ভেজাল

ফরমালিনমুক্ত বাজার অর্থহীন উদ্যোগ

মানবদেহে ফর্মালিনের ভয়াবহ ক্ষতি প্রতিরোধ করার মহত্ উদ্দেশ্যে ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান এফবিসিসিআই গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মালিবাগ বাজারকে ফর্মালিনমুক্ত বাজার হিসাবে ঘোষণা করে এবং যন্ত্র দিয়ে নিয়মিত ফর্মালিন পরীক্ষার ব্যবস্থা করে। এরপর ক্রমান্বয়ে শান্তিনগর, মহাখালি, টাউন হল, মিরপুর-১, গুলশান-২ ইত্যাদি বাজারকে ফর্মালিনমুক্ত বাজার ঘোষণা করা হয়। বাজার বলতে কাঁচা বাজার অর্থাত্ মাছ, মাংস, সবজি ও ফলমূলের বাজারকেই বোঝানো হয়েছে। পচনশীল দ্রব্যেই প্রতারকরা ফর্মালিন ব্যবহার করে থাকে, যেমন মাছ, বিশেষ করে আমদানীকৃত বা দূর-দূরান্ত থেকে আগত মাছ, আমদানীকৃত ফল, যেমন: কমলা, মাল্টা, আপেল, আঙ্গুর, বেদানা ইত্যাদি। দেশীয় তরল দুধ এবং জুস প্যাকে,বরফকলে ফর্মালিন ব্যবহূত হয়। প্রতারক চক্র নানা পন্থায়, নানারূপে ফর্মালিন ব্যবহার করে থাকে। উদ্দেশ্য, ব্যবসায়িক দ্রব্য পচন রোধ করে মুনাফা বৃদ্ধি করা। কিন্তু তারা যে মানুষকে ধীরগতিতে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে খুন করার মতো ঘৃণ্য অপরাধ করছে সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। ফর্মালিনকে ভেজাল হিসাবে নয় বরং প্রাণনাশী বিষ হিসেবে আইনের চোখে দেখতে হবে এবং সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক অর্থদণ্ড দিলে ফর্মালিন মেশানো বন্ধ হবে না। দ্বিতীয়ত. গোড়ায় জল না ঢেলে আগায় ঢাললে যেমন কাজ হয় না, তেমনি ফর্মালিন আমাদানী, মজুত ও বিক্রি নিয়ন্ত্রণ এবং আমদানীকৃত পণ্যের প্রবেশপথে অর্থাত্ বন্দরে পণ্য পরীক্ষা করে ঢুকতে না দিলে ফর্মালিন মেশানো কোনদিন বন্ধ হবে না। এফবিসিসিআইয়ের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির মতে, বর্তমানে দেশে ৫০০-৬০০ টন ফর্মালিন মজুত আছে। কি ভয়ঙ্কর অবস্থা! তাহলে ফর্মালিন সহজলভ্য হবে না কেন। হাসপাতাল ও ঔষধ কোম্পানি ছাড়া খুব কম শিল্পে ফর্মালিন ব্যবহার হয়। তাহলে ৬০০ টন ফর্মালিন কোথায় ব্যবহূত হয় তা সহজেই অনুমেয়। বাণিজ্যমন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, কঠোর আইন হবে। বাংলাদেশে আইনের অভাব নেই, কিন্তু প্রয়োগের অভাব আছে। কাজেই আইন করার পাশাপাশি আন্তরিক হলে সরকারকে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নিতে হবে। ১। বর্তমান বিরাট মজুদ কমানোর জন্য আগামী ছ’মাস ফর্মালিন আমাদানী বন্ধ করা উচিত। (২ ) যাদের কাছে অবৈধ মজুদ আছে এক মাসের মধ্যে তা টিসিবি’র নিকট জমা দিতে হবে। ৩) একমাত্র সেনা বাহিনীকে বা অপারগতায় টিসিবিকে ফর্মালিন আমদানির লাইসেন্স দেয়া উচিত এবং সমস্ত হাসপাতাল, ঔষধ কোম্পানিগুলোকে আমদানীকারকের নিকট থেকে বৈধভাবে ফর্মালিন কিনে নিতে হবে। ৪) চতুর্থত. আমাদানিকৃত মাছ, ফলমূল ও পচনশীল দ্রব্য দেশের প্রবেশপথে পরীক্ষা করার জন্য প্রতিটি বন্দরে ফর্মালিন টেস্ট করার যন্ত্রপাতিসহ স্থায়ী টিম থাকতে হবে এবং তাদের সনদপত্র ছাড়া কোন পণ্য খালাস করা হবে না। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে বন্দরে আমদানী করা পণ্যের বেলায় রেডিয়েশন, ক্ষতিকর পোকা-মাকড় , কীটনাশক আছে কিনা তার সনদ দিলে খালাসের অনুমতি নিলে কিন্তু মরণাত্মক বিষ ফর্মালিন পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই । (৫) প্রত্যেকের নিকট ফর্মালিন কিট সহজলভ্য করার জন্য ভর্তুকি দিয়ে কম দামে তা বিতরণ করতে হবে। সুলভে পাওয়া গেলে প্রত্যেকেই কিট নিয়ে বাজারে যেতে পারে। খুচরা বিক্রেতারা ফর্মালিন মিশালেও সংখ্যায় কম, আমদানীকারী ও পাইকারি আড়তে, পাইকারদের গুদামে, বড় বড় আমদানীকারকদের গুদামে পরীক্ষা চালাতে হবে। এ সব জায়গায় উেকাচ দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই র্যাব ও সেনাবাহিনী দিয়ে অভিযান চালাতে হবে। সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ হবে ফর্মালিন আমদানী, মওজুদ ও বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করা, তাহলেই ৮০% অপরাধ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সরকারকে সেদিকে নজর দেয়ার জন্য নিবেদন করছি। লেখক : এফসিএ ও কথাসাহিত্যিক