সম্প্রীতি

বসন্ত পঞ্চমীতে বিদ্যাদেবীর আগমনে, সম্প্রীতির বন্দনে

বিদ্যাদায়িনী বীণাপানি মা দেবী সরস্বতী বাংলা মাঘ মাসের শ্রী পঞ্চমীতে আবির্ভূত হন মর্ত্যের এ পৃথিবীতে। জ্ঞানের দেবী, গানের দেবী, শিল্প ও বিজ্ঞানের এ দেবীর ধরায় আগমনের শুভ মুহূর্তে প্রতিটি বিদ্যাপীঠে চলে বন্দনা, দেবীর আরাধনা, বয়ে আসে আনন্দের বন্যা। সম্মিলিত কণ্ঠে প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে চলে দেবীর অর্চনা, প্রতি ঘরে ঘরে করজোড়ে করা হয় প্রার্থনা। দেবী সরস্বতী হচ্ছে জ্ঞানের প্রতীক। জ্ঞান হচ্ছে সুন্দরের ধারক, মানুষের হূদয়কে পবিত্র করে, শুভ্র করে, সুন্দরের নীলিমায় ভরে দেয় ভুবন। তাই দেবী শুভ্র বসনা, শুভ্র পদ্মের উপর আসীন, শুভ্র হংস তার বাহন। দেবী সরস্বতী সৃষ্টির প্রতীক, যেমন জননীর জঠরে জীবনের সৃষ্টি। দেবীর শুভ্র বসন, নিষ্কলঙ্ক চরিত্র ও পুত-পবিত্র মননশীলতার নিদর্শন। সাদা পদ্মের উপর আসীন এ দেবী সরস্বতী, যার অর্থ হচ্ছে জ্ঞানের আলোতে দেবী প্রোজ্বল। শুভ্র হংস দেবীর বাহন, যা হচ্ছে অনুসন্ধিত্সু ভাবনার নিদর্শন। দেবী বীণা হস্তে সুরের মুর্ছনায় বিভোর, যা সর্বত্র জানিয়ে দেয় হূদয়ের সকল রজ্জুতে বিরাজ করছে এক অনাবিল ঐকতান। লাল পলাশের মতো গন্ধহীন ফুলে আরাধনা করা হয় দেবীকে, যার অর্থ হচ্ছে ভেজালশূন্য পবিত্র ও বিশুদ্ধ এক আন্তরিকতা বিরাজ করছে দেবীর মহিমা। এ নির্মল উজ্জ্বল কান্ত সুন্দর স্নিগ্ধ প্রশান্ত প্রাণের স্পর্শ প্রাপ্তির বাসনায় সকল বিদ্যাপিঠে তরুণ ও শিশু মনে জাগে জ্ঞানের বাসনা, পবিত্রতার আবেগ। তাই শ্রী পঞ্চমীতে দেবীর আরাধনা চলে সকল শিক্ষাঙ্গনে, প্রতিটি ঘরে ঘরে। বিদ্যাদায়িনী দেবী বীণাপানির আবির্ভাব ঘটে বসন্তের আগমনে, শ্রীপঞ্চমীর পুণ্য প্রভাতে বসন্তের নির্মল বাতাসের সাথে সমান তালে। বসন্ত ভালোবাসার প্রতীক, নির্মল হূদয়ের পরিচায়ক। যুবতী কন্যারা হলুদ রং এর শাড়ি পরে স্বাগত জানায় ঋতুুরাজ বসন্তকে, প্রচণ্ড আবেগে প্রাণের উচ্ছ্বাসে। প্রাণের স্পন্দনে শিহরিত হয় সকল হূদয়। মাঠ থাকে ফসলে ভরা, গৃহিণীর ঘরে অফুরন্ত আনন্দ। সরিষা ফুলের সুগন্ধে পরিবেশ থাকে বিমোহিত। তাই বসন্তের আগমন হচ্ছে তরুণ আনন্দময় হূদয়ের প্রতিচ্ছবি। শুরু হয় ঘরে ঘরে নারিকেল নাড়ু , মুড়ির মোয়া বানানোর হিড়িক। মিঠাই-মন্ডা তৈরির হুলুস্থুল। তাই বসন্তের আগমন হচ্ছে বাংলার প্রতিটি ঘরে আনন্দঘন শুভক্ষণ। সবার অলক্ষ্যে বসন্ত পঞ্চমীর আগমনের মাঝে প্রকৃতি ও জীবন হয়ে যায় এক শুরে গাথা। বসন্ত পঞ্চমীতে আনন্দ ধারার মাঝে জ্ঞানের ভুবনে বিচরণ করাই হচ্ছে বড় প্রার্থনা। দেশের সকল মানুষের কল্যাণে, জ্ঞানের প্রদীপ শিখা জ্বালিয়ে বসন্তের আগমনী আনন্দ ও ভালোবাসার মাঝে বাংলার সকল মানুষের হূদয়ের অবগুণ্ঠিত জীবনে সকল বিড়ম্বনা বিদুরিত হয়ে হাসিতে আর ভালোবাসায় ভরে উঠুক, দেশের সকল মানুষের হূদয়-মন। বেদনার মাঝে মাধুরী ছড়িয়ে দিক সর্বত্র, আজি এ দিনে, এ হচ্ছে সকলের প্রত্যাশা। সুন্দর হউক সকলের জীবন, জ্ঞানের আলোতে ভরে উঠুক সমগ্র দেশ, পবিত্র হউক এ ধরণী । বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে চলে আসছে সরস্বতী পূজা, প্রায় প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে। গান, নাচ, কবিতায় ও নানা আয়োজনে সকল শিক্ষার্থী উপভোগ করে বসন্তের পঞ্চমী তিথিকে। অনেকে ধর্মীয় চেতনায় দেখতে পায় এ অনুষ্ঠানকে। আবার অনেকের মাঝে এহচ্ছে সংস্কৃতির অংশ, প্রকৃতির সাথে বাঙালি জীবনের সংযোগ, মধুর মিলনের আনন্দঘন মুহূর্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মাঠে প্রতিটি বিভাগের প্রতিমা শোভা পায় অপরূপ সাজে, ধুপ চন্দন আর পলাশের রক্তিম আভায়। প্রচুর দর্শনাথী ভিড় জমায় সকালে অঞ্জলি দানের প্রেরণায়, আবার সন্ধ্যায় আলোক সজ্জার মাঝে, ঢাকঢোল আর বিবিধ বাদ্যযন্ত্রের শব্দের তালে তালে, আনন্দের লহরীতে। জগন্নাথ হলের বাণী বন্দনা সমগ্র বাংলাদেশের সকল স্তরের জনগণের মাঝে ঐক্যের বন্ধন ও সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে ইতিমধ্যে আত্মপ্রকাশ করেছে। সকলের প্রত্যাশা বসন্তের আগমনে, হূদয়ের বন্দনে, তরুণ প্রাণের আনন্দ উচ্ছ্বাসের মাঝে বাংলাদেশের সমপ্রীতির বাতাবরণ অঁটুট থাকবে চিরকাল।  লেখক : সাবেক সচিব