বেড়ানো
সারি নদীর বাঁকে
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:০৮
লেখা ওআলোকচিত্র মুস্তাফিজ মামুন
যে ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, সারি নদী তাদের একটি। সিলেট জেলার জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘা ও কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে গেছে এ নদীর প্রবাহ। মাইনথ্রু নামে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড় থেকে এ নদীর উত্পত্তি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সারি নাম নিয়েছে। নদীটির ছাতকের কাছে সুরমার সঙ্গে মিলন ঘটেছে।
টিলা আর পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে নীল জলের এক নদীর নাম সারি। টলটলে স্বচ্ছ তার জল। একেবারে তলার বালুকণাটিও গভীর জলের তলা থেকে উঁকি মেরে থাকে। কখনও হঠাত্ মাছের চলাচল দেখা যায়। শীতে এ নদীর জল নীল রং ধারণ করে। বর্ষা শুরু হলে পাহাড়ি ঢলে এ নদীর জল ঘোলা হতে শুরু করে। তাই নভেম্বর থেকে মার্চ মাসই সারি নদী ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। এমন স্বচ্ছ স্ফটিক জলের নদী বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই।
সিলেট শহর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে সারি ঘাট। সিলেট শহর ছেড়ে জাফলং সড়কের জৈন্তিয়া উপজেলায় জায়গাটির অবস্থান। শহর থেকে আধা ঘণ্টা থেকে পৌনে এক ঘণ্টার মতো সময় লাগে সারি ঘাটে পৌঁছুতে। সেখান থেকে ইঞ্জিন নৌকা কিংবা স্পিড বোটে চড়ে সারি নদী ভ্রমণ করা যায়। ঘাট থেকে এ নদীর পূর্ব দিকে চললে ঘণ্টাখানেক সময়ে পৌঁছা যায় লালাখাল। এখানে সারি নদী থেকে দীর্ঘ সিঁড়ি উঠে গেছে টিলার ওপরে। এটিই লালাখাল টি এস্টেট। পাশেই ছোট্ট একটি বাজার। লালাখালের চারপাশটা ছবির মতো সুন্দর। ব্যক্তিমালিকানাধীন লালাখাল চা-বাগানে পর্যটকরা সহজেই অনুমতি পান ঘুরে দেখার।
পুরো সারি নদীজুড়েই প্রায় সারা বছর বালু উত্তোলন চললেও শীত মৌসুমে পানি কমে যাওয়ায় বালু শ্রমিকদের ভিড় দেখা যায়। সকাল-সন্ধ্যা অনবরত বালু বোঝাই নৌকার চলাচল দেখা যায় এ নদীজুড়ে। ভারতের মেঘালয়ের পাহাড় থেকে হাজার হাজার মণ বালু আর নুড়ি পাথর ভেসে আসে এ নদীর স্রোতের সঙ্গে। নদী তীরবর্তী মানুষগুলোর জীবন চলে এ বালু আর পাথর তুলেই।
কীভাবে যাবেন
সড়ক, রেল ও আকাশ পথে ঢাকা থেকে সরাসরি সিলেট যাওয়া যায়। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকেও সিলেট আসতে পারেন। ঢাকা থেকে গ্রিন লাইন পরিবহন, সোহাগ পরিবহন, সৌদিয়া পরিবহনের এসি বাস যায় সিলেটে। ভাড়া ৮০০-১০০০ টাকা। এ ছাড়া ঢাকার ফকিরাপুল, কমলাপুর, সায়দাবাদ প্রভৃতি জায়গা থেকে শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, সৌদিয়া, মামুন পরিবহন ইত্যাদি সংস্থার নন-এসি বাসও সিলেটে যায়। ভাড়া ৩৫০-৫০০ টাকা।
ঢাকার কমলাপুর থেকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস, সপ্তাহের প্রতিদিন দুপুর ২টায় ছাড়ে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এবং বুধবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। ভাড়া এসি বার্থ ১০১৮ টাকা, এসি সিট ৬৭৯ টাকা, প্রথম শ্রেণী
বার্থ ৫৯০ টাকা, প্রথম শ্রেণী সিট ৩৯৫ টাকা, স্নিগ্ধা শ্রেণী ৫৬৪ টাকা, শোভন চেয়ার ২৯৫ টাকা, শোভন ২৪৫ টাকা, সুলভ ১৫০ টাকা। এ ছাড়া ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমান (০২-৭১৬৮৮৪২), ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স (০২-৮৯৩২৩৩৮, ০২-৮৯৩১৭১২), রিজেন্ট এয়ার (০২-৮৯৫৩০০৩) এবং নভো এয়ারের (০১৭৫৫৬৫৬৬০১) বিমান নিয়মিত চলাচল করে সিলেটের আকাশে। সিলেট থেকে জৈন্তাপুর কিংবা জাফলংগামী বাসে চড়ে সারিঘাট নামা যায়। সময় লাগে কমবেশি পৌনে এক ঘণ্টা। ভাড়া ৪০-৫০ টাকা। সারি ঘাটে বিভিন্ন রকম নৌকা ও স্পিড বোট পাওয়া যাবে ভ্রমণের জন্য। আকারভেদে প্রতিটি নৌকার ভাড়া ঘণ্টা প্রতি ভাড়া পড়বে ৫০০-২০০০ টাকা। যারা এ ভ্রমণে প্রকৃতির স্বাদ পুরোপুরি নিতে চান তাদের জন্য পরামর্শ হলো ইঞ্জিন নৌকা বাদ দিয়ে বৈঠার নৌকায় বেড়ানো। অনেক বালু শ্রমিকদের ইঞ্জিনবিহীন নৌকা মিলবে সারিঘাটে। দরদাম করে নিয়ে নিন কোনো একটি। সময় বেশি লাগলেও ভ্রমণটি উপভোগ্য হবে।
কোথায় থাকবেন
সারি নদী ভ্রমণে গেলে সিলেট শহরে অবস্থান করাই উত্তম। এ শহরে থাকার জন্য বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল আছে। শাহজালাল উপশহরে আছে পাঁচ তারকা মানের হোটেল রোজ ভিউ (০৮২১-৭২১৮৩৫), নাইওরপুল এলাকায় হোটেল ফরচুন গার্ডেন (০৮২১-৭১৫৫৯০), জেল সড়কে হোটেল ডালাস (০৮২১-৭২০৯৪৫), ভিআইপি সড়কে হোটেল হিলটাউন (০৮২১-৭১৮২৬৩), লিঙ্ক রোডে হোটেল গার্ডেন ইন (০৮২১-৮১৪৫০৭), শহরের বাইরে বিমানবন্দর সড়কে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের পর্যটন মোটেল (০৮২১-৭১২৪২৬)। এ ছাড়া শহরের অন্যান্য সাধারণ মানের অন্যান্য হোটেল হলো আম্বরখানায় হোটেল পলাশ (০৮২১-৭১৮৩০৯)। দরগা গেইটে হোটেল দরগাগেইট (০৮২১-৭১৭০৬৬)। দরগা গেইটে হোটেল উর্মি (০৮২১-৭১৪৫৬৩)। জিন্দাবাজারে হোটেল মুন লাইট (০৮২১-৭১৪৮৫০)। তালতলায় গুলশান সেন্টার (০৮২১-৭১০০১৮)। এসব হোটেলে ৪০০-১০,০০০ টাকায় বিভিন্ন মানের কক্ষ আছে।
সতর্কতা
যারা সাঁতার জানেন না সারি নদী ভ্রমণে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট নিন। এ নদীর অনেক জায়গাতে স্রোত অনেক বেশি। তা ছাড়া নদীর জল স্বচ্ছ বলে এর তলদেশ দেখা যায় বলে অগভীর মনে হতে পারে। মূলত সারি নদীর বেশির ভাগ জায়গাই বেশ গভীর। তাই নদীতে নামলে সাবধানে নামুন।