আড্ডা
বইমেলা প্রাণের মেলা
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৭:৪৪
জিসানের বইয়ের প্রতি তেমন আগ্রহ নেই, এরপরও প্রতিদিন বিকালে ভার্সিটির ক্লাস শেষে তিনি বন্ধুদের নিয়ে হাজির হন বাংলা একাডেমী চত্বরে। ওর সাথে থাকে নোশিন, সুমাইতা, তন্ময় আর মালা। মালার বই কেনার চেয়ে বেশি আগ্রহ লেখকদের অটোগ্রাফ নেওয়ার প্রতি। তবে তন্ময় বেচারার পকেট খালি হয় প্রতিদিন, সব বই-ই তার কিনে ফেলতে মন চায়। নোশিন আর সুমাইতা মেলায় কে কী করছে সেদিকেই নজর রাখে! এদের মতোই ভিন্ন ভিন্ন মনোভাব নিয়ে তরুণরা হাজির হয় এই বইমেলায়। শুধু নতুন বই নয়, তরুণদের উপস্থিতিতেই যেন এ হয়ে ওঠে প্রাণের মেলা। এ নিয়েই এবারের আড্ডা।
তন্ময় :বইমেলা যদি বছরজুড়ে চলত কত মজাই না হতো, নতুন বই দেখলেই পড়তে ইচ্ছে করে। আজও কয়েকটা কিনলাম।
সুমাইতা :আমার তো মেলাতে ঘুরতেই ভালো লাগে, কত রকমের মানুষ আসে! শখ করে একটা কবিতার বই কিনেছিলাম। ওরে বাবা! কী কঠিন কঠিন কথা লেখা বইতে!
জিসান :আর তন্ময়, সারা বছর বইমেলা চললে তাহলে কি এই আমেজটা থাকত? আমরা কি এমন আগ্রহ নিয়ে আসতাম?
তন্ময় :তবে এর ফলে কিন্তু সব বই প্রকাশ ফেব্রুয়ারি মাসকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। সারাবছরই একই হারে বই বের হওয়া দরকার।
জিসান :তোর কথা ঠিক আছে, তারপরও এর মাধ্যমে লেখক-পাঠকদের মাঝে একটা যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে। আর মেলায় পাঠকদের ভিড় অবশ্যই নতুন লেখকদের উত্সাহিত করে।
মালা :তোরা কী সব শুরু করলি? আচ্ছা, মুহম্মদ জাফর ইকবাল কখন আসবেন কেউ জানিস?
নোশিন :আরে মেলায় এসেছিস, ঘুরে ঘুরে বই দেখ, লেখক কী দরকার?
মালা :সেই সুযোগ কি আর আছে? হাঁটারই জায়গা নেই, আর এতটুকু জায়গাতে দাঁড়িয়ে বই দেখব কীভাবে?
সুমাইতা :আসলেই, মেলার জায়গা আরও বাড়ানো উচিত। লেখক-পাঠক প্রকাশকের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু মেলার জায়গা বাড়ছে না কেন?
তন্ময় :জায়গা ঠিকই আছে, ‘সদরঘাট প্রকাশনী’ টাইপ স্টলগুলো সরিয়ে দিলেই অনেক ভিড় কমে যাবে।
জিসান :বই মেলার বইয়ের মান নিয়েও কথা আছে। অনেক বই-ই আছে যেগুলোর মান খুবই নিচু। এই বইগুলো মেলায় ঢোকে কীভাবে?
তন্ময় :কত বই পড়িস তুই! এভাবে সমালোচনা শুরু করলি!
নোশিন :বইয়ের প্রচ্ছদে ক্যাটরিনা কাইফের ছবি থাকলে আর উলটে দেখা লাগে না, বুঝাই যায় ভেতরে কী আছে।
মালা :এই ধরনের বই কারা লেখে?
সুমাইতা :কেন? তুই অটোগ্রাফ নিবি না কি?
নোশিন :আরে, ওর কী দোষ? যারা ছাপে, আর যারা ছাপতে দেয়, তাদের আরও বেশি সচেতন হওয়া জরুরি।
জিসান :হুম, তা না হলে কদিন পরে আর আসল লেখাগুলো খুঁজেই পাওয়া যাবে না। বাংলা একাডেমীর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তন্ময় :আর, সবার আগে দরকার পাঠকদের সচেতনতা, আমরা যদি খারাপ মানের বই না কিনি, তাহলে আস্তে আস্তে এ ধরনের প্রকাশনী এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে।
নোশিন :আজ থেকে বইমেলায় এলে অন্তত একটা ভালো বই কিনব আমরা, তাহলে ভালো বইয়ের বিক্রি বাড়বে, স্বভাবতই প্রকাশনা শিল্পেও স্থিরতা ফিরে আসবে।
জিসান :বাংলা একাডেমী থেকে বইমেলাটা একটু অন্য জায়গাতে সরিয়ে নিলে কেমন হয়? এই জায়গাতে এত ভিড় হয়ে যায় মাঝে মাঝে। বিরক্তি লাগে।
তন্ময় :হ্যাঁ, দীর্ঘদিন ধরেই এই বইমেলার আয়োজন নিয়ে মৌসুমী কিছু মৃদু কথাবার্তা হয় এবং ফেব্রুয়ারি শেষ হলেই সেই আলোচনা পরবর্তী বছরের জন্য মুলতবি হয়ে যায়। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এই আলোচনাটা আরেকটু জোরগলায় করার সময় এসেছে। এই বইমেলাটা আমাদের এবং একে বাড়িয়ে তোলাটা আমাদের সবারই দায়িত্ব।
নোশিন :প্রথমেই প্রশ্ন হচ্ছে—মেলার আয়োজন কেন? যেকোনো মেলার আসলে দুটো উদ্দেশ্য। প্রথমটি বাণিজ্যিক, দ্বিতীয়টি সাধারণ মানুষের বিনোদন। যদিও বিনোদনকে সামনে রেখেই সাধারণত মেলা আয়োজিত হয়, কিন্তু বাণিজ্যিক দিকটিই আসল উদ্দেশ্য। আমাদের বইমেলার দিকে গভীরভাবে তাকালে দেখা যাবে, অসীম সম্ভাবনা সত্ত্বেও বইমেলা থেকে এই দুটো উদ্দেশ্যের কোনোটিই খুব বেশি অর্জিত হচ্ছে না।
সুমাইতা :যেকোনো বিকেলে মেলায় প্রবেশ করে দেখ। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে যখন নাগরিক মানুষের বিনোদন প্রয়োজন, তখন তো কথাই নেই। শাহবাগ থেকে লাইনে দাঁড়াবি এবং সেই লাইনও রিকশা, গাড়ির মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে, হকারের পসরাকে ডিঙিয়ে মেলায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে তোকে ক্লান্ত করে ফেলবে।
তন্ময় :এসব দিনে বইমেলার কোনো স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে শান্তিমতো বই দেখা অসম্ভব একটি ব্যাপার। প্রচণ্ড ভিড়ে নিঃশ্বাস ফেলার জো থাকে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেককে চিনি, যারা বইমেলায় গিয়ে বই কিনতে না পেরে একাধিক ছুটির দিনে ফিরে এসেছেন। আমাদেরকে মেনে নিতে হবে যে, মানুষ এই মেলায় প্রবেশ করে বেড়ানোর আনন্দটুকু ভোগ করতে পারছে না, বইও কিনতে পারছে না। মেলা আয়োজন তাই সফল হচ্ছে বলা যাচ্ছে না।
জিসান :বইমেলা আয়োজন বাংলা একাডেমীর দায়িত্বের মাঝে পড়ে না, এই বইমেলা তাদের চালুও করা নয়, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে তারা এই মেলাকে তাদের আঙিনায় ধরে রাখছে। তা-ও যদি তাদের ব্যবস্থাপনা উন্নত মানের হতো, তাহলে হয়তো এক ধরনের সান্ত্বনা পাওয়া যেত, কিন্তু ব্যবস্থাপনার দীনতা বরং জনসমক্ষে একাডেমীর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের অযোগ্যতা ও অদক্ষতাকেই প্রকট করে তুলছে।