আলোকপাত
একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতিক্রিয়া
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:১৮
বর্তমানে দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে জনগণ বিপুল ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসাইয়াছে। আর তাদের নির্বাচনের ইশতিহারে ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। তারই ধারাবাহিকতা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে। ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনাল বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির রায় কার্যকর করেছে এবং দেশবাসী রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। ৫ ফেব্রয়ারি ২০১৩ রোজ মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল দ্বিতীয় রায় প্রকাশ করেছে। রায়ে আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশ দিয়েছে। যা গোটা জাতিকে হতবাক করেছে। সবার আশা ছিল ফাঁসি হবে। কিন্তু হল না। গোটা জাতির মত আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হতবাক হয়েছি। আমার প্রশ্ন, একজন অপরাধী আর কত অপরাধ প্রমাণ হলে তার ফাঁসি হবে। রাজধানীর মিরপুরের ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় লোমহর্ষক গণহত্যার জন্য ‘কসাই কাদের’ হিসেবে পরিচিত এই অপরাধী। সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড না হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায়ে হতাশ ও ক্ষুব্ধ জাতি। এ রায় জাতির প্রত্যাশা পূরণ করেনি। এটা জাতির জন্য চরম দুর্ভাগ্য। এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত সব মানুষকে হতাশ করেছে।
আমিও সাধারণ মানুষের মতোই হতাশ ও ক্ষুব্ধ। আমার দীর্ঘ স্বপ্ন ছিল যুদ্ধাপরাধীদের সবারই সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে। আমি ২ নম্বর সেক্টের কুমিল্লায় যুদ্ধ করেছি। সে সময় দেখেছি কত মুক্তিযোদ্ধা দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। আর সে সময় পাকিস্তান হানাদেরকে এই জামায়াত শীর্ষস্থানীয় নেতারা সহযোগিতা করে দেশে লোমহর্ষক গণহত্যা করেছিল। তাদের কারণে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় এত প্রাণহানি হয়েছিল। নতুবা এত প্রাণহানি নাও ঘটতে পারত। এই জামায়াতে ইসলাম এখনও দেশের মুক্তিযুদ্ধাকে বিশ্বাস করে না। আর তাদেরকে রক্ষা করার জন্য আমাদের দেশের একটা মহল কাজ করছে। দ্বিতীয় রায়ের পর আমার সঙ্গে যারা একাত্তরে যুদ্ধ করেছেন, সেই মুক্তিযোদ্ধারা ফোন করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিচারের যে প্রক্রিয়া, সেটা আমাদের মেনে নিতে হবে। এটাই সভ্যতার দিক। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী কী করছে, সেটাও দেখতে হবে। জামায়াতের নেতারা রাস্তায় ট্রাইব্যুনাল ভেঙে দেয়ার দাবি জানানোর পরও তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না, সাজা দেয়া হচ্ছে না। গৃহযুদ্ধে হুমকি দিচ্ছে প্রকাশ্যে রাজপথে। তারা কেন আইনের আওতায় আসছেন না, এটা এখন জাতির সামনে বড় প্রশ্ন। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে জামায়াত ইসলাম দেশব্যাপী চোরাগোপ্তা হামলা করছে। হরতাল দিচ্ছে, তাতে প্রাণ যাচ্ছে নিরীহ মানুষদের। মঙ্গলবার হরতালে সারাদেশে মারা গেছে ৩ জন। এই সব অনাঙ্ক্ষাকিত মৃত্যুর দায় নিবে কে ? অপরদিকে যুদ্ধাপরাধী রক্ষা বিএনপির মতো রাজনৈতিক দল তাদেরকে পরোক্ষভাবে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। যা জাতি কখনো কাম্য করে না।
জামায়াতে ইসলাম, দেশে ইসলাম কায়েমের কথা বলে। তাদেরই অঙ্গ সংগঠন ছাত্রশিবির। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর জামায়াত এবং ছাত্রশিবির বেশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আগেও অবশ্য তারা উগ্র ছিল। দিন যতোই যাচ্ছে তাদের আচরণ ততো বেশি দেশব্যাপী মানুষের কাছে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। বিশেষত ছাত্রশিবিরের কর্মীরা চোরাগোপ্তা হামলা, পুলিশকে আক্রমণ করা, গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেয়া, মানুষের প্রতিষ্ঠানে হামলা করা ইত্যাদিতে যেভাবে অংশ নিচ্ছে তা দেখে মানুষ বিস্মিত ও হতবাক!! ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মিছিল ও হামলা, হাঙ্গামার দৃশ্য দেখে মানুষ যে বিষয়টি বুঝতে পারছে তা হচ্ছে , এখন যদি ছাত্রশিবিরের কর্মীরা এমন, তাহলে একাত্তর সালে তাদের পূর্বসূরি ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতাকর্মীদের আচরণ কেমন ছিল? আর বর্তমানে এই সংগঠন ইসলামের নামে একের পর এক যে হামলা করছে তা দেখে অমুসলিম ভাইরা ইসলাম থেকে কি শিখবে। যে ইসলাম অশান্ত মানুষকে শান্ত, বিপদগামী মানুষদেরকে সঠিক পথের চলা দিক-নিদেশর্না দিয়েছিল। আর সে ইসলামকে পুঁজি করে জামায়াতে ইসলাম যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে তা কোন ভাবে মেনে নেয়া যায় না।
লেখক : উপাচার্য, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়