শাহবাগ আন্দোলন ও সামাজিক মাধ্যম
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৫৪
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগে জনগণের যেই দুর্মর আন্দোলন চলমান রহিয়াছে তাহার ডাক দিয়াছিল ব্লগার এন্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক নামক একটি সংগঠন। ইহা এক অভিনব ঘটনা বটে। আমরা দেখিয়াছি আরব বসন্তের আন্দোলনকারীরা ফেসবুক, টুইটার এবং ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলি ব্যবহার করিয়া আন্দোলনকে চালাইয়া গিয়াছে। কিন্তু এইখানে আন্দোলনের ডাক দিয়াছে খোদ ফেসবুকের একটি গ্রুপ। বলা যায়, এই আন্দোলনের ডাককে ঘিরিয়াই গ্রুপটি আবিষকৃত হইয়াছে। ৫ ফেব্রুয়ারির বিকালে কয়েকজন ব্ল¬গার বা অনলাইন ব্যবহারকারী যেই আন্দোলন শুরু করিয়াছিল, তাহা আজ সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণে বিশাল এক গণআন্দোলনে রূপ নিয়াছে। বহু বয়স, পেশা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ ইহাতে অংশ নিলেও, শেষ পর্যন্ত ইহা ব্ল¬গারদের আন্দোলনরূপেই পরিচিতি পাইয়াছে। নিঃসন্দেহে ইহা এক রাজনৈতিক আন্দোলন, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলি এই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করিতে পারিতেছে, নেতৃত্ব নিতে বা দিতে পারে নাই। নেতৃত্ব রহিয়াছে ব্লগারদের হাতেই। বরং কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা সংহতি প্রকাশ করিতে আসিয়া, বক্তৃতা দিতে গিয়া বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হইয়াছেন।
এই ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমকে নিয়া মানুষের উপলব্ধি পরিষ্কার হইয়াছে। হয়তো ¬ব্লগারদেরও নিজেদের কর্মতত্পরতা কতটা শক্তিশালী হইতে পারে, সে সম্পর্কে ধারণা পোক্ত হইয়াছে। সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীরা বন্ধুত্ব তৈরি করা, অবসর সময় কাটানো কিংবা বিনোদনের জন্য ইহা ব্যবহার করিয়া থাকে বলিয়া ধারণা প্রচলিত আছে। সামাজিক মাধ্যমের দুর্নাম বাড়িয়া যায় পরস্পর আক্রমণ কিংবা অ্যাবিউজ অথবা বহুসম্পর্ক নির্মাণ কিংবা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক নির্মাণের মৃগয়াক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হইবার কারণে। কিন্তু ইহার শক্তি ও সৌন্দর্যের দিকটি যেন উপেক্ষিত হইয়াই ছিল। পরস্পরের সঙ্গে ক্রমাগত যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে সামাজিক অগ্রগতির জন্য কার্যকরভাবে যে কাজ করা সম্ভব, তাহা যেন অজানাই ছিল। বাংলাদেশের প্রকৃত সমাজের লোকজন নাও জানিতে পারে, কিন্তু সাইবার পরিসরের অ্যাক্টিভিস্টরা কিন্তু বরাবরই সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক কিংবা আন্তর্জাতিক সকল ইস্যুতেই সাড়া দিয়া থাকে, পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক করিয়া থাকে। ২০০৮-এর সাধারণ নির্বাচন, বিডিআর ট্র্যাজেডি, বিমানবন্দরের সম্মুখে বাউলমূর্তি অপসারণ, আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণ, রূপগঞ্জে সেনাবাহিনীর হাউজিং প্রকল্প ইত্যাদি নানান ইস্যুতে ব্ল¬গ কমিউনিটি, ফেসবুক, কিংবা স্যাটায়ার সাইটগুলোতে ব্লগাররা প্রতিবাদ জানাইয়া থাকে, কখনোবা অনলাইন হইতে নামিয়া আসিয়া প্রকৃত সমাজে প্রতিরোধ গড়িয়া তুলে। সর্বস্তরের ব্লগারদের মধ্যে যেই বিষয়ে সবচাইতে বেশি ঐক্য, তাহা হইলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গটি, পাশাপাশি জামায়াত-শিবিরের মৌলবাদী রাজনীতির বিরোধিতা। এই ব্লগাররা বয়সে তরুণ, ইহারা বিশ্বায়ন-উত্তরকালে ভোক্তাসংস্কৃতির মধ্যে বড় হইয়া উঠিয়াছেন। এই তরুণ প্রজন্মের নানান বিষয়ে নিরাসক্তি আছে অথচ ভোগে আসক্তি রহিয়াছে; তদুপরি বলা যায়, পুঁজিতান্ত্রিক আচ্ছন্নতার মধ্যে থাকিয়াও ইহারা মৌলবাদ ও পশ্চাত্পদতাকে অপছন্দ করিয়া থাকেন। তাহাদের জাতীয়তাবাদী চেতনার মূল ভিত্তি তাই যাহারা মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ করিয়াছে তাহাদের অতি রক্ষণশীল রাজনীতিকে ঘৃণা। নারীদের দিক হইতেও এই বিবেচনার বাড়তি মাত্রা রহিয়াছে, কারণ রক্ষণশীল রাজনৈতিক মতাদর্শের অন্যতম শিকার হয় নারীরা।
বোঝা যাইতেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় কী রায় আসিতেছে তাহা তরুণ প্রজন্মের ব্ল¬গাররা ভালোমতো লক্ষ্য রাখিতেছিল। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দেওয়া প্রথম রায়টি মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাইয়াছে, কিন্তু দ্বিতীয় আসামিকে দেওয়া হইয়াছে যাবজ্জীবন। ইহা মানুষের প্রত্যাশার বাহিরে গিয়াছে। তাই ব্লগাররা ফুঁসিয়া উঠিয়াছেন। আরব বসন্ত কিংবা অকুপাই আন্দোলনের পরে শাহবাগের ঘটনা ইহাও প্রমাণ করিয়াছে যে সামাজিক মাধ্যম পরিবর্তন-প্রতিরোধের জন্য কী রকম কার্যকর একটি মাধ্যম। তাই ফেসবুক হইতে শাহবাগ মোড়ে যাইবার ডাকই কেবল দেওয়া হয় নাই, ফেসবুক-ব্লগে সমান্তরাল আন্দোলন যথারীতি চলিতেছে।