প্রজন্মের ভাষা গবেষক

ঊনবিংশ শতাব্দী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক অতি গৌরবময় সময়। এ সময় শুধু যে বাংলা ভাষা তার পূর্ববর্তী গঠন পরিবর্তন করে নতুনভাবে নির্মিত হতে শুরু করেছিল তাই নয়, ভাষার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্য নব নব শাখায় বিকশিত হয়ে সাহিত্যের এক উজ্জ্বল জগত্ সৃষ্টি করেছিল। বাংলা ভাষা এবং লোক সংস্কৃতি বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে গেছে অনন্য সম্মানে, যা রূপ পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। বাংলা ভাষার উত্পত্তি এবং এর বিকাশ নিয়ে গবেষণা করছেন অনেকেই। এই প্রজন্মের কাছে ভাষার নিগূঢ় তত্ত্ব পৌঁছে দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য। তাই এই প্রজন্মের কয়েকজন মেধাবী ভাষা গবেষকদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। মা মু ন অ র র শী দ প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সময়টা ২০০৮ দিকে, ভাষা গবেষণার শুরু একাডেমিক পরিসর থেকেই শুরু। সম্ভবত পঞ্চম সিমেস্টারের ছাত্র ছিলেন তখন। তখন লক্ষ করলেন, ক্লাস থেকে দেওয়া অ্যাসাইনমেন্টের আইপিএ হাতে লিখতে হচ্ছে। এমনকি চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রশ্নেও হাতে লিখিত আইপিএ ছিল। আন্তর্জাতিক লে-আউটে বাংলা ভাষার রূপান্তরে শ্রম ও সময় বেশি লাগত। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে একদিন বাংলার জন্য সহজ লে-আউট তৈরি করে ফেললেন। শ্রদ্ধেয় দানীউল হক স্যারের পরামর্শে কিছুটা পরিমার্জনও করলেন। এভাবেই তার ভাষা-গবেষণার শুরু। বলছিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মামুন অর রশীদ সম্পর্কে। তিতাস পাড়ের এক ছোট্ট মফস্বলে মামুন অর রশীদের জন্ম। বাবার কড়া শাসনেই কেটেছে তার শৈশব। জমজ দুই সন্তানকে বাবা দুই হাতের আঙুলে ধরে কেজি স্কুলে যাওয়ার পথে বাংলা-ইংরেজি বর্ণমালা, বানান, উচ্চারণ শেখাতেন। সরকারি কলেজের লাইব্রেরিতে (বাবার কর্মক্ষেত্র) বই হাতে ধরিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিতেন। তখন দুই ভাই বইয়ের ছবি দেখতে দেখতে, কখনও পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়তেন। তার বিশ্বাস, ওই লাইব্রেরিটাতেই তার গাঁথুনি শক্তি, পাঠাভ্যাস গড়ে উঠেছিল। কৈশোরে সহশিক্ষা কার্যক্রমে নিয়মিত ছিলেন। পেয়েছিলেন উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার। ‘তিন গোয়েন্দা’ ছিল তার কৈশোরের নিত্যসঙ্গী। তার বন্ধুরা ‘তিন গোয়েন্দা’ হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। একটা পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন। মামুন অর রশীদ তার সম্পাদক ছিলেন। তখন দূরের বিদ্যালয়ে গিয়ে পত্রিকা বিক্রি করেছেন, তার জন্য এ এক বিরল অভিজ্ঞতা। বর্তমানে মামুন অর রশিদের বাবা অবসরে। মা সংসার-নিমজ্জিত। তিনভাইয়ের একজন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করছেন, অন্যজন পাঠগ্রহণ করছেন। জমজ ভাইয়ের সাথে সাদৃশ্য এত বেশি যে, প্রায়ই পরিচিতজনের ভুল হয়ে যায়। পাঠদান ও গবেষণা দুটোকেই শিক্ষকতা পেশার অংশ মনে করেন তিনি। দুটোই তার কাছে উপভোগ্য। তার গবেষণা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার প্রকাশিত গ্রন্থের নাম ‘আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালা ও বাংলা ধ্বনি’। এখানে আইপিএ’র ইতিহাস, সাধারণ পরিচয়, বাংলা ধ্বনির উচ্চারণ বৈচিত্র্য, আইপিএ লিখনের নিয়মাবলি ও সতর্কতা স্থান পেয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানবিক অনুষদের গবেষণা প্রকল্পে তার চলমান গবেষণা মেশিন ট্রান্সলেশন নিয়ে। ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদের সবচেয়ে কার্যকরী পথটি নিশ্চিত করা এ-গবেষণার উদ্দেশ্য। শিরোনাম :‘Approaches to Machine Translation and Bangla Szntax’। ট্রিফথং নিয়ে আরেকটি গবেষণা সম্পন্ন হওয়ার পথে। এ ছাড়াও ব্যক্তিগত উদ্যোগে আদিবাসী বর্ণমালার ফন্ট ও লে-আউটের কাজ করছেন তিনি, যা অতিরিক্ত সফটওয়্যার ছাড়াই ওয়েবে বা যেকোনো প্লাটফর্মে কার্যক্ষম থাকবে। তার অন্যান্য প্রকাশিত গ্রন্থ :‘উত্তর-আধুনিকতা উত্তর-ঔপনিবেশিকতা নিম্নবর্গ’ (২০০৯), ‘বাংলা উপন্যাসে নিম্নবর্গ’ (২০১১)। সবশেষে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাতৃভাষা বলেই আমার বাংলাভাষাপ্রীতি। আমি ভাবছি একটি অত্যাধুনিক ভাষাবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের কথা। যেখানে আদিবাসী শিশুর পাঠ্যপুস্তক প্রণীত হবে, সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে গবেষণা হবে, বিপন্ন ভাষাগুলোর লিখিত পুঁথি ও মৌখিক সাহিত্য সংরক্ষিত হবে, প্রতিষ্ঠিত ভাষাগুলোকে কম্পিউটিশনার লিঙ্গুইস্টিকসের মাধ্যমে শব্দকোষ, বানান-সংশোধক, ওসিআর, টিটিএস, ফন্ট, যান্ত্রিক অনুবাদের আওতায় আসবে। মানবকল্যাণে ভাষাগবেষণার প্রয়োগে অনেকের সাথে আমিও স্বপ্ন দেখি।’ মামুন অর রশীদ ডাক নাম :মামুন জন্মতারিখ ও স্থান :১৭ সেপ্টেম্বর, নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মায়ের নাম :ফরিদা আক্তার বাবার নাম :আবু বকর ছিদ্দিক প্রথম স্কুল :কল্লোল কিন্ডার গার্টেন প্রিয় মানুষ :পিতামহ :হাজী দিলোয়ার আলী প্রিয় উক্তি :জীবনের মতো নিরর্থক সুন্দর আর নেই। প্রিয় পোশাক :টি-শার্ট, নীল জিন্স অবসর কাটে যেভাবে :ব্রাউজিং, শাহবাগ-কাঁটাবনে আড্ডায়। সাফল্যের সংজ্ঞা :জন্ম থেকেই আমরা প্রতিযোগিতায় নিক্ষিপ্ত। পরিশ্রম আর ব্যক্তিগত সততায় জীবন পূর্ণ করাই আমার কাছে সাফল্য। ----- শা ম সু জ্জা মা ন মি ল কী সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ‘শৈশব থেকেই গবেষণাধর্মী কোনো বই কাছে পেলেই পৃষ্ঠা উল্টে চলে যেতাম শেষের দিকে, গ্রন্থপঞ্জি দেখতে। দেখতে ভালো লাগত বইয়ের নাম। খুব সাধ হতো আমিও গবেষণা করব, আমিও লিখব। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার সঙ্গে পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিসূত্রে, ২০০২ সালে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়ে কামালউদ্দিন হলে সিট বরাদ্দ পাই। প্রথমদিকে রুমে সিট না পেয়ে একমাত্র আশ্রয়স্থল হয় গণরুম। পরিচিত হলাম হলের বয়োজ্যেষ্ঠ ২১তম ব্যাচের ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে। গুনে গুনে উনি আমার ১০ বছরের সিনিয়র, আমি ৩১তম ব্যাচ। হলে থাকেন এমফিল গবেষণার সূত্রে। র্যাগিং আমার কাছে ভীতিকর না হলেও মাঝে মাঝে নির্বিবাদ রাত্রিযাপনের জন্য আশ্রয় নিতাম ফারুক ভাইয়ের রুমে। ফাঁকে ফাঁকে রেকর্ডারে ধারণকৃত বিভিন্নজনের সাক্ষাত্কার লিখে দেওয়ার সূত্রেই গবেষণার সঙ্গে পরিচয়। ইতোমধ্যে সাহচর্য পেয়ে গেছি হায়াত্ মামুদ স্যার, দানীউল হক স্যার, সেলিম স্যার (নাট্যাচার্য সেলিম আলদীন)-এর। তবে আমার প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার হাতেখড়ি প্রফেসর মহাম্মদ দানীউল হকের কাছে স্নাতক পর্যায়ে অগ্রন্থিত লোকসংগীত সংগ্রহের কাজ করতে গিয়ে।’ এভাবেই শুরু করলেন গবেষক শামসুজ্জামান মিলকী শামসুজ্জামান বলেন, ‘স্নাতক পর্যায়ে অগ্রন্থিত লোকসংগীত বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে আমার সম্যক পরিচয় ঘটে কিশোরগঞ্জের ভাটি অধ্যুষিত জনপদের ভাষা ও ভাষাভঙ্গির দিকে। কাজ করতে তেমন বেগ পেতে হয়নি কারণ আমি ভাটির মানুষ। স্নাতক চতুর্থ বর্ষে ভাষা জরিপকার্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম কয়েকদিন বিভাগীয় শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে। দেখলাম বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্র বিশাল। তাই এমফিল গবেষণাও করলাম ময়মনসিংহের লোকভাষা বিষয়ে।’ তিনি মনে করেন, গবেষণা নিঃসন্দেহে পেশা হওয়া উচিত। কর্মক্ষেত্রে গবেষণালব্ধ ফলাফল প্রয়োগে যেমন সুফল আসে তেমনি গবেষক বা ফ্রি-ল্যান্স গবেষক পেশাও বেছে নেওয়া যায়। বাংলাদেশে বেসরকারি পর্যায়ে পেশা হিসেবে গবেষণা যথেষ্ট এগিয়েছে। তার শৈশবের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একেবারে গ্রাম বলতে যা বোঝায় তেমন এলাকায় আমার জন্ম। শৈশবে গ্রামের স্কুলে পড়াশোনার সূত্রপাত। দুরন্ত কৈশোরও কেটেছে গ্রামেই। স্কুলের লাইব্রেরি থেকে সপ্তাহে একদিন বই নিতে পারতাম। অগ্র-কৈশোরেই পরিচয় হয়েছে ‘পথের পাঁচালী’, ‘রাণীখালের সাঁকো’ কিংবা ‘আশি দিনে ভূ-প্রদক্ষিণ’-এর সঙ্গে। পূর্ণ কৈশোরে আচ্ছন্ন করেছিল অনিমেষ (উত্তরাধিকার, সমরেশ বসু)। বইপড়া বিষয়ে কোনো অভিযোগ কোনোকালেই কারও থেকে পাইনি। আজও আমার স্ত্রী ইসরাত তিন্নি আমি পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেলে বইখানা সযত্নে তুলে রাখে। চার বছরের সংসার জীবনে আমাদের আনন্দের নাম নানজিবা নন্দিনী পারমিতা, আমার এক বছর বয়সী একমাত্র কন্যা।’ তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন নিয়ে এভাবে ব্যাখ্যা করেন শামসুজ্জামান, ‘শুধু একজন সত্ মানুষ থাকা। সত্ বললাম এ-কারণে অসততা থাকলে পক্ষপাতিত্ব আসতে পারে। গবেষক যদি পক্ষপাত দোষে দুষ্ট হন তাহলে তার গবেষণলব্ধ ফলাফল কোনোদিনই মানবতার কল্যাণ বয়ে আনবে না।’ ভাষা নিয়ে কাজ করার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো কম্পিউটারে লিখন সমস্যা। যদিও এখন কিছু সফটওয়্যার পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষত, আইপিএ লেখার সমস্যা দূরীকরণে আরও সহজে ব্যবহারযোগ্য পদ্ধতি উদ্ভাবনে সচেষ্ট হওয়া উচিত। বাংলা ভাষার উত্তরণে এই পরামর্শ দিলেন তিনি, প্রথমত, বাংলা ভাষাকে প্রকৃত বাংলা ভাষার রূপে রাখতে উচ্চারণ-বিকৃতি রোধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলা বানানের যেসব আধুনিক বানান পরিবর্তিত হচ্ছে তা ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক ভাষায় রচিত লোকসাহিত্যের যথাযথ সংরক্ষণ করতে হবে। অন্যথায় তা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। শামসুজ্জামান মিলকী ডাকনাম :মিলকী জন্মতারিখ ও স্থান :৭ ফেব্রুয়ারি, কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায়। মায়ের নাম :আনোয়ারা বেগম বাবার নাম :আবদুল খালেক প্রথম স্কুল :নিকলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মুখ :আমার আত্মজা নানজিবা নন্দিনী পারমিতা প্রিয় উক্তি :সময় গেলে সাধন হবে না। প্রিয় পোশাক :পাঞ্জাবি, জিন্স অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে, মেয়েকে সঙ্গ দিয়ে। সাফল্যের সংজ্ঞা :ধৈর্য্য আর অধ্যবসায়কে একসূত্রে গ্রথিত করার নামই সাফল্য। ----- মো. কা ম রু জ্জা মা ন আ জা দ বিভাগীয় প্রধান (বাংলা বিভাগ), ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, যশোর হাশিমপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণীতে যখন পড়তেন প্রিয় শিক্ষক জীবন বোস স্যারের অনুপ্রেরণায় একটি দেয়াল পত্রিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে সাহিত্যের খোঁজখবর নেওয়া শুরু। বাকিটা যশোরের উর্বর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কাজ, যা তাকে বাংলাভাষার নানা দিক নিয়ে কাজ করতে উত্সাহিত করেছে। কেন বাংলা ভাষার প্রতি এই ভালোলাগা—জানতে চেয়েছিলাম কামরুজ্জামান আজাদের কাছে, বললেন, ‘আমার কণ্ঠে প্রথম অস্ফুট ধ্বনি ‘মা’ উচ্চারিত হয়েছে বাংলায়, আমার আবেগ-উচ্ছ্বাস, স্বপ্ন-প্রত্যাশা, ভালোলাগা-ভালোবাসা, ঘৃণা-বিদ্বেষসহ যাবতীয় আবেগিক অনুভূতি প্রকাশিত ও বিকশিত হয় যে ভাষায় আমি তাকে ছাড়া আর কোন ভাষাকে ভালোবাসব?’ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হওয়ার কারণে যতটুকু চর্চা, তাতেই নিজেকে গবেষক বলতে নারাজ এই বিনয়ী মানুষটা। তার আগ্রহের ক্ষেত্র গান আর লোকসাহিত্য। তাই, আত্মগত পরিতৃপ্তির জন্য যশোর অঞ্চলের লোকসাহিত্যের বিলুপ্ত কিছু শাখা তুলে ধরার প্রয়াস হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এ কাজটি অত্যন্ত কঠিন। এককভাবে তা সম্পাদন করা সম্ভব নয়। আরও অনেককে এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে বলে জানান আজাদ। তিনি মনে করেন, যেকোনো গবেষণা অথবা সৃষ্টির জন্য নতুনদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। কারণ, নতুনদের উদ্যম, সৃজনীভাবনা এবং বিশ্লেষণী শক্তির বৈশিষ্ট্যর গুরুত্বই অন্যরকম; শাহবাগের তারুণ্যই এর প্রমাণ। তবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অপেক্ষাকৃত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহ কম। তিনি আশাবাদী সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন শাহাবাগের জমায়েতের মতো তরুণরা শেকড়ের সন্ধানে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হবে। তারুণ্য শেকড় সন্ধানে ফিরে এসে ঠিক শাহবাগের মতো তবেই আবিষ্কার করতে পারবে এক অন্যরকম নিজেকে। যে ভাষায় তারা কথা বলছে, সেই ভাষার প্রতি অনুরাগ জন্মাবে, এমনটাই মনে করেন তিনি। কামরুজামান আজাদ ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘শৈশব ও কৈশোরে খুব দুরন্ত ছিলাম, যার অনেক চিহ্ন এখনও শরীরে বয়ে নিয়ে বেড়াই। বাংলাদেশ আমার প্রিয় স্বদেশ ঠিক আমার গ্রাম পাঁচবাড়িয়ার মতো স্নেহময়ী! আমার স্ত্রী যশোর বিএএফ শাহীন কলেজের শিক্ষক আর আমার একমাত্র মেয়ে শারিন শাহীন স্কুলে ৪র্থ শ্রেণীতে পড়ে। তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন প্রিয় স্বদেশ, বাংলাভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে দুটি প্রতিবন্ধকতাই মুখ্য বলে তিনি মনে করেন। একটি আমরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষকেরা, দুই ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া। জনগণ ভাষার প্রতি তাদের যা করণীয় করে যাচ্ছে, শুধু পারছেন না তারা; যা একটু সচেতন হলেই সম্ভব। নিপীড়িত তার নিপীড়নের অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার পরেও নিপীড়নের একটা আতঙ্ককে ধারণ করে রাখে অনেকটা সময় ধরে—এটা অনেকটা তেমনই। অনেকটা এমন, যেন বাংলা ভাষাটা যেকোনো সময়েই আবার হামলা-আক্রমণের মুখে পড়ে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। ফলে বাংলার শ্রেষ্ঠত্ব অনেক সময় অনুভব করতে হয় হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবির অবজ্ঞায়, যার চর্চা আমাদের হাসি-ঠাট্টায়, খিস্তিতে, সাধারণ আড্ডায় আর ব্লগগুলোতে বিদ্যমান। সেগুলো নিজস্ব ভাষা সচেতনতার বেড়ে ওঠায় একটা পর্যায় পর্যন্ত গ্রহণযোগ্যই অনেকে বলবেন, এবং ভুল ঠিকের তর্কের ঝামেলা এড়াতে সেগুলো নিয়েও তিনি তর্ক এড়াবেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আগে সবাইকে মনে-প্রাণে বাঙালি হতে হবে। এই দেশকে নিজের দেশ ভাবতে হবে এবং নিজের মুখের কথা নিজের কানে শুনে অনুধাবন করতে হবে এ ভাষা আমার মাতৃভাষা, তবেই বাংলাভাষার উত্তরণের জন্য উন্মোচিত হবে নতুন দিগন্ত। মো. কামরুজ্জামান আজাদ ডাক নাম :আজাদ জন্মতারিখ ও স্থান :৬ ডিসেম্বর ,যশোর মায়ের নাম :জুলেখা খাতুন বাবার নাম :মৃত সর্দার মো. আব্দুল গফুর প্রথম স্কুল :পাঁচবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রিয় মানুষ :সকল মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারীরা। প্রিয় উক্তি :এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা! প্রিয় পোশাক :যখন যেখানে যা মানায়। অবসর কাটে যেভাবে :গান লিখে আর সুর করে এবং বই পড়ে। সাফল্যের সংজ্ঞা :যখন নিজেকে মনে হয় আমি দেশপ্রেমিক, আমি মানুষের এবং মানবতার জন্য সহায়ক। ---- ড. তু হি ন ও য়া দু দ সহকারী অধ্যাপক বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ‘লেখালেখি স্কুলজীবন থেকেই করতাম। কবিতা লিখতাম। একটি উপন্যাস লিখেছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক যে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময়ে বাড়ি থেকে সেটি হারিয়ে যায়। সেই উপন্যাসের প্লট এখনও মাথার মধ্যে কাজ করে,’ এভাবেই শুরু করলেন প্রজন্মের বাংলা ভাষার গবেষক তুহিন ওয়াদুদ। কেন বাংলা ভাষার প্রতি এই ভালোলাগা? তুহিন বললেন, ‘এই ভালোলাগার কারণ নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে ছোটবেলা থেকেই গল্প-উপন্যাস পড়তাম। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মণি, যিনি সম্পর্কে আমার চাচা হন। তার সঙ্গে আমার বয়সের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বন্ধুত্ব ছিল এই সাহিত্যকে ঘিরে। তার সঙ্গে থেকে থেকে সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ গভীর হয়। এভাবেই নিজের মধ্যে সাহিত্য সম্পর্কে ভালোলাগা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়য় পড়ার সময়ে গবেষণার কাজে হাতেখড়ি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রফেসর সফিকুন্নবী সামদী এবং অধ্যাপক শহীদ ইকবালের হাতে।’ বাংলা ভাষা-সাহিত্য নিয়ে কাজ করতে তুহিন খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অন্যকোনো কাজে এতটা প্রাণ পান না। এটি এখনও আমাদের দেশে পেশা হিসেবে নেওয়ার মতো সুযোগ তৈরি হয়নি। তুহিন মনে করেন, নতুনদের মধ্যে এখন খুব বেশি সমৃদ্ধ কাজ হচ্ছে না। নতুনদের মধ্যে গবেষণার কাজে সময়-শ্রম দেওয়ার তাগিদ তুলনামূলক কম। যারা কাজ করেন তারাও দেখা যায় তথ্যসূত্র মূল অনুসারী হন না। নতুনদের মধ্যে সাইমন জাকারিয়া যে রকম কাজ করছেন এ রকম গবেষণা আমাদের বেশি বেশি প্রয়োজন। তরুণ গবেষকদের জন্য তার পরামর্শ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গবেষণার কাজ যারা করতে চান তাদের জন্য আমার পরামর্শ হচ্ছে প্রচুর পরিশ্রম করে যেন তারা কাজ করেন। গবেষণার কাজ শেষ হলে একটি প্রকাশনা হবে এই চিন্তা থেকে যেন কাজটি শেষ করার জন্য তাড়া দিয়ে কাজটি শেষ না করেন। সাহিত্য নিয়ে কাজ করার সময়ে গবেষণায় ঐতিহাসক বাস্তবতার দিকটি থাকাটা খুব জরুরি।’ তুহিন নিজের শৈশব সম্পর্কে বলেন, ‘আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামে। খুবই বর্ণিল ছিল সেসব সময়। আমার নিজের বর্ণিল শৈশব-কৈশোরের কথা নিজিইে ভেবে গর্ব অনুভব করি। গ্রামের কাদামাটি গায়ে মেখে কাটত প্রতিটি দিন। আমি বিয়ে করেছি ঢাকায়। আমার স্ত্রী আমার সবচেয় বড় বন্ধু। পেশায় চিকিত্সক হলেও শিল্প সাহিত্য সম্পর্কে প্রচুর ধারণা তার। তার সাথে শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে সব সময়েই আলোচনা হয়। আমার এক সন্তান অনন্ত নীলিমা ঐক্য প্রথম শ্রেণীতে পড়ে, দেশ-মুক্তিযুদ্ধ এসব নিয়ে তার অনেক জিজ্ঞাসা। মানুষ সব সময় ভালো কাজ করতে চায়। যেটাকে সে সফল ভাবতে পারে। এই ভালোর কোনো শেষ নেই। সে কারণে আমার কাছে মনে হয়, নিজের কাজে সন্তুষ্ট হওয়াই সাফল্য। তবে সে কাজ যদি হয় বৃহত্ স্বার্থে তবে সেটা ভালো।’ তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন মুক্তবুদ্ধি চর্চার একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র হোক বাংলাদেশ । তিনি মনে করেন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতিকূলতাগুলো দূর করতে হলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গবেষণধর্মী কাজের পরিসর বিস্তৃত করা প্রয়োজন। ড. তুহিন ওয়াদুদ ডাক নাম :তুহিন জন্মতারিখ ও স্থান :কুড়িগ্রাম জেলার রাজারটাট উপজেলার বোতলারপাড় গ্রামে। মায়ের নাম :মাহমুদা কোরাইশি হেনা বাবার নাম :ডা. এম এ কুদ্দুস প্রথম স্কুল :বোতলার পাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রিয় উক্তি :ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার; আর কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম। প্রিয় পোশাক :প্যান্ট, পাঞ্জাবি অবসর কাটে যেভাবে :কাজের ফাঁকে যে সামান্য সময় পাই তা ফেসবুকে বসে কাটাই। সাফল্যের সংজ্ঞা :কাজ যদি হয় বৃহত্ স্বার্থে হয় সেটাই সাফল্য।