প্রজন্ম
এ চেতনা অবিনাশী!
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৫৩
মিসরের রাজধানী কায়রোর তাহরীর স্কোয়ার সারা পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করায় তা এখন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। অনেকে বাংলাদেশের বর্তমান শাহবাগ স্কোয়ারকেও তাহরীর স্কোয়ারের সাথে তুলনা করছেন। কিন্তু আমার তা মনে হয় না। কারণ দুই স্থানের সমাবেশকারীদের উদ্দেশ্য এক ছিল না বা এক নয়। তাহরীর স্কোয়ারের সেদিনের হোসনি মোবারক বিরোধী সমাবেশটি ছিল রাজনৈতিক আর সেক্ষেত্রে ভিতর-বাইরের কারো মদদ থাকাটাও অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের ঢাকার শাহবাগ স্কোয়ারের সমাবেশটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এবং এক্ষেত্রে ভিতরে-বাইরের কারো মদদের লেশমাত্র ছিল না বা নেই। কায়রোর তাহরীর স্কোয়ারটি শহরের পুরাতন এলাকায় অবস্থিত। তার আশপাশে একটি যাদুঘর, আরব লীগ সদর দফতর, এবং শুধুমাত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান ছাড়া অন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নেই। হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, অন্যান্য মন্ত্রণালয়সহ সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নীলনদের অপর পাড়ে নতুন কায়রো সিটিতে অবস্থিত। আমি বছরদুই আগে সেখানে তিনদিন অবস্থান করে দেখতে পেলাম তাহরীর স্কোয়ারের আশপাশে ভিতরের রাস্তায় ট্রাকে ট্রাকে পুলিশের অবস্থান। এইসব স্বশস্ত্র পুলিশ দিনরাত তাহরীর স্কোয়ারকে পাহারা দিচ্ছেন, যেন কোন গোষ্ঠী হীনস্বার্থ হাসিলের জন্য তা ব্যবহার করতে না পারে। এক্ষেত্রে আমাদের শাহবাগ স্কোয়ারের চিত্রটি সম্পূর্ণ আলাদা।
১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের রক্তঋণ যাতে আদায় হয়, তাঁদের পরিবার যেন ন্যায় বিচার পান, সেসময়ে যারা এই দেশের মানুষের বাড়ীঘর, দোকানপাট, ব্যবসাস্থল আগুন দিয়ে পুড়িয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করে তাঁদের লাশ শিয়াল-কুকুর, শকুন দিয়ে খাইয়েছিল, এদেশের মা-বোনদের ইজ্জত লুট করেছিল তাদের যেন সঠিক বিচার হয়, কোন অপশক্তিই যেন আজ এখনও রাস্তায় নেমে পুলিশসহ দেশের মানুষকে হত্যা করে, গাড়ী পুড়িয়ে বিচারকদের ভয় দেখিয়ে বা সরকারকে চাপে ফেলে বিচারকার্যকে বিঘ্নিত না করতে পারে, সেজন্যই ঘরে বসে থাকা স্কুল-কলেজে যাওয়া- আসা দামাল সন্তানেরা শাহবাগ স্কোয়ারে আর একটি মুক্তিযুদ্ধের আয়োজন করেছে। আর তাদের সে যুদ্ধ হচ্ছে সম্পূর্ণ অহিংস। এ যুদ্ধে তাদের কেউ ডেকে আনেননি, তাঁরা স্বপ্রবৃত্ত হয়ে এ যুদ্ধে শামিল হয়েছেন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, নারী-শিশু, বৃদ্ধ, যুবক-যুবতী, হকার, ব্যবসায়ীসহ সকল শ্রেণীর মানুষ সে যুদ্ধে যুক্ত হয়েছে। তারা কখনও গণসঙ্গীত, দেশাত্মবোধক গান, শ্লোগান ইত্যাদির মাধ্যমে জাগরণ সৃষ্টি করছেন।
আবার কখনওবা সারাদেশের মানুষকে নীরবতা পালনের জন্য অনুরোধ করছেন, কখনও সন্ধ্যায় মোমবাতি প্রজ্বলন করে সারাদেশকে আলোকবর্তিকায় উদ্ভাসিত করছেন। আর এসব কাজে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন, এ কাজে তাঁরা কোন রাজনৈতিক গুরুমন্ত্রণা গ্রহণ করেননি, তারা কারো ক্রীনড়ক নন। এ অবস্থায়, এখানে একটি সাবধান বাণী উচ্চারণ করে বলতে চাই কোন রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী যেন ভুলক্রমেও তাঁদের ব্যবহার করার ক্ষীণতম অভিলাষও ব্যক্ত না করেন। কারণ শতমণ দুধকে নষ্ট করার জন্য যেমন এক ফোটা টকই যথেষ্ট, এক্ষেত্রেও কোন স্বার্থান্বেষী মহল শাহবাগের কোমলমতি সন্তানদের ব্যবহার করতে গেলে একই ফল হবে। মনে রাখতে হবে আমরা ’৭১ সনে যারা টগবগে যুবক ছিলাম এবং একটি আদর্শের জন্য যুদ্ধ করেছিলাম বর্তমানে অনেকেই তারা আদর্শচ্যুত হয়েছি, আবার অনেকেই শারীরিক মানসিকভাবে আধমরা হয়ে গেছি। আজ এখন সেই আধমরাদের ঘা মেরে যারা বাঁচাতে এসেছেন আমরা যেন হীন স্বার্থে তা নষ্ট না করি, সেদিকটায় সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে পরিশেষে বলতে চাই, এবার আমার সন্তানদের বলতে এবং করতে দিন। কারণ সময় এখন তাদের এবং তাঁরা যে চেতনায় পথে নেমেছেন, “সে চেতনা অবিনাশী”!
লেখক :মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট