকতা। কারণ, নিজের লব্ধ জ্ঞান ও স্বপ্ন অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যায় আর কখনও বুড়িয়ে যাওয়ারও ভয় থাকে না, কেননা সব সময় তরুণ প্রজন্মের সাথে থাকা যায়।’ সৃজনশীল হতে হলে কী দরকার? তার উত্তর, ‘পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই প্রতিভা নিয়ে জন্মায়, প্রতিভার বহিঃপ্রকাশের জন্য চাই শুধু একটি স্বপ্নবাজ মন, একটু চেষ্টা আর আত্মবিশ্বাস।’ দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দায়বদ্ধতা তো অবশ্যই রয়েছে, কেননা দেশের মানুষের ভালোবাসা, সমর্থন আর কষ্টার্জিত অর্থের বিনিময়েই তো লেখাপড়া করে নিজেকে গড়ে তুলতে পারছি। দেশের মানুষকে ভালোবেসে তাদের কল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করতে চাই। সবার সব ছোট ছোট কাজগুলোকে একত্রিত করেই একদিন আমাদের দেশটা অনেক বড় পর্যায়ে যেতে পারে। তাই সবাই যার যার ক্ষেত্র থেকে দেশকে ভালোবেসে সততার সাথে নিজের কাজটুকু করা উচিত।’ বইয়ের পোকা এই মেয়ের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, থ্রিলার, অ্যাডভেঞ্চার, সায়েন্স ফিকশন, প্রবন্ধ, দেশি-বিদেশি সাহিত্যের কোনো কিছু পড়তে তার না নেই। গান শুনতে আর মুভি দেখতেও খুব পছন্দ করেন। তবে বেশি পছন্দ কার্টুন ও অ্যানিমেটেড ফিল্ম। প্রিয় পোশাক শাড়ি, রাবীন্দ্রিক ধাঁচের সাজ তার সবচেয়ে ভালো লাগে।