স্মরণ

এক অসাধারণ কর্মী পুরুষ

রেজা কাকার উপর কিছু লেখার কথা আমি অনেকবারই ভেবেছি। ইতোপূর্বে বারকয়েক চেষ্টাও যে করিনি তা নয়। কিন্তু মুশকিল এই যে, কাকার সঙ্গে এত স্মৃতি জড়িয়ে আছে যে, লিখতে বসতেই তা কেমন তাল গোল পাকিয়ে যায়। কোনটা আগে আর কোনটা পরে লেখা উচিত তাও ঠাওর করতে পারি না। আমার বাবা দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী ও বার্তা সম্পাদক সিরাজউদ্দিন হোসেন একাত্তরের ১০ই ডিসেম্বর স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতক আলবদর ও আলশামসের হাতে নিমর্মভাবে নিহত হবার পর মাসহ আমাদের পরিবারের ৯ সদস্য আক্ষরিক অর্থেই অকূল পাথারে ভেসে চলেছি, তখন হাতে গোনা যে দু-চারজন মানুষের স্নেহরসধারা আমাদের জন্য সঞ্জীবনী সুধার মত কাজ করেছে, তাদের মধ্যে রেজাউল মুস্তাফা মুহাম্মদ আসফ-উদ-দৌলার স্থান এক নম্বরে। আমরা তাকে রেজা কাকা বলে ডাকতাম। আব্বার সঙ্গে চাচার চাল-চলন, কথা-বার্তার এতই মিল ছিল যে, তাদের দুজনকে দুভাই ভাবা যেত অনায়াসেই। বঙ্গবন্ধু, আব্বা, রেজা কাকা, আমার বড় মামা শামসুদ্দিন মোল্লা (পরবর্তীতে শ্বশুর), খোন্দকার মো. ইলিয়াস সবাই ছিলেন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র। সেই চল্লিশ দশকে ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র এবং সহপাঠী হিসাবে এরা প্রত্যেকেই ছিলেন প্রত্যেকের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এমনকি পরবর্তীকালে কর্মজীবনেও তারা সবাই ছিলেন এক সূত্রে গাঁথা। আব্বার কাছে শুনেছি, রেজা কাকা যেহেতু জমিদার তনয় ছিলেন, সেহেতু ইসলামিয়া কলেজে তাঁর চাল-চলন এবং পোশাক-পরিচ্ছদে থাকতো খানদানী জেল্লা। মৌলানা ইসমাইল হোসেন সিরাজীর বড় মেয়ের সন্তান ছিলেন তিনি। বগুড়ার ধনকুণ্ডির জমিদার তার পিতা। সুতরাং ইসলামিয়া কলেজের নির্ধারিত পোশাক অর্থাত্ পাজামা-পাঞ্জাবী, কালো শেরওয়ানী, টুপি এগুলোতেই সবসময় ধোপ-দুরস্ত থাকতেন তিনি। আমার বাবা শৈশবে পিতৃহারা হয়ে অত্যন্ত কায়-ক্লেশের মধ্যে দিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং ছাত্রাবস্থা থাকতেই দৈনিক আজাদে নৈশপালায় চাকরি করছিলেন। রেজা কাকা জমিদার ও ধনাঢ্য পরিবারের আদরের সন্তান, তাই অপেক্ষাকৃত দরিদ্র সহপাঠীদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ তার জন্য সীমিত। ইসলামিয়া কলেজে পড়াকালীন সময়ে বন্ধুত্ব খুব গভীর না হলেও যখন জমিদারী হারিয়ে বাবা-মা, ভাই-বোনসমেত এ বিরাট সংসারের বোঝা কাকার কাঁধে চেপে বসল তখন আব্বা ও কাকার ছাত্রজীবনের সেই পরিচয়ের পরিধি ধাপে ধাপে ব্যাপ্ত হয়ে গভীর থেকে গভীরতর এক নিখাঁদ বন্ধুত্বে পরিণত হল। এ বন্ধুত্ব এমনই নিবিড় এবং ঘনিষ্ঠ ছিল যে, আব্বার শাহাদাত্ বরণের আগ পর্যন্ত তা ছিল অটুট। আব্বা ছিলেন “টুয়েন্টি ফোর আওয়ারস” অ্যাভাইলেবল নিউজ এডিটর। অষ্টপ্রহর তিনি পেশাগত কাজেই নিমগ্ন থাকতেন। তখন এহতেশাম হায়দার চৌধুরী, নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী, মোহাম্মদ উল্লাহ চৌধুরী, নূরুল ইসলাম ভাণ্ডারী, খন্দকার আবু তালেব, তোহা খান, আল মাহমুদ, তাহের উদ্দীন ঠাকুর, আমির হোসেন প্রমুখ প্রথিতযশা সাংবাদিকের পদভারে ইত্তেফাক ভবন থাকতো মুখরিত। জরা-জীর্ণ দোতলা দালান, একটি কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হত। ইত্তেফাকের মালিক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া বসতেন নীচের একটি কক্ষে। বার্তা বিভাগ তখন দোতলায় চলে এসেছে। রেজা কাকার কথা বলতে গিয়ে অনিবার্যভাবে আব্বার কথা, ইত্তেফাকের কথা, তাদের সহকর্মীদের কথা এবং তাদের সে সময়ের কথা চলে আসে। কেননা তারা যে সময়ের জাতক ছিলেন এবং যে বৈরী ও প্রতিকূল পরিবেশে জান কবুল করে গণমানুষের জন্য কলম ধরেছিলেন, সে সময়টাকে উপস্থাপন করলেই এসব প্রতিভাধর ব্যক্তিকে আপন আলোয় উদ্ভাসিত দেখা যায়। অন্যথায় আজকের এই পূঁতি-দুর্গন্ধময় সমাজে সামনে মেলে ধরলে তাদের বোকা, আহাম্মক কিংবা “মিস ফিট” বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। আদপে কিন্তু তারা কেউই বোকা ছিলেন না। ছিলেন মানুষের কল্যাণে আত্মদানের বা আত্মত্যাগের উন্নত মহিমায় সমর্পিত ব্যক্তিত্ব। মনুষ্যত্ব, উচ্চতর মানবতাবোধ এবং শুচিতা, শুভ্রতা ও কল্যাণকামিতার উপাদানে গড়ে উঠেছিল তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের দ্যুতি তাঁরা ছড়াতে পেরেছিলেন নিজেদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে বির্সজন দিয়েও। জাতির জন্য তাঁরা যা করেছেন তার মূল্যায়ন আজো হয়নি বটে, তবে একদিন তা হবেই এবং তখন এদেশের আকাশে এসব তারকাকে জ্বল জ্বল করে জ্বলতে দেখা যাবে। তাদের মধ্যে রেজা কাকারূপী তারকা না থাকার কারণ দেখি না। মানুষ হিসাবে তিনি মহত্ এবং বৃহত্ হূদয়েরতো ছিলেনই, পাশাপাশি ছিলেন অত্যন্ত ব্যক্তিত্বশালী একজন মহানুভব পুরুষ।  লেখক : সাংবাদিক