[ তা রু ণ্য ]
শাহবাগের গণবিস্ফোরণে নারীদের গৌরবদৃপ্ত অংশগ্রহণ
প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:২১
ঢাকার শাহবাগ চত্বরের গণরোষ এক সপ্তাহকালেরও বেশি যাবত্ অব্যাহত রয়েছে। এই আন্দোলনে বাংলাদেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার স্বতঃস্ফূর্ত স্রোত সম্পর্কে পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমগুলোর বিচার-বিশ্লেষণকে ভ্রমাত্মকই বলতে হবে। এরা অর্থাত্ এই পাশ্চাত্যের প্রচার মাধ্যমগুলো বাংলাদেশে চলমান আন্দোলনটির গভীরতা ও গতিধারা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে বলাই সঙ্গত আর তাই হয় তারা এই মহাবিস্ফোরণের বিষয়টিকে উপেক্ষা করে গেছে অথবা এর তাত্পর্য বুঝতে না পেরে একে শুধু ফাঁসির দাবির আন্দোলন হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যা ঘটে চলেছে সে সম্পর্কে এর চাইতে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে! শুধুমাত্র যুদ্ধাপরাধীদেরকে ফাঁসিতে লটকানোই এই জনবিস্ফোরণের উদ্দেশ্য এমন ধারণা একেবারেই ভুল। শুধু ভুলই নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি চরম অবমাননা ও অবজ্ঞা বিশেষ।
চলতি সপ্তাহের প্রথম দিকেই আমি অন্য এক নিবন্ধে লিখেছিলাম যে, দেশের বৃহত্তম ইসলামী দল হিসেবে পরিচিত জামায়াতে ইসলামীর নেতা কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লাকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়কে ঘিরে কিভাবে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। এক্ষেত্রে দেশবাসী তাদের মধ্যকার সকল রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে ভুলে গিয়ে সকলে মিলে এই বিরল গণজাগরণ সৃষ্টি করেছে। কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে এই বিপুল জনতা বজ্রনিনাদ আওয়াজ তুলেছে আজ।
কেন অসংখ্য মানুষের স্রোতধারা আজ শাহবাগমুখী হলো তা বোঝা দরকার। শান্তিপূর্ণ এই অনন্যসাধারণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনতা তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবি জানাচ্ছে; অনেকের হাতে ফাঁসির রজ্জু থাকায় এদেরকে বাহ্যিকভাবে খানিকটা উগ্র বলে মনে হলেও আসামি কাদের মোল্লাদের মতো বর্বর ও উগ্র এরা নয় নিশ্চয়ই! একাত্তরে কাদের মোল্লারা মানবতার বিরুদ্ধে যে ভয়ংকর অপরাধ করেছে তাতে এদের শাস্তি হওয়া উচিত মৃত্যুদণ্ড এই হচ্ছে বিক্ষুব্ধ জনতার ধারণা এবং দাবি। পক্ষান্তরে কাদের মোল্লাদের সমর্থকরা যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। তাদের মতে এই ট্রাইব্যুনাল স্বচ্ছ নয়, ভুল-ভ্রান্তিতে ভরা এটি। তাছাড়া তাদের আরও অভিযোগ এই যে, এই ট্রাইব্যুনাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার ছাড়া কিছু নয়।
কিন্তু বাস্তবে শাহবাগ চত্বরের আন্দোলন এসব ঠুনকো অভিযোগকে ছাপিয়ে গেছে। আজ শাহবাগ চত্বর কেন প্রতিটি বাংলাদেশির ভাগ্যের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে তা আমাদেরকে ভেবে দেখতে হবে বৈ কি! বাংলাদেশি লেখিকা তাহসিমা আনামের বক্তব্য এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন, ‘কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবি জনগণের প্রতিশোধস্পৃহা থেকে উদ্ভূত হয়নি। ১৯৭১-এ কাদের মোল্লা অপরাধ করেছিলেন, আর সে অপরাধের জন্য তাকে জনগণের বিবেচনায় যে লঘু দণ্ড প্রদান করা হয়েছে তাতে বাংলাদেশের নিত্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষপটে তা সম্পূর্ণ নাকচ হয়ে যেতে পারে, এই আশংকা জনমনে প্রবল ক্ষোভ সঞ্চারের অন্যতম প্রধান কারণ। কাদের মোল্লারা ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটলে সহজেই মুক্তি পেয়ে যাবে। অথচ জনগণ চায় একাত্তরের ঐ জঘন্য অপরাধের স্থায়ী সমাধান। এজন্য মৃত্যুদণ্ডই হতে পারে এর একমাত্র প্রতিবিধান, যাতে কিনা দেশের এক কালো অধ্যায়ের স্থায়ী অবসান ঘটবে।
যা হোক, আমি আমার জীবনে বাংলাদেশের মানুষকে এমন রোষ বহ্নিতে জ্বলে উঠতে দেখিনি। আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কহীন এই মাত্রার বিক্ষোভ ছিল অকল্পনীয়। সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আজ যেভাবে রাস্তায় নেমে এসেছে তা এক পরম বিস্ময়!
শাহবাগ চত্বরের এই গণবিস্ফোরণ কোন দলীয় পক্ষপাতিত্বের বিষয় নয়। এটি নির্দলীয় এক মহাজাগরণ। আর এখানেই এর বৈশিষ্ট্য। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তিও এক্ষেত্রে এই বিপ্লব সাধনের পথ এঁকে দিয়েছে। অনলাইনকর্মী ও ব্লগাররাই প্রথমে কাদের মোল্লার দণ্ডাদেশের প্রতিবাদে এই গণসংযোগের সূত্রপাত ঘটায়, যা অচিরেই জনতা সাগরে অশান্ত উর্মিমালারূপে দেখা দেয়।
শাহবাগ চত্বরের আর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই মহাসমাবেশে বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশুর অংশগ্রহণ। অসংখ্য ছাত্রী, গৃহবধূ, মহিলা, পেশাজীবী বা কর্মী এই মহাজাগরণে প্রাণ সঞ্চার করেছেন। মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে সঙ্গে নিয়ে আসছেন এই মহাবিদ্রোহের সাক্ষী হিসেবে ইতিহাসের কাছে তাদেরকে সোপর্দ করতে।
এ এক অভাবনীয় ঘটনা, বিদ্যুত্ তরঙ্গের মতো এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। সত্য বটে, বাংলাদেশের নারীরা বহুদিন ধরেই রাষ্ট্র, সরকার, সুশীল সমাজ ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রেখে চলেছেন। আবার ১৯৭১ সালে তারা শুধু মুক্তিযুদ্ধের সারথীই ছিলেন না এজন্য সম্ভবত সবচাইতে বেশি মূল্যও দিয়েছিলেন তারাই। গবেষকদের মতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীর উপর পরিকল্পিত উদ্দেশ্যমূলকভাবে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে বলাত্কারের ঘটনা ঘটায় পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা। তখন দুই থেকে আড়াই লক্ষ আবার কারো কারো হিসেবে প্রায় চার লক্ষ মহিলা ও তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং ক্যাম্পে মাসের পর মাস আটকাবস্থায় ধর্ষণের শিকার হতে হয়।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতার বিরুদ্ধে যারা জঘন্য অপরাধ করেছে তাদের বিচার ও দণ্ডদানের ব্যাপারে একচল্লিশ বছর পরে হলেও শহীদদের মাতা-পিতা-ভাই-বোন-সন্তান-সন্ততিরা আজ যেভাবে একাত্ম হয়েছেন, যেভাবে বুলন্দ আওয়াজ তুলেছেন তাতে জাতির দায়মুক্তির পথ প্রশস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ সৃষ্টি করতে গিয়ে যারা অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন এই বিচারকার্য নিষ্পন্ন করে জাতি তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করবে এবার।
শাহবাগের এই গণবিস্ফোরণ সফল হবে নাকি অক্ষমের অর্জন-গর্জনের নামান্তর হয়ে দেখা দেবে কিংবা পদ্মফুলের মতো ফুটে উঠবে বা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর্পূরের মতো উবে যাবে তা দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে রয়েছে সকলে।
লেখক :ওয়াশিংটনভিত্তিক বাংলাদেশি সাংবাদিক ও নীতি বিশ্লেষক। তিনি ‘আনুশে পয়েন্ট’ নামক ব্লগের লেখক এবং ফর্বস্ উইমেন, হাফিংটন পোস্ট ও মিস ম্যাগাজিন ব্লগে নিয়মিত তার লেখা প্রকাশিত হয়