ভেজাল বিশ্বময়
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৪
গরুর নামে ঘোড়ার মাংস বাজারজাত করায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হইয়াছে ইউরোপ জুড়িয়া। গত মাসে যুক্তরাজ্যের চেইনশপে বারগারের মধ্যে পাওয়া যায় ঘোটকের গোশ্ত। কিন্তু, বলা হইয়াছিল বিফ বার্গার অর্থাত্ গরুর মাংসের বার্গার। আর নিশ্চিন্তে তাহা গলাধকরণ করিতেছিলেন খদ্দেরগণ। জালিয়াতির এই ব্যবসা ভালই চলিতেছিল। কিন্তু গোল বাধাইয়া দেন আয়ারল্যান্ডের এক ফুড ইনস্পেক্টর। বার্গারের মাংস গরুর নয়, ঘোড়ার। হাটে হাঁড়ি ভাঙ্গিয়া দিবার পর অনুসন্ধান করিয়া দেখা যায়, সুইডেনের ফিনডাস কোম্পানি যত মাংস বাজারজাত করিয়াছে, তাহার সবই আসলে ঘোড়ার মাংস। ফরাসি কোম্পানি পৌজলের সরবরাহ করা গোশ্তও ঘোড়ার। এই কোম্পানিটি নাকি মাংস সংগ্রহ করিয়া থাকে রোমানিয়ার কসাইখানা হইতে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এরই মধ্যে মাংস কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটিয়া গিয়াছে ইউরোপের ১৬টি দেশে।
বিষয়টি কৌতূহল উদ্দীপক নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল এখন আমাদের অনেকটাই যেন গা সহা হইয়া গিয়াছে। ভেজাল ছাড়া এইখানে বলিতে গেলে কিছুই পাওয়া যায় না। তরিতরকারি, মাছ-মাংস, হোটেল-রেস্তেরাঁর খাবার সবকিছুতেই ভেজালের দৌরাত্ম্য। পত্র-পত্রিকায় হামেশাই এইসবের বিরুদ্ধে লেখা হইতেছে, মোবাইল কোর্ট জরিমানা করিতেছে। কিন্তু ভেজালের দৌরাত্ম্য হ্রাস পাইবার তেমন কোনো লক্ষণ নাই। ঢাকায় কয়েকটি কাঁচাবাজারকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করা হইয়াছে। কিন্তু দিনকয়েক আগে পত্রিকায় খবর বাহির হইয়াছে যে, ওইসব বাজারেও ভেজালের দৌরাত্ম্য, ফরমালিন আছে যথাপূর্বং।
একালে অনেকেই রসিকতা করিয়া বলেন, এই দেশে খাঁটি বলিয়া যদি কিছু থাকিয়া থাকে, তাহা হইল ভেজাল।
ভেজালের উপদ্রব হালফিল বাড়িয়াছে সত্য। কিন্তু এমন নয় যে, অতীতে ইহা ছিল না। এই আপদ ছিল একশ’-দেড়শ’ বত্সর আগেও। কিশোর কবি সুকান্ত তাহার সময়ে সর্বত্র ভেজালের তেলেসমাতি দেখিয়া লিখিয়াছিলেন, খাঁটি জিনিস এই কথাটা রেখো না আর চিত্তে, ভেজাল নামটা খাঁটি কেবল আর সকলই মিথ্যে। সেই খাঁটি ভেজালের দাপট এইকালে সর্বগ্রাসী রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। তবে সামান্য সান্ত্বনার বিষয় এই, ভেজাল জিনিসটা যে কেবল আমাদেরই জ্বালাতন করিয়া চলিয়াছে তাহা নয়, উহা আছে সভ্যভব্য অতিসচেতন ইউরোপেও। এশিয়ার অন্যসব দেশে তো আছেই। অন্যের কষ্টক্লেশের দিকে তাকাইলে নিজের যাতনা সামান্য লাঘব হয় বৈকি? ইউরোপে এইবার গরুর মাংসের বদলে ঘোড়ার মাংস খাওয়ান হইয়াছে। আমাদের যেমনটি খাওয়ান হয় মহিষের মাংস। ইউরোপে বছরদশেক আগে দেখা দিয়াছিল ম্যাডকাউ সংকট। পগলা গরুর মাংস লইয়া মহা ফাপরে পড়িয়াছিল ইউরোপবাসী। মাঝখানে গুঁড়া দুধে ম্যালামাইনের মিশ্রণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করিয়াছিল ইউরোপ ও এশিয়া জুড়িয়া। উহা হানা দিয়াছিল বাংলাদেশেও।
সত্য বটে, ভেজাল বাংলাদেশে হয়, উন্নত বিশ্বেও হয়। তবে আমাদের সাথে উন্নত বিশ্বের ব্যবধান এই যে, ধরা পড়িলে সেখানে প্রতিকার হয়। ব্যবসায়ীরা বাজার হইতে ভেজাল জিনিস উঠাইয়া নেন। এইবার যেমনটি উঠাইয়া নেওয়া হইয়াছে ঘোড়ার মাংস ও এই মাংসজাত খাদ্যসামগ্রী। পক্ষান্তরে আমরা কানে তুলা দিয়া বসিয়া থাকি। যে যত কথাই বলুন না কেন, যিনি বা যাহারা ভেজাল করেন তাহারা নির্বিকার। মনে মনে হয়তো তাহারা বলেন, ভেজাল ছাড়া কি আমাদের একদিনও চলে!