বারাক ওবামার ভাষণ ও মার্কিন জনমত
প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৫২
মার্কিন প্রেসিডেন্টদিগের ভাষণগুলি প্রায়শ দেশবাসীর জন্য সীমাবদ্ধ না থাকিয়া কারণে-অকারণে বিশ্ববাসীর দিকে ধাবিত হয়। স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে এই বাস্তবতা একান্ত প্রকট হইয়া উঠিয়াছে। এইদিক হইতে দেখিলে গত মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ‘স্টেইট অফ দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণটিকে বেশ খানিকটা ব্যতিক্রমী বলিয়াই মনে হইবে। সর্বশেষ ভাষণটিতে মার্কিনীরা যেই সমস্ত বিষয় লইয়া সর্বাপেক্ষা দুশ্চিন্তার মধ্যে দিনাতিপাত করিতেছেন সেইগুলি লইয়াই মূলত কথা বলিয়াছেন ওবামা।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতে পারে যে, জনমত জরিপগুলির সহিত মিল রাখিয়াই এইবারের স্টেইট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণের বিষয়গুলি বাছিয়া লইয়াছেন ওবামা। চলতি মাসের ৭ হইতে ১০ তারিখের মধ্যে পরিচালিত গ্যালপ-এর জরিপে ২৫ শতাংশ মার্কিনী অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতিকে সর্ববৃহত্ সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছেন। ১৯ শতাংশ মার্কিনী বেকারত্বকে সর্ববৃহত্ সমস্যা হিসাবে দেখিতেছেন। দেখা যাইতেছে যে, কথার ফুলঝুরিতে বাস্তবতা পাশ কাটাইবার চেষ্টা না করিয়া জাতির দুশ্চিন্তার সহিত শরিক হইয়াছেন প্রেসিডেন্ট। প্রদত্ত ভাষণে সূচনা অংশের পরপরই ওবামা অর্থনীতি বিষয়ে বক্তব্য রাখিতে শুরু করেন। ৫৯ মিনিট দীর্ঘ ভাষণের অনেকখানি সময় তিনি মার্কিন অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি লইয়াই কথা বলেন। বেকারত্ব, আবাসন বাণিজ্য, মজুরি, বৈদেশিক বাণিজ্যসহ নানাবিধ প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আলোকপাত করিয়াছেন তিনি। ওবামা যাহা বলিয়াছেন তাহাতে কয়েক বত্সর ধরিয়া দুর্গতিতে নিপতিত মার্কিন অর্থনীতি আড়মোড়া ভাঙিয়া জাগিয়া উঠিবে কিনা তাহা পরের কথা। আসল ব্যাপার হইতেছে ওবামা ইহা স্পষ্ট করিতে সক্ষম হইয়াছেন যে, প্রেসিডেন্ট তাহার জনগণের মনের কথাগুলি পড়িতে পারিয়াছেন এবং তাহাদের সমস্যাগুলি সমাধানে সর্বক্ষণ নিয়োজিত আছেন। এই কারণেই সম্ভবত ওবামার ভাষণটি জনগণের উদ্দেশে একগাদা উপদেশবাণী বর্ষণের মধ্যে সীমিত হইয়া নাই।
ওবামা তাহার বক্তব্যে আরও আনিয়াছেন শিক্ষা, অভিবাসন, বন্দুক-সন্ত্রাস, পরিবেশ, সাইবার-সন্ত্রাসসহ নারীর জন্য সুরক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তাসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রসঙ্গ। উল্লেখ্য যে, এই বিষয়গুলির বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই জনগণ যেই মাত্রায় গুরুত্ব দেখাইয়া থাকে সেইগুলির ব্যাপারে ওবামা তাহার ভাষণে প্রায় কাছাকাছি মাত্রার সময় ব্যয় করিয়াছেন। বুঝিতে অসুবিধা হয় না যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষণ চটজলদি মনে যাহা আসে তাহা বলিয়া ফেলিবার মতো ব্যাপার নহে। আর এই কারণেই প্রায় সকল ক্ষেত্রেই জনমনের প্রতিফলন ঘটাইলেও অন্তত দুইটি বিষয়ে সাধারণের ভাবনা হইতে দূরে অবস্থান করিতেছেন ওবামা। এই দুইটি বিষয় হইতেছে শিক্ষা ও বাজেট ঘাটতি। গ্যালপ জরিপে দেখা যায়, মাত্র তিন শতাংশ মার্কিনী শিক্ষা লইয়া ভাবিয়াছেন। আর তাহাদের প্রেসিডেন্টের ভাষণে শিক্ষা ১০ ভাগ সময় অধিকার করিয়া রাখিয়াছে। এইখানেই আসিতেছে একজন প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়কের প্রশ্ন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাধারণ্যে অমনোযোগ দেখা দিলেও ধীমান একজন রাষ্ট্রনায়ক ঠিকই তাহা অগ্রে তুলিয়া ধরেন। বাজেট ঘাটতি প্রশ্নে ১৩ শতাংশ দুশ্চিন্তাতে থাকিলেও ওবামার ভাষণে ইহার জন্য বরাদ্দ ছিল ছয় ভাগ সময়। বুঝিতে অসুবিধা হয় না যে, তিনি বিষয়টি লইয়া ভাবিত; কিন্তু দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নহেন। বাজেট ঘাটতি প্রসঙ্গ লইয়া মার্কিন আইনসভাতে দুই দলের মধ্যে নানাবিধ মতানৈক্যও আছে। কিন্তু তাই বলিয়া অর্থনীতির চাকাটিকে পুনরায় গতি দিবার যেই চেষ্টা ওবামার নেতৃত্বে চলিতেছে তাহা যেনতেনভাবে নষ্ট করিয়া দিবার নষ্ট রাজনীতি কিন্তু বিরোধী দল রিপাবলিকান পার্টি করিতেছে না। হতাশা এই যে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে উচ্চমান পরিলক্ষিত হয়, তাহার সহিত যুক্তরাষ্ট্র বহির্বিশ্বে যাহা করিয়া বেড়ায় সেইসব কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক বিচারে মিলানো যায় না।