[ রা জ নী তি ]

আমেরিকার কাগজে কী লিখেছেন খালেদা

প্রচার সংখ্যার দিক থেকে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ হলো আমেরিকার ৬ষ্ঠ স্থান অধিকারকারী একটি প্রসিদ্ধ পত্রিকা। কিন্তু সেই তুলনায় অনেক নিম্নমানের একটি পত্রিকা হচ্ছে ‘ওয়াশিংটন টাইমস’, প্রচার সংখ্যার দিক থেকে যার স্থান ১০০-এর নিচে। সেই পত্রিকার ৩০ জানুয়ারির ওপিনিয়ন পেইজের ১০টি লেখার মধ্যে অনলাইন সংস্করণের সর্বশেষ স্থানের ‘মর্যাদা’ নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার স্বনামে লেখা একটি ইংরেজি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকাতে যতো গৌণভাবেই তা প্রকাশিত হয়ে থাকুক না কেন, বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোতে আমেরিকায় বেগম জিয়ার নিবন্ধ ছাপা হওয়ার ঘটনাটি ও নিবন্ধটির বিষয়বস্তু নিয়ে তুমুল হৈ চৈ শুরু হয়েছে। রাজনীতিবিদরাও তা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে। সংসদে তা নিয়ে তুমুল উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা হয়েছে। দেশে কোনো পত্রিকা, বাংলায় অথবা ইংরেজিতে, কখনো তেমন নিবন্ধ না লিখে থাকলেও বিদেশের একটি পত্রিকায় (সেই পত্রিকার মর্যাদা যাই হোক না কেন) খালেদা জিয়ার ইংরেজি নিবন্ধ প্রকাশের ‘ব্যবস্থা’ করা নিয়ে মন্তব্য করা যেতে পারে, কিন্তু সে বিষয়ে তার অধিকার না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। শুধু মেঠো বক্তৃতার বদলে লিখিতভাবে নিজের চিন্তা তুলে ধরার জন্য বরঞ্চ খালেদা জিয়া প্রশংসা পেতে পারেন। তথাপি যথার্থ কারণেই এই নিবন্ধটি নিয়ে গুরুতর সব প্রশ্ন উঠেছে। কেন? নিবন্ধের কিছু বিষয়বস্তুর কারণেই প্রশ্নগুলো উঠেছে। খালেদা জিয়ার যেমন নিবন্ধ লেখার অধিকার আছে, ঠিক তেমনি তার সেই নিবন্ধ সম্পর্কে মন্তব্য ও সমালোচনা করার অধিকারও অন্যদের আছে। নিবন্ধ লেখার কারণে আওয়ামী মহলের, অথবা নিবন্ধের সমালোচনা করার কারণে বিএনপি মহলের, উত্তেজিত ও ক্ষিপ্ত হওয়াটা মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। যা করাটা গণতান্ত্রিক বিধানসম্মত ও গুরুত্বপূর্ণ তা হলো নিবন্ধের বিষয়বস্তু নিয়ে অভিমত-মন্তব্য প্রকাশ ও বিশ্লেষণ করা এবং তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি-তর্কে লিপ্ত হওয়া। সে চেষ্টাই এখানে করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার নিবন্ধ শুরুই হয়েছে মিথ্যাচার দিয়ে। মিথ্যাচার বললেও কম বলা হবে, বলতে হয় যা সত্যের বিপরীত এক ইতিহাস বিকৃতি দিয়ে। ১৯৭১-এ আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারকে বিশ্বের যে ক’টি দেশ প্রথম স্বীকৃতি দেয়, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম’। এরূপ চরম মিথ্যাচার ও ইতিহাস বিকৃতি পাঠককে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ না করে পারে না। খোদ যুক্তরাষ্ট্রই এতে লজ্জায় মুখ লুকাবে! প্রথমদিকে তো দূরের কথা, নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারকে স্বীকার করার বদলে গোটা সময়কাল ধরে মুক্তিযুদ্ধ বন্ধ করে পাকিস্তানের অখণ্ডতার কাঠামোর মধ্যেই একটি রাজনৈতিক সমাধানে উপনীত হওয়ার জন্য শুধু পরামর্শ দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, সেজন্য সে নানা ষড়যন্ত্রও চালিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকে ধ্বংস করার জন্য পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীকে অস্ত্র গোলাবারুদসহ অন্যান্য সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা সহায়তা, রাজনৈতিক-কূটনৈতিক মদদ সবকিছুই প্রদান করেছে। এমনকি যখন মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অত্যাসন্ন, তখনও বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে বিজয়কে ঠেকাতে চেষ্টা করেছে। জাতিসংঘে অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব এনে হানাদার বাহিনীর দখলদারিত্ব বজায় রেখেই ‘স্থিতাবস্থা’ টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ছিল আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের শত্রু। খালেদা জিয়া সেই শত্রুকে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ‘প্রথম স্বীকৃতি প্রদানকারীদের অন্যতম’ বলে চিত্রায়িত করে মুক্তিযুদ্ধের বন্ধুরূপে পরিচিত করাতে ‘কওশিশ’ করেছেন। এরূপ ঘৃণ্য মিথ্যাচার মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহীদের প্রতি চরম অবমাননা। এতো বড় মিথ্যাচার কি কেবলই প্রভুর মনোতুষ্টি সাধনের মাধ্যমে তার আনুকূল্য পাওয়ার তাড়নায়? নির্লজ্জ দালালিরও কি একটি সীমা থাকা উচিত নয়? তারপরেই খালেদা জিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনুযোগ করে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্র যখন দুর্বল হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক যখন অন্যান্য উদীয়মান বিশ্বশক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র তা কেবল চেয়ে চেয়ে দেখছে।’ ‘গণতন্ত্র দুর্বল হওয়া’ রোধ করার প্রসঙ্গটি আমেরিকার ক্ষেত্রে যে কতো অবান্তর ও বিপরীতধর্মী, তা সবাই বুঝে। আমেরিকা ‘গণতন্ত্র দুর্বল হওয়া’ রোধ করার বদলে যে তার সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে বরঞ্চ উল্টো গণতন্ত্রকে দুর্বল ও প্রয়োজনে হত্যা করে, সেকথা আমাদের দেশবাসীর ও বিশ্ববাসীর অজানা নয়। আইউবী সামরিক শাসনকে ক্ষমতায় আনা ও তাকে আগাগোড়া মদদ দেয়া, ’৭১-এ নির্বাচনের রায় কার্যকর হওয়ার পথ রোধ করে পাকিস্তানকে মদদ দেয়া— এসব পুরনো কথা বাদ দিলেও স্বাধীন বাংলাদেশে বারবার সামরিক শাসন, স্বৈরশাসন, ওয়ান-ইলেভেন ইত্যাদিকে আমেরিকাই প্রতিষ্ঠা ও লালন করেছে। খালেদা জিয়া অবশ্য অতঃপর সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘তবে এর অর্থ এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে কোন ভূমিকাই পালন করেনি।’ ‘গণতন্ত্র দুর্বল হওয়া’ এবং ‘অন্যান্য উদীয়মান বিশ্বশক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ার’ ঘটনা রোধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেয়া যে দুটি ভূমিকার কথা খালেদা জিয়া প্রশংসাসূচকভাবে উল্লেখ করেছেন সেগুলো হলো— (১) ‘পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে প্রায় দু’শ কোটি ডলারের অর্থায়ন প্রত্যাহার’ করে নেয়া। (২) ‘গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে ড. মুহম্মদ ইউনূসকে অপসারণের কারণে’ যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের বাংলাদেশ ককাসের সদস্যগণ কর্তৃক ‘বাংলাদেশ সরকার বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিন্দা’ জ্ঞাপন। খালেদা জিয়া এই কথা লিখে কিন্তু থলের বিড়াল বের করে দিয়েছেন। তার কথার অর্থ পরিষ্কার। পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ এবং ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাখার জন্য চাপ দেয়ার পেছনের আসল কারণ হল বাংলাদেশের ‘অন্যান্য উদীয়মান বিশ্বশক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ার’ প্রবণতার জন্য বাংলাদেশকে শায়েস্তা করা। খালেদা জিয়া লিখেছেন, বাংলাদেশ মুহম্মদ ইউনূসকে তার গ্রামীণ ব্যাংকের পদ থেকে অপসারণ করেছে তার ‘শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ের’ পর। এটর্নি জেনারেলকে উদ্ধৃত করে খালেদা জিয়া এর কারণ সম্পর্কে লিখেছেন যে, পুরস্কারটি শেখ হাসিনার পাওয়া উচিত থাকলেও তাকে না দিয়ে সেটি একটি ভুল ব্যক্তিকে দেয়া হয়েছে। হাসিনার যে সে পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা নেই তা প্রমাণের জন্য খালেদা জিয়া দুটি অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছেন। (১) র্যাবের হাতে গত ৪ বছরে তিনশ জন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এবং (২) যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে ‘.... হাসিনা কর্তৃক রাজনৈতিক বিরোধীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পাঁয়তারা’র ঘটনা। প্রথম ঘটনা প্রসঙ্গে খালেদা জিয়ার সাথে সহমত ঘোষণা না করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু কথা হল এই র্যাব নামক সংস্থাটিতো খালেদা জিয়ার শাসনামলেই সৃষ্ট ও লালিত হয়েছে। বিএনপি-জামাতের শাসনামলে ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার ইত্যাদি নানা নামে শত শত মানুষকে বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার করা হয়েছে। নিখোঁজ হয়েছে আরো অনেক মানুষ। জেএমবি ও বাংলা ভাইয়ের হাতে হত্যা, নিখোঁজ ও নিগৃহীত হয়েছে অসংখ্য ব্যক্তি। সিরিজ বোমা হামলা ও গ্রেনেড হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করা হয়েছে। সেসব কথা কি ভুলে যাওয়ার মতো বিষয়? ৪ বছরে তিনশ জন নিখোঁজ হওয়ার কথাটি সত্য হলেও সেকথা খালেদা জিয়ার কাছ থেকে অভিযোগ হিসেবে উত্থাপিত হওয়া মোটেও শোভা পায় না। দ্বিতীয় অভিযোগটি এমনভাবে খালেদা জিয়া উত্থাপন করেছেন, যার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে তার নমনীয়তা প্রকাশ হয়ে পড়েছে। জামাত কর্তৃক মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে নিয়োগ করা লবিস্টদের তত্পরতার ফসল হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে যেসব অপপ্রচার চালানো হয়েছে, সে সব বস্তাপচা কথাগুলো খালেদা জিয়া তার লেখায় সংযুক্ত করেছেন। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী জামাত নেতারা যে কেবল ‘হাসিনার রাজনৈতিক বিরোধী’ নয়, তারা ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অস্তিত্বের রাজনৈতিক বিরোধী’। এই প্রকৃত কথাটি ও সে সম্পর্কে উপলব্ধি খালেদা জিয়ার লেখায় প্রকাশ পায়নি। তার লেখার মধ্যদিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ‘স্কাইপি’ ফোনালাপের প্রসঙ্গটিকে যুক্তিরূপে হাজির করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের জন্য বিচারাধীন ব্যক্তিবর্গ ও তাদের সমর্থক গোষ্ঠীকে (যারা মূলত সবাই জামাত) সাক্ষী মেনে হাসিনাকে কেন নোবেল পুরস্কার দেয়া উচিত তার পক্ষে যুক্তি দেয়া হয়েছে। খালেদা জিয়া অভিযোগ তুলেছেন, হাসিনা সরকারের অধীনে দেশ ‘দ্রুতই একটি একক পরিবার কর্তৃক ক্ষমতা কেন্দ্রগুলো দখলে নিয়ে নেয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে’। অথচ, এই একই অভিযোগ যে তার ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য, সে কথা কে না জানে। ‘হাওয়া ভবনের’ যুগের কথা মানুষ এখনো ভুলেনি। বর্তমানে খালেদা জিয়ার পর আনুষ্ঠানিক বিএনপির দ্বিতীয় নেতা তো তারই জ্যেষ্ঠ ছেলে। খালেদা জিয়া অভিযোগ করেছেন, হাসিনা সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তুলে দিয়ে জনগণের ভোটের রায়ে সরকার গঠনের সুযোগ ধ্বংস করে দিয়েছেন। অথচ, খালেদা জিয়ার কথা অনুসারে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা হাসিনার কারণেই প্রবর্তন করতে হয়েছিল। কথা ঠিক হলেও তা আংশিক সত্য। এক সময় শেখ হাসিনা বলতেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন করতে দেয়া হবে না’। কিন্তু খালেদা জিয়ার একথাও ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, তিনিও তখন বলতেন ‘পাগল ও শিশু ছাড়া নিরপেক্ষ বলে কেউ নেই’। অতএব তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা হবে না। আসলে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যটি যে নির্বাচন ব্যবস্থাকে আমূল ঢেলে সাজানো ও তাকে টাকার খেলা, পেশিশক্তির দাপট, প্রশাসনিক কারসাজি ইত্যাদি থেকে মুক্ত করা—সে কথা দু’জনের মধ্যে কেউই বলেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে তারা উভয়ই যে ‘ক্ষমতায় থাকলে বিরুদ্ধে আর বিরোধী দলে থাকলে পক্ষে’— তা দেশবাসী দেখতেই তো পাচ্ছেন। গণতন্ত্রের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার কতো অপরিহার্য একথা তুলে ধরে খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের জন্য বিশ্বব্যাপী আমেরিকার ভূমিকার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। প্রথমেই মায়ানমারে গণতন্ত্র প্রবর্তনে আমেরিকার সর্বশেষ অবদানের কথাটি বলা হয়েছে। আমেরিকাকে তুষ্ট করার জন্য তিনি যে দেশটির নাম বার্মা বলে লিখেছেন (কারণ আমেরিকা ‘মায়ানমার’ হিসেবে দেশটির আদি নাম ফিরিয়ে আনা সমর্থন করে না)। সেই ছোট বিষয়টিও উল্লেখ না করে পারলাম না। খালেদা জিয়া লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার বাণী নিয়ে আমেরিকা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হাত বাড়িয়েছিল বলেই এটি এখন একটি সম্ভাবনাপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হতে পেরেছে’। অনুকম্পা পাওয়ার লোভে কী নির্লজ্জ মিথ্যাচার ও স্তুতিগান! দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকা স্বাধীনতার বাণী নিয়ে যদি হাত বাড়িয়ে থেকে থাকে, তাহলে ভিয়েতনাম, লাওস, কাম্পুচিয়ায় সেনা পাঠিয়ে সেসব দেশ বছরের পর বছর দখল করে রেখেছিল কে? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকার ভূমিকার কথা তো আগেই বলেছি। এরপরেই খালেদা জিয়া কাজের কথায় এসেছেন। তিনি ফরিয়াদ করেছেন যে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কিছু ‘পদক্ষেপ’ গ্রহণ করা আমেরিকার জরুরি কর্তব্য। তার কথা হল, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। ইতোমধ্যে গৃহীত ‘কথাবার্তা ও পদক্ষেপকে আরো শক্তিশালী করতে হবে’। এসব পদক্ষেপের মধ্যে— (১) মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্মানিত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে। (২) কতোগুলো নির্দেশ না মানলে বাণিজ্য সুবিধা (জিপিএস) প্রত্যাহার করা হবে এই মর্মে হুমকির বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে শেখ হাসিনাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। (৩) হাসিনা সরকারের মধ্যে যারা গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা ও মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যাভিমুখী যাতায়াত ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের কথা ভাবতে হবে।’ এসব পদক্ষেপের সুপারিশ করে খালেদা জিয়া দু’টি গুরুতর অন্যায় করেছেন। প্রথমত, তিনি হাসিনার কথিত অপরাধের জন্য গোটা দেশকে শায়েস্তা করা ও জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার সুপারিশ করেছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আগে সাম্রাজ্যবাদের পদলেহন করা হত সংগোপনে। এখন খালেদা জিয়া তা খোলামেলাভাবে করার পথ গ্রহণ করেছেন। আমেরিকাকেও তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যেন ‘জনগণ যাতে শুনতে ও দেখতে পারে সেভাবে যেন সে সবকিছু খোলামেলা বলে ও করে’। বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্বের পদক্ষেপ গ্রহণের এখনই সময়’— লিখেছেন খালেদা জিয়া। এ বিষয়ে বিএনপি বলার চেষ্টা করছে যে, বিরোধী দলে থাকাকালে শেখ হাসিনাও তো বিদেশের কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি লিখে সেসব দেশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নাক গলাতে প্ররোচিত করেছিলেন। অভিযোগটি সত্য হলেও তা খালেদা জিয়া কর্তৃক আমেরিকার ‘পদক্ষেপ গ্রহণের’ জন্য আহ্বানের অজুহাত বলে মেনে নেয়া যায় না। ‘বিশ্বে গণতন্ত্রের জন্য আমেরিকার মিশনকে নিশ্চিত করার জন্য এসবই হল পথ’—বলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য খালেদা জিয়া আমেরিকাকে সবক দিয়েছেন। খালেদা জিয়া কি ভুলে গেছেন যে, গণতন্ত্রের জন্য ‘আমেরিকার মিশনের’ সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ইত্যাদি। নাকি তিনি সজ্ঞানেই বাংলাদেশেও সেরূপ হস্তক্ষেপের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে এদেশকে আমেরিকার করদ রাষ্ট্রে পরিণত করার ‘মিশনে’ নেমেছেন? লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) E-mail: selimcpb@yahoo.com