এলপি গ্যাসের জন্য হাহাকারের কারণ

গত শুক্রবার ইত্তেফাকে গ্যাস সংক্রান্ত দুইটি রিপোর্ট ছাপা হইয়াছে। একটি রিপোর্টের মূলকথা এলপি গ্যাসের বাজার চড়া। মাত্র চারটি বেসরকারি কোম্পানি বাজার নিয়ন্ত্রণ করিতেছে। ফলে সরকারি ৭০০ টাকার সিলিন্ডারও বিক্রি হইতেছে ১৭০০ টাকায়। তবে এই রিপোর্টে ইহাও বলা হইয়াছে যে, চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ এলপি গ্যাস বেসরকারি কোম্পানিগুলিই বাজারজাত করিতেছে। তাই নিয়ন্ত্রণের নাটাইটা তাহাদের হাতে থাকিবে ইহাই স্বাভাবিক। অপর রিপোর্টটির ভাষ্য হইল, আপাতত বাসা বাড়িতে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার কোন পরিকল্পনা নাই সরকারের। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালে এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এনামুল হক এই কথা বলেন। যেখানে গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্পোত্পাদন ব্যাহত হইতেছে ও নূতন সংযোগ দেওয়া সম্ভব হইতেছে না, সেখানে এই সমস্যা থাকিবেই এবং সাংবাদিকগণও এই সমস্যার কথা লিখিয়াই যাইবেন। বর্তমানে গ্রাহকরা লিকুইড পেট্রোলিয়াম বা এলপি গ্যাস দ্বিগুণ দামে ক্রয় করিতেছে। আমদানি করিয়া বাজারজাত করার জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলির এলপি গ্যাসের দাম বেশি হওয়াটাই সঙ্গত। পক্ষান্তরে ভর্তুকি প্রদান ও নিজস্ব গ্যাস পরিশোধন করিয়া বাজারজাত করার কারণে সরকারি দুইটি কোম্পানির এলপি গ্যাসের দাম অনেক কম হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি এলপি গ্যাসের মূল্য ব্যবধান এতই বেশি যে, এক্ষেত্রে নৈরাজ্য সৃষ্টি না হইয়া পারে না। এক্ষেত্রে সরকারের ভর্তুকি দেওয়ার উদ্দেশ্য একেবারেই মাঠে মারা যাইতেছে। ইহাতে রাজস্ব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। ইহার আগে দেশের বড় বড় শহরগুলিতে বিপিসির নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করিয়া নির্ধারিত দামে এলপি গ্যাস বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করিতে দেখা যায়। কিন্তু উত্পাদন বৃদ্ধি ও সরকারি-বেসরকারি এলপি গ্যাসের দামের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যের বিধান করিতে না পারায় এই সংকটের সমাধান হয় নাই। বর্তমানে দামগত পার্থক্যের কারণে বেসরকারি বিপণনকারী কোম্পানিগুলি সরকারি এলপি গ্যাস নিজস্ব বোতলে ভরিয়া অধিক দামে বিক্রয় করিতেছে। মূল্য পার্থক্যের সুযোগ তাহারা গ্রহণ করিতেছে অনায়াসেই। প্রকৃতপক্ষে গ্যাসের চাহিদা মিটাইবার কোন পরিকল্পিত উদ্যোগ আমাদের নাই। তাহাছাড়া ডিলারদের জন্য ধার্যকৃত ডিপোমূল্যে বিক্রয়ে যে লাভ হয়, সরবরাহ কমিয়া গেলে পূর্বের ন্যায় লাভ করিতে হইলে দাম বৃদ্ধি ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। এমতাবস্থায় কোন কোন ডিলার ঝুঁকি হইতে রক্ষায় বরাদ্দপত্রই বিক্রয় করিয়া দেয় এমন দৃষ্টান্তও আছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়াছে, সরকার দাম নির্ধারণ করিতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত হয়। দেশে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নাই ইহাই মূল সমস্যা। দেশে কেবল এলপি গ্যাসের চাহিদাই তিন লক্ষ টন। অথচ সব মিলাইয়া সরবরাহ করা হইতেছে প্রায় ১ লক্ষ টন। ইহার অধিকাংশই আমদানিকৃত। ও বেসরকারি খাতের অবদান। পক্ষান্তরে সরকারিভাবে মাত্র ২০/২২ হাজার মেট্রিক টন সরবরাহ করা হয়। এই যখন পরিস্থিতি, তখন দুর্ভোগ কিভাবে কমিবে তাহাও প্রশ্ন। এদিকে রাজধানী ঢাকায় আবাসিক এলাকায় পাইপলাইনের সাহায্যে সরবরাহকৃত গ্যাসের দাম মাসিক সাড়ে চারশত টাকায় নির্ধারণ ও ইহার ব্যবহার আনলিমিটেড বা অসীমাবদ্ধ হওয়ায় বৈষম্য বাড়িয়াছে। আসলে হাহাকারটা এ কারণেও বেশি। কেননা একটি এলপিজি সিলিন্ডার তুলানামূলক অনেক বেশিদামে কিনিয়াও অনেকের এক মাসও যায় না। এমতাবস্থায় উত্পাদন ও সরবরাহ বাড়ানো ছাড়া এলপি গ্যাসের মূল্য নিয়া গ্রাহকদের নানা অভিযোগ দূর করার আর কোন পথ নাই। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি চাহিদা অনুযায়ী যাহাতে অধিক গ্যাস আমদানিতে আগাইয়া আসিতে পারে সেক্ষেত্রে সরকারের ইতিবাচক ভূমিকা পালন করিতে হইবে। সরকারি-বেসরকারি ভিত্তিতে দেশে আরও সিলিন্ডার উত্পাদনকারী কারখানা স্থাপন করিতে হইবে। তাহাছাড়া স্থলভাগে গ্যাস উত্তোলনে বিপিসির সক্ষমতা বাড়াইয়া কেবল সমুদ্রে বিদেশি কোম্পানির উপর নির্ভরতার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে।