ভাব প্রকাশ হোক ভাষার শুদ্ধতায়

১৯৫২ সালের রক্তাক্ত পথ ধরে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভ করে বাঙালি জাতিসত্তার একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হতে পেরেছি। অথচ আমাদের বিজয়ের প্রায় চার দশক পরেও বিস্ময়ের সাথে দেখতে হচ্ছে আমাদের ভাষার দুরবস্থা। আজ অনেক তরুণই শুদ্ধ করে বাংলা ভাষায় কথা বলতে যেন ভুলে গিয়েছি। পারিবারিক কথোপকথনে, হাটে-বাজারে, বক্তৃতায় অহেতুক বিদেশি ভাষার বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার আধিক্য দেখা যায়। ইদানীং হিন্দি ভাষাও কথাবার্তার মাঝে চলে আসছে। টেলিভিশনের বিভিন্ন নাটক বা সিরিয়ালে অথবা সিনেমায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার করতে গিয়ে এত আধিক্য দেখানো হচ্ছে যে, বাংলা ভাষার শুদ্ধতার বিষয়টিকে শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে। আজ যেন প্রতিনিয়ত বাংলা ভাষাকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে হুমকির মুখে। বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা। পৃথিবীতে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ এ ভাষায় কথা বলে। এ পৃথিবীর অনেক ভাষার মধ্যে একমাত্র বাংলা ভাষাকেই চর্চা ও রক্ষা করার জন্য রক্তের বিনিময়ে মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। আর এ রক্ত মূল্য দিয়েছে আমাদের মহাপ্রাণ পূর্বপুরুষগণ। তাদেরকে আমরা সেই বায়ান্ন হতে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে আসছি। একটি ভাষাকে রক্ষা ও চর্চা করার জন্য ওই ভাষাভাষীর তরুণপ্রাণ অকাতরে রক্ত বিলিয়ে দিতে পারে, এ অবিশ্বাস্য সত্য ইতিহাস অবগত হয়ে ‘জাতিসংঘ’ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে একুশে ফেব্রুয়ারিকে। আর এ উত্সবের ধারক ও বাহক আমরা অর্থাত্, বাঙালিগণ। এ জন্য আমরা অবশ্যই গর্বিত। একুশের পটভূমি বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে শেকল ভাঙা টগবগে নির্ভীক তরুণ-যুবার দল সকল বাধা-বিপত্তি আর ভয়কে উপেক্ষা করে নেমে আসেন পথে। মিছিল নিয়ে এগিয়ে যান ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। পাক পুলিশ নরপশুর দল নির্বিচারে মিছিলের উপর গুলি বর্ষণ করে ছাত্র-জনতা হত্যার বন্য উল্লাসে মেতে উঠে। বুকে রক্তাক্ত ক্ষত নিয়ে একে একে লুটিয়ে পড়েন রফিক, সালাম, জব্বার, বরকতসহ নাম না জানা বহু ছাত্র-জনতা। ইতিহাসের পাতায় রচিত হয় অমর একটি দিনের। যা বাঙালির সমুদ্র সমান ত্যাগ তিতিক্ষা আর আত্মত্যাগের এক মহত্ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যে প্রাণের দাবি বাঙালিরা সেদিন করেছিলেন, কোনো দিক থেকেই এই আন্দোলন অসমর্থনযোগ্য ছিল না বিশ্ববাসীর কাছে। এটা ছিল বরাবরই ন্যায্য দাবি। কেননা পাকিস্তানের সর্বাধিক জনতা ছিলেন বাংলা ভাষী। তার চেয়েও বড় কারণ বাঙালির মাতৃভাষা চিরতরে কেড়ে নিয়ে চাপিয়ে দেওয়া উর্দু ভাষায় কথা বলা কোনো সচেতন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ১৯৫৬ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেয় কেন্দ্রীয় পাক সরকার। ইতি ঘটে এই ভাষা আন্দোলনের। আন্দোলনের শেষ নয়, বরং দিন দিন তার রং পাল্টাতে থাকে মাত্র। সেই আন্দোলনের জল ঢেউ তুলতে তুলতে শেষাবধি ১৯৭১-এ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর নতুন দেশ গঠনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ নামে নতুন এক মানচিত্র। বাহিংলিশ ভাষার ব্যবহার শিশুরা ভাষা শিখে তাদের পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ থেকে। বিনোদনের মাধ্যম ভাষা শিক্ষায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শিশুরা কার্টুন মুভি পছন্দ করে। যেহেতু শিশুদের বাংলা ও ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন, সেহেতু ভালো বাংলা বা ইংরেজিতে এসব মুভি প্রদর্শন করতে পারলে ওদের বিনোদনের পাশাপাশি ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি পেত। উন্নত বিশ্বে প্রত্যেক শিক্ষার্থী একাধিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করে থাকে। চীনা ও জাপানিরা ছাড়া প্রায় প্রতিটি জাতির উন্নয়নে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভারতের তরুণদের বর্তমান বিশ্বজয়ের মিশনে ভালো ইংরেজি জানা সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। আমাদের দেশে স্বাধীনতার পর আবেগের বশে ইংরেজির উপর কম জোর দেওয়া হলেও বর্তমানে সব কারিকুলামে ইংরেজির উপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হচ্ছে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির মর্যাদাই যেন আলাদা। সবাই সমীহ করে চলে। কেউ যখন কথার মধ্যে দু-চারটি ইংরেজি বলে, তখন তার কথা সবচেয়ে বেশি মর্যাদা পায়। শুধু ইংরেজি কেন? ভালো বাংলায় কথা বলতে পারলেও মানুষের মন জয় করা যায়। খুব জ্ঞানগর্ভ কথাও গুছিয়ে বলতে না পারলে দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় না। আবার সাধারণ কথাও সুন্দর করে বলতে পারলে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ না হয়ে যায় না! বর্তমানে আমাদের দেশে প্রদর্শিত শতকরা ৮০ ভাগ চ্যানেলে হিন্দিতে প্রোগ্রাম হচ্ছে। এর ফলে পরিবারের ছেলে-বুড়ো সবাই মনের অগোচরে হিন্দিতে দক্ষ হয়ে উঠছে। প্রায়ই হিন্দিতে কথা বলছে। আমাদের দেশের তরুণেরা হিন্দিতে দক্ষ হয়ে উঠলেও ভারতে তরুণেরা অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলছে। এ দেশের ছেলেমেয়েদের হাতে হিন্দি ভিডিও সিডি আর ভারতের তরুণদের হাতে হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজি নভেল, সিডি শোভা পাচ্ছে। এ দেশের তরুণেরা বলিউড স্টারদের অপেন স্টেজ প্রোগ্রামের টিকেটের জন্য যখন উদ্বিগ্ন তখন ওই দেশের ছেলেমেয়েরা কম্পিউটারের কোনো প্রোগ্রামিং বা কোনো কুইজ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ নিয়ে চিন্তিত। এ দেশের চ্যানেলগুলোতে যখন রাত ৯-১০টায় প্রেমের নাটক, ছবি, গানের অনুষ্ঠান দেখানো হচ্ছে ভারতের অনেক চ্যানেলে তখন কৌন বনেগা ক্রোড়পতি, দাদাগিরি টাইপ কুইজ প্রোগ্রাম দেখানো হয়। অথচ আমরা একটু চেষ্টা করলে পারি দেশীয় চেতনায় আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান প্রদর্শন করতে। যা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বিনোদনের পাশাপাশি জ্ঞান অর্জনের প্রতি আকৃষ্ট করবে। পরিশেষে বাংলা ভাষার জয় তরুণদের দৈনন্দিন জীবনে, কর্মক্ষেত্রে, লেখাপড়ায়, খবরের কাগজে, রেডিও, টেলিভিশন ইত্যাদিতে সঠিক এবং শুদ্ধ বাংলার চর্চা শুরু করলেই মূলত ভাষার এই অপব্যবহার অনেকটাই কমে আসবে। অবশ্যই আমাদের ইংরেজি শেখার প্রতি জোর দিতে হবে, কিন্তু তার জন্য মাতৃভাষাকে পিছু ফেলে নয়, মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে নয়। নিজস্ব সব জলাঞ্জলি দিয়ে অন্ধভাবে অন্যকে অনুসরণ করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়, এতে করে নিজেদের স্বকীয়তা নষ্ট হয়। বাঙালিত্বের কিছু না রেখে নিজেকে বাঙালি বলে চালিয়ে দেওয়া অপমানজনক। তবে এত কিছুর মাঝে কয়েকটি খুশির সংবাদ হচ্ছে—আমরা ধীরে ধীরে প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছি, প্রযুক্তি ক্ষেত্রে আমাদের প্রবেশ ঘটছে যা অবশ্যই সুফল বয়ে আনবে অদূর ভবিষ্যতে। বিশ্বের সপ্তম বৃহত্ ভাষা হওয়া সত্ত্বেও আজো বিভিন্ন সফটওয়্যারের বাংলায় অনূদিত সংস্করণ পাওয়া দুস্কর। আশার কথা হলো এই যে আজকাল অনেকেই এগিয়ে আসছেন এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়। তারা বিভিন্ন ওপেন সোর্স সফটওয়্যারগুলোর যথাসম্ভব বাংলায় অনুবাদ করার চেষ্টা করছেন। এ ছাড়াও বাংলায় লেখার জন্য তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ফোনেটিক কি-বোর্ড। এমনকি প্রায় সম্পূর্ণ বাংলায় আজ লিনাক্স সিস্টেমও পাওয়া যায়। অনলাইনেও দেখা যায় বাংলায় নতুন নতুন অনেক ওয়েব সাইট তৈরি হচ্ছে। এই সাফল্যগুলোই নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষাকে একটি বিশেষ অবস্থানে পৌঁছে দিতে পারে। তরুণেরা শুদ্ধরূপে ও সহজভাবে বাংলায় মনের ভাব আদান-প্রদানে পারদর্শী হয়ে উঠবে এমনটাই আশা করা যায়। মডেল অর্ষা ছবি আশীষ সেনগুপ্ত