ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য লালন বনাম দারিদ্র্য নির্মূল
প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৫২
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার ক্ষুদ্রঋণের নামে যাহাতে দরিদ্র মানুষকে শোষণ করা না হয়, সেইদিকে সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখিবার আহ্বান জানাইয়াছেন। তিনি এইক্ষেত্রে দারিদ্র্য লালনের পরিবর্তে দারিদ্র্য নির্মূলের প্রসঙ্গ টানিয়া আনেন। পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ২৩ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা চাই না ঋণের বোঝায় মানুষ দুস্থ জীবনযাপন করুক। প্রধানমন্ত্রী তাহার বক্তব্যে ইহাও বলেন যে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিবার প্রাক্কালে ক্ষুদ্রঋণ খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং বিগত ৪ বছরে এই ঋণ প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়া ৩০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হইয়াছে।
ক্ষুদ্রঋণের অর্থের পরিমাণের এই বৃদ্ধি প্রমাণ করে বাংলাদেশের সমাজে ক্ষুদ্রঋণ একটি বাস্তবতা এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এই অর্থের একটি ভাগ রহিয়াছে। কেবল গ্রামীণ ব্যাংক বা ব্র্যাক নহে, হাজার হাজার বেসরকারি সংস্থা ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি চালাইয়া যাইতেছে। বলা যায়, ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির একটি অন্যতম বাস্তবায়ন ক্ষেত্র হইল বাংলাদেশ এবং এই কর্মসূচির মাধ্যমে বহু হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হইয়াছে। কিন্তু সেই তুলনায় দারিদ্র্য বিমোচন হয় নাই। বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির যেমন প্রশস্তির অন্ত নাই, তেমনি ইহার সমালোচনার দিকটিও শক্তিশালী। ক্ষুদ্রঋণ অতি দরিদ্রদের নিঃশেষ হইয়া যাইবার বিপদ হইতে বাঁচাইয়া দিয়াছে, পাশাপাশি উচ্চহারের সুদ তাহাকে ঋণের জালে বন্দী করিয়াও ফেলিয়াছে। ফলে সত্যিকারের দারিদ্র্য বিমোচন আশানুরূপ হয় নাই। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ আদায়ের কঠোর পদ্ধতি তাহাকে সর্বস্বান্ত করিয়াও ফেলিয়াছে। তদুপরি বলিতে হয়, বেসরকারি সংস্থাসমূহ না থাকিলে অতি দরিদ্রদের সুদখোর মহাজনদের দ্বারস্থ হইতে হইত এবং ঋণের জালে জর্জরিত হইয়া নিঃশেষ হইতে হইত। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি সুদখোর মহাজন প্রজাতিটির বিলুপ্তি ঘটাইয়াছে। কিন্তু পরিহাস হইল, ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির সমালোচকেরা এনজিওগুলিকে মহাজনদের সহিতই তুলনা করিয়া থাকে।
বর্তমান সরকারের একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ও তাহার প্রধানের সহিত বিবাদের ঘটনা সর্বজনবিদিত। সরকারের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক বুধবারের পরামর্শটি তাই অনভিপ্রেত নহে। তাহার বক্তব্যে আবার সারবস্তুও রহিয়াছে। ছোট-বড় এনজিওগুলি যেই কর্মসূচি চালাইতেছে, তাহার সঠিক কার্যকারিতা লইয়া ভাবিবার সুযোগও রহিয়াছে। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির ঘাটতিগুলি চিহ্নিত করিয়া ইহাকে অধিক কার্যকর করিবার উদ্যোগ লওয়া দরকার। ইহার ত্রুটিগুলি দূর করিতে এনজিও ফোরাম কিংবা পিকেএসএফ-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে কাজ করা যাইতে পারে। আজকের বাস্তবতায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এনজিওগুলির উপস্থিতি অস্বীকার করিবার উপায় নাই। সরকার এবং এনজিওগুলি একত্রিতভাবে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি অনেক ক্ষেত্রে পালন করিয়া যাইতেছে। কেবল ইহার কার্যকারিতা নিয়া যে প্রশ্নগুলি জারি আছে, তাহার মোকাবিলা করা দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অতীব জরুরি। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র শোষণ কিংবা দারিদ্র্য লালনের পরিবর্তে দারিদ্র্য নির্মূলের পথে দেশ আগাইয়া যাইবে, ইহাই কাম্য।