ফিলিস্তিন পরিস্থিতির নূতন মাত্রা

ফিলিস্তিন সংকট মোকাবিলার জন্য যখন বহুপাক্ষিক আলোচনার সম্ভাবনা দেখা দিতেছে, তখনই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আভিগদোর লিবারম্যান বলিলেন অন্যকথা। তিন এক টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘ফিলিস্তিনের সঙ্গে স্থায়ী শান্তিচুক্তি সম্ভব নয়’। ইহার বদলে তিনি দীর্ঘমেয়াদী একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি সম্পাদনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। ইহার আগে শান্তি আলোচনার সুবিধার্থে ফিলিস্তিনে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনে বিবদমান ও প্রভাবশালী দুই সংগঠন হামাস ও ফাতাহ আলোচনা চালাইয়া যাওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়। সম্প্রতি হামাস নেতা খালেদ মিশাল বিবিসির এক টকশোতে এই কথা বলেন। ফিলিস্তিন প্রেসিডেন্ট ও ফাতাহ নেতা মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে তাহারা এই ব্যাপারে আলোচনা করেন। তাহাদের আলোচনায় প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতির বিষয়টিও উঠিয়া আসে। বর্তমানে হামাস ফিলিস্তিনের গাজা এবং ফাতাহ পশ্চিম তীর নিয়ন্ত্রণ করিতেছে। ২০১১ সালে মিসরে হোসনি মোবারকের পতনের পর মে মাসে হামাস ও ফাতাহর মধ্যে ঐক্যের সম্ভাবনা দেখা দেয়। তাহাদের মধ্যে একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয় যাহা ফিলিস্তিনবাসীকে আশান্বিত করে। কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, শেষপর্যন্ত তাহা বাস্তবায়ন হয় নাই। সিরিয়া অভ্যুত্থানের সূত্রপাত হওয়ার পর হামাসের দীর্ঘদিনের বন্ধু প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সঙ্গে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মতপার্থক্য হয়। ইহাতে হামাস দামেস্ক হইতে বৈদেশিক কার্যালয় প্রত্যাহার করিতে বাধ্য হয়। ২০০৬ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে হামাস জয়লাভ করিলেও ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আরও কিছু পশ্চিমা দেশ ও আরব রাষ্ট্র তাহার স্বীকৃতি দেয় নাই। আরব রাষ্ট্রগুলি সমর্থন না দেওয়ার পিছনে শিয়া-সুন্নি বিভেদ এবং আমেরিকা ও রাশিয়া ব্লকের হিসাব-নিকাশ কাজ করে। যেহেতু ইরান, রাশিয়া, সিরিয়া ও লেবাননের হিজবুল্লাহর সহিত ইসলামপন্থি হামাসের সম্পর্ক বিদ্যমান, তাই নির্বাচনে জিতিলেও হামাস একঘরে হইয়া পড়ে। নূতন সরকারকে সাহায্য-সহযোগিতা বন্ধ করিয়া দেয় অনেকে এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবেও আখ্যায়িত করে। অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ ফাতাহর সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক আগাগোড়া হইতেই ভাল হওয়ায় তাহারা সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করে। একসময় হামাস ও ফাতাহর সঙ্গে তিক্ত সম্পর্কের কারণে গৃহযুদ্ধ (হারবুল আহলিয়াহ) শুরু হয় এবং ২০০৭ সালে গাজা হইতে ফাতাহকে হটাইয়া দেয় হামাস। ফলে ফিলিস্তিন কার্যত দ্বিখণ্ডিত হইয়া পড়ে। পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ কার্যকর থাকিলেও গাজায় প্রতিষ্ঠিত হয় হামাসের সরকার। এইভাবে স্বাধীন ফিলিস্তিন গঠন আরও বিলম্বিত ও কঠিন হইয়া পড়ে। যদিও সম্প্রতিকালে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভসহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে দৃষ্টিগ্রাহ্য অগ্রগতিও হইয়াছে। মধ্যপ্রাচ্যের এখনকার যে ভূ-রাজনীতি বিদ্যমান সেই চাপই হামাস ও ফাতাহকে একসূত্রে বাঁধিতে পারে। উল্লেখ্য, আরব বসন্তের হাত ধরিয়া তিউনিসিয়া, মিসর, মরক্কো, জর্ডানসহ কয়েকটি দেশের রাজনীতিতে কিছুটা হইলেও পরিবর্তন হইয়াছে। অন্যদিকে ইসরাইলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় আসিয়াছেন। আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হইয়া মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়াকে আগাইয়া নেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করিতেছেন। তিনি আগামী মাসে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন সফর করিবেন। এমতাবস্থায় ফিলিস্তিনে ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠিত হইলে ইসরাইলের সঙ্গে আলোচনা চালাইয়া যাওয়া সুবিধা হইবে। কিন্তু ইসরাইলের মনোভাব দেখিয়া প্রতীয়মান হয় যে, অতীতের ন্যায় এইবারও শান্তি আলোচনা তেমন সফল হইবে না।