জামায়াতের হরতালে সংঘর্ষ,তিনজন নিহত
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:২০
জামায়াতের ডাকা গতকাল সোমবারের সকাল-সন্ধ্যা হরতালে সাড়া দেয়নি জনগণ। রাজধানীসহ সারাদেশেই জীবনযাত্রা ছিল প্রায় স্বাভাবিক। তবে হরতাল চলাকালে ঢাকা, কক্সবাজার ও কুমিল্লায় চৌদ্দগ্রামে পিকেটারদের হামলা ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন। নিহতদের একজন সাধারণ শ্রমিক, একজন বিএনপি নেতা ও অপরজন শিবির কর্মী বলে জানা গেছে। ঢাকায় জাতীয় সংসদের উপনেতা ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর পার্ক করা গাড়িতে আগুন দেয় হরতাল সমর্থকরা। এছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবির কর্মীরা বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের ডাকা অন্য যেকোনো হরতালের তুলনায় গতকাল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কড়া সতর্ক ও কঠোর অবস্থানে থাকায় হরতাল সমর্থকরা দেশের কোথাও জড়ো হতে পারেনি। বরং রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে হরতাল বিরোধী মিছিলে রাজপথ ছিল সরগরম। তবে হরতাল চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পুলিশ জামায়াত-শিবিরের অর্ধ শতাধিক নেতা-কর্মীকে আটক করেছে।
হরতাল চলাকালে সকালে রাজধানীর মধ্য বাড্ডার ব্রিজ এলাকায় হরতাল সমর্থকদের হামলায় ‘বন্ধু পরিবহনের’ ছোট আকৃতির বাস উল্টে মোহাম্মদ ইকবাল (৩৫) নামে একজন নিহত হন। রামপুরার বাসিন্দা ইকবাল পেশায় শ্রমিক সরবারহকারী ঠিকাদার বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় পাঁচজন যাত্রী আহত হন। কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের রামু উপজেলার চেইন্দা এলাকায় সকালে একটি মাইক্রোবাসে ভাংচুর চালায় হরতাল সমর্থকরা। এতে ঐ মাইক্রোবাসের আরোহী হাফেজ আবদুর রহমান (৫৬) নামে এক রোগী নিহত হন। তার বাড়ি টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উনচিপ্রাং গ্রামে। নিহত আবদুর রহমান ঐ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি বলে তার পারিবারিকসূত্রে জানা গেছে। এছাড়া কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে হরতালের সময় পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবির কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় ইব্রাহীম (২২) নামে এক ব্যক্তি গুলিতে নিহত হন। নিহতের বাড়ি চৌদ্দগ্রামের আনন্দপুর গ্রামে। তিনি শিবির কর্মী বলে দাবি করেছে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা জামায়াত।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীসূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকালে ‘বন্ধু পরিবহনে’র একটি ছোট বাস যাত্রী নিয়ে গুলিস্তান থেকে গুলশান-২ নম্বরের উদ্দেশে যাচ্ছিল। এটি মধ্য বাড্ডার ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে পিকেটাররা এই যানের সামনের অংশে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় চালক গাড়িটি দ্রুত ঘোরানোর চেষ্টা করলে সেটি উল্টে যায়। এতে ছয়জন যাত্রী গুরুতর আহন হন। পরে আহতদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে মোহাম্মদ ইকবাল নামে ঐ ব্যক্তির মৃত্যু হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার লাশ সনাক্ত করেন কয়েকজন শ্রমিক।
সাজেদা চৌধুরীর গাড়িতে আগুন
বিকাল ৪টার দিকে কাঁটাবন মোড়ে সংসদ সদস্যের স্টিকার লাগানো একটি গাড়িতে আগুন দেয়ার চেষ্টা করে দুষ্কৃতকারীরা। টয়োটা প্রাডো গাড়িটি সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরীর বলে জানা যায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, দুই যুবক মোটরসাইকেলে করে এসে পার্ক করা গাড়িটির পেছনে আগুন ধরিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। তাদের মাথায় ‘যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি চাই’ শ্লোগান সম্বলিত ব্যান্ড ছিল। পরে পুলিশ ও স্থানীয়রা এসে দ্রুত আগুন নিভিয়ে ফেলে।
হরতালে সাড়া দেয়নি রাজধানীবাসী
হরতালে সাড়া দেয়নি রাজধানীবাসী। দেশের অন্য কোথাও হরতালের তেমন প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি। সরকার, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসহ আদালতে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ছিল খোলা। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজধানীবাসী হরতাল প্রত্যাখ্যান করেছে। রাজধানীর অধিকাংশ সড়কে গণপরিবহন চলাচল ছিল স্বাভাবিক। ছেড়েছে দূরপাল্লার গাড়ি। ট্রেন ও লঞ্চ চলাচলও ছিল স্বাভাবিক। খোলা ছিল বেশিরভাগ দোকানপাট। এমনকি হরতালে একুশের বই মেলায়ও দেখা গেছে বইপ্রেমীদের ভিড়। তবে ভীতির কারণে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
দাঁড়াতেই পারেনি জামায়াত-শিবির
সকালে রাজধানীর সদরঘাটের ওয়াইজ ঘাট এলাকায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করলে তাতে ধাওয়া দেয় শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মীরা। এসময় বিক্ষুব্ধ জনতা জামায়াতের মিছিল থেকে দু’জনকে ধরে পিটিয়ে পুলিশে দেয়। এরা হলেন- দীন আমিন (২১) ও মো. মহসীন (২২)। পরে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এছাড়া যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ ও ধলপুর নতুন রাস্তা জামায়াত-শিবির কর্মীরা একটি মিছিল বের করে। এসময় পুলিশ ধাওয়া দিলে তারা পালিয়ে যায়। মহাখালীতে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে হরতাল সমর্থকরা। কিন্তু পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে যায় তারা। হাজারীবাগেও হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় জামায়াত-শিবির কর্মীরা। হরতাল চলকালে বেলা তিনটার দিকে কাকরাইলে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সামনে বিকট শব্দে একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এ সময় ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে সন্দেহভাজন ১ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কড়া পাহারা
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় গতকাল বিপুল পরিমাণ পুলিশ-র্যাব মোতায়েন ছিল রাজধানীতে। হরতাল ডেকে বেশিরভাগ এলাকায় মাঠে ছিলেন না জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। তবে কয়েকটি এলাকায় তারা পিকেটিংয়ের চেষ্টা করলে পুলিশের কঠোর ভূমিকায় তা ভেস্তে যায়। গুলশান থেকে পুলিশ সকালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পাঁচজন কর্মীকে আটক করে।
মাঠে সরব ছিল আওয়ামী লীগ
পিকেটারদের ঠেকাতে রাস্তায় পুলিশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দেখা গেছে। হরতাল আহ্বানকারীদের তেমন দেখা না গেলেও সকাল থেকেই রাজধানীর কাওয়ানবাজার, মগবাজার, মহাখালী, পল্টন, মতিঝিল, সদরঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে হরতালবিরোধী মিছিল করে আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কাওরানবাজারে হরতালবিরোধী মিছিল করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। এর আধা ঘণ্টা পরে মগবাজারে হরতালবিরোধী মিছিল নিয়ে বের হয় ছাত্রলীগ। সকাল ৯টার দিকে মতিঝিল এলাকায় হরতালবিরোধী মিছিল করেছে সোনালী, অগ্রণী, রূপালী ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সিবিএ নেতা-কর্মীরা। বেলা ১১টার দিকে পল্টনে হরতালবিরোধী মিছিল বের করে শ্রমিক ইউনিয়ন। প্রায় একই সময়ে মহাখালী-গুলশান সড়কে হরতালবিরোধী মিছিল করতে দেখা যায়। এ মিছিল থেকে হরতাল প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ও জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়।
সক্রিয় ছিলেন দোকান মালিক সমিতির নেতারা
পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি গতকাল হরতালে রাজধানীর দোকানপাট খোলা রাখে। সকালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সংগঠনের ভাইস চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান মঞ্জুর নেতৃত্বে দোকান খোলা হয়। দোকান মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ নিজেদের তত্ত্বাবধানে দোকান খোলা রাখার ব্যবস্থা করেন।
বিচারকাজ চলেছে সুপ্রিম কোর্টে
জামায়াতে ইসলামীর ডাকা হরতালের মধ্যেও গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে বিচারকাজ চলেছে। তবে হাইকোর্টের ৪/৫টি বেঞ্চ ছাড়া অন্য বেঞ্চের বিচারকরা বিচার এজলাশে বসেননি। যে কয়েকটি বেঞ্চের বিচারকরা বিচার এজলাশে বসেছিলেন সেখানে আইনজীবীদের উপস্থিতি ছিলো লক্ষণীয়। তবে আইনজীবীদের উপস্থিতি কম হওয়ায় আপিল বিভাগ বেশিক্ষণ চলতে পারেনি। জানা গেছে, আপিল বিভাগে কয়েকটি মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের সভাপতিত্বে ছয়জন বিচারপতি এ মামলাগুলোর শুনানি করেন।
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, হরতাল চলাকালে কক্সবাজারের বিভিন্নস্থানে বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করেছে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এরমধ্যে শহরতলীর এমিউজমেন্ট ক্লাব এলাকায় একটি রোগীবাহী মাইক্রোবাস ভাংচুরের কারণে চালক পালিয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে নেয়ার আগেই মারা যান রোগী হাফেজ আবদুর রহমান (৫৫)। সোমবার ভোরে টেকনাফের হ্নীলার নিজবাড়িতে হূদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে হরতালের মধ্যেই মাইক্রোবাসযোগে কক্সবাজারে আনা হচ্ছিল। সকাল ৮টার দিকে ভাংচুরের শিকার হলে মাইক্রোবাসটি রোগী নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছার আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রোগী। এছাড়া কক্সবাজার শহরতলীর বাংলাবাজার এলাকায় কয়েকটি সিএনজি ট্যাক্সি ভাংচুর করা হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার রোগী মারা যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
কুমিল্লা প্রতিনিধি ও চৌদ্দগ্রাম সংবাদদাতা জানান, হরতালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষ চলাকালে গুলিতে ইব্রাহীম নামে ১ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। এসময় গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫ জন। এছাড়া হরতাল চলাকালে চৌদ্দগ্রামে ১০ জন ও কুমিল্লা মহানগরী থেকে ৩ পিকেটারসহ ১৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এদিকে জামায়াত কর্মী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে জেলা জামায়াত আজ মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত কুমিল্লায় আধাবেলা হরতাল আহবান করেছে।
সকাল ১০টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কালিকসার নামক স্থানে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা পিকেটিং করার সময় পুলিশ বাধা দেয়। এসময় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ গুলি বর্ষণ করে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইব্রাহীম (২৪), নাইমুল ইসলাম মুরাদ (২৩), এনায়েত (২২), জীবন (২৫), আলাউদ্দিন (২৭), সোহেল (৩০)সহ ৭ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে চৌদ্দগ্রাম হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইব্রাহীম মারা যান। সে উপজেলার বাতিসা ইউনিয়নের আনন্দপুর গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে। পুলিশ চৌদ্দগ্রামে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব ঠেকাতে বিভিন্ন স্থানে ৯ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করেছে বলে জানিয়েছেন ওসি মোজাম্মেল হোসেন।
সিলেট অফিস জানায়, বিকালে ‘জাগরণ মঞ্চে’র নেতা-কর্মীরা হরতাল বিরোধী লাঠি মিছিল বের করে। মিছিল চলাকালে তারা হরতাল বিরোধী ও সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবি জানিয়ে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, হরতাল চলাকালে গাজীপুরে একটি বিআরটিসি বাস ও বলাকা পরিবহনের অপর একটি বাসে আগুন দিয়েছে হরতাল সমর্থকরা। অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশ লিফলেটসহ একজনকে আটক করেছে। এছাড়া বাস পুড়ানোর ঘটনায় দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে জয়দেবপুর থানার এসআই হাসানুজ্জামানকে পুলিশ লাইনে ক্লোজড করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোঃ আঃ বাতেন।
হরতাল চলাকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে গাজীপুর অংশে দূরপাল্ল¬ার বাস চলাচল না করলেও স্থানীয় রুটের বাস, টেম্পু ও লেগুনা চলাচল করতে দেখা গেছে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, হরতাল চলাকালে শহরের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত শিবির কর্মীদের সাথে পুলিশের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সকালে ডিসি রোড এলাকা থেকে মহসিন কলেজ শিবির সভাপতি নাসির উদ্দিনকে এবং চাদগাঁও এলাকা থেকে ৪ শিবির কর্মীকে আটক করে পুলিশ। শিবির কর্মীরা সকালে বন্দর থানার ইপিজেড এলাকায় একটি বাসে আগুন এবং ৩টি গাড়ি ভাংচুর করে। হরতাল চলাকালে শহরের বেশিরভাগ দোকান-পাট বন্ধ ছিল। বিভিন্ন পরিবহন সংস্থার মালিকরা সব ধরনের গাড়ি চালানোর ঘোষণা দিলেও রাস্তায় রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশা ছাড়া আর কোনো গাড়ি চলাচল করেনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা থাকলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকায় ক্লাস হয়নি।
এদিকে হরতাল প্রতিরোধের জন্য গতকাল চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মসূচি বিকাল ৩টার পরিবর্তে সকাল ১০টায় শুরু হয়। গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা কালো পতাকা উড়িয়ে ও কালো ব্যাজ ধারণ করে জামালখান এলাকায় মিছিল করেন। মিছিলে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষও অংশ নেন।
এদিকে হরতাল চলাকালে পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে চট্টগ্রামের দু’টি কলেজে অভিযান চালিয়ে ১১ শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বিকাল ৫টার দিকে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ছাত্রাবাস থেকে ৭জন ও একই এলাকায় অবস্থিত মহসিন কলেজ থেকে ৪ জন শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়।
চবি প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) প্রশাসনিক ভবন ও ক্লাসসমূহ খোলা থাকলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম। কোন পরীক্ষা ও ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়নি। ক্যাম্পাসে এক শিক্ষার্থী জানান, হরতালে নৈরাজ্য সৃষ্টির ভয়ে তার অন্য বন্ধুরা ক্যাম্পাসে আসেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আনোয়ার হোসেন জানান, হরতালের কারণে কোন পরীক্ষা ও ক্লাস হয়নি। তবে প্রথমবারের মতো এবার হরতালে একাডেমিক মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বরিশাল অফিস জানায়, সকালে নগরীর নবগ্রাম রোড শামসু মিয়ার গ্যারেজ এলাকায় সড়কে গাছ ফেলে এবং টায়ারে অগ্নিসংযোগ করে অবরোধ সৃষ্টি করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। কাশিপুর এলাকায় অগ্নিসংযোগ করার সময় ধাওয়া করে এক শিবির কর্মীকে আটকের পর পুলিশে সোপর্দ করে স্থানীয় ছাত্রলীগ। এছাড়া লাকুটিয়া সড়ক, বান্দরোড, রূপাতলী সোনারগাঁ টেক্সটাইল ও নাজিরেরপুল এলাকায় পিকেটিং করেছে জামায়াত। তারা দু’টি টেম্পু ভাঙচুর করে। এসময় দু’ কর্মীকে পুলিশ আটক করেছে বলে জানিয়েছেন মহানগর শিবির সভাপতি নাহিয়ান।
মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শামসুদ্দিন জানান, নগরীর কোথাও পিকেটিংয়ের ঘটনা ঘটেনি। হরতালকারীরা পিকেটিংয়ের চেষ্টা করলে পুলিশ ২ শিবির কর্মীকে আটক করে। এদের মধ্যে আল-আমিন নামের একজনকে বিমান বন্দর থানা-পুলিশ এবং আ. কাইয়ুম নামে একজনকে কাউনিয়া থানা-পুলিশ আটক করে।
বেলা ১১টার দিকে হরতালের প্রতিবাদে এবং যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে নগরীতে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরনের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়।
রাজশাহী অফিস জানায়, হরতালের সময় কাঁটাখালী পৌর মেয়র ও জামায়াত নেতা অধ্যাপক মাজিদুর রহমানের বাড়িতে র্যাব ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়েছে। মহানগর পুলিশ কমিশনার এসএম মনির-উজ-জামান জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ বিপুল পরিমাণ ককটেল, মার্বেল, গুলতি, পেট্রোল, জামায়াতের সাংগঠনিক ও জেহাদী বইসহ মেয়রের স্ত্রী মোস্তারি বেগমকে আটক করে। তাকে থানা হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া হরতালে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আরো ৪৭জনকে আটক করা হয়েছে। এদিকে হরতালে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা পুলিশের উপর ইট-পাটকেল ও হাতবোমা নিক্ষেপসহ বিক্ষিপ্তভাবে নগরী জুড়ে নাশকতার চেষ্টা চালায়। তারা খড়খড়ি বাইপাস সড়কে একটি ট্রাকে আগুন এবং আরেকটি ট্রাক ভাঙচুর করে। এর আগে সকাল ৭টায় বিনোদপুরে গাছের গুড়ি ফেলে ও টায়ারে আগুন দিয়ে মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে ক্যাডাররা পুলিশের উপর ইট-পাটকেল ও হাতবোমা নিক্ষেপ করে। পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারসেল ছুঁড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। জামায়াত-শিবিরের ব্যাপক তত্পরতা সত্ত্বেও নগরীতে ঢিলেঢালা হরতাল হয়েছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যানবাহন চলাচল বাড়ে। হরতালে দূরপাল্লার বাসকোচ চলেনি, তবে দুপুর ১২টার পর আন্ত.জেলা রুটে সীমিত বাস চলেছে। নগরীর বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, ব্যাংক-বীমা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা ছিল। নগরীতে রিকসা, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকসহ হালকা যানবাহন চলাচলও স্বাভাবিক ছিল। পশ্চিমাঞ্চল জোনে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। নগরীর আলুপট্টির একাত্তর মঞ্চে জনসমাগম ছিলপ্রচুর।
মতিহার থানার ওসি এসএম আব্দুস সোবহান এবং গোয়েন্দা শাখার ওসি আলমগীর হোসেন বলেন, জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা বিভিন্ন এলাকায় ভোর থেকে বিক্ষিপ্তভাবে নাশকতার অপচেষ্টা চালায়। কিন্তু পুলিশের তত্পরতায় তারা রাস্তায় দাঁড়াতেই পারেনি।
অন্যদিকে দুপুরে নগরীর সাহেববাজার এলাকায় মহানগর ১৪ দল হরতাল বিরোধী বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে।
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, হরতাল প্রত্যাখ্যান করে মাঠে নেমেছিল ছাত্র-যুব-জনতা। শহরের সাতমাথা চত্বরের তরুণ প্রজন্মের মঞ্চে এসে সমবেত হয়ে তারা হরতাল বিরোধী মিছিল করেছে। পরে মঞ্চে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিদের মধ্যে শ্যামল বর্মণ, আসলাম হোসেন, ইসমাইল হোসেন দুখু প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এদিকে তরুণ প্রজন্মের ঘোষণার ফলে গতকাল মাঠে জামায়াত-শিবিরকে দেখা যায়নি। শহরতলীর দুই-একটি এলাকায় চোরাগোপ্তা পিকেটিং করার চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি । সব বয়সী মানুষের পদচারণায় দিনভর বগুড়া শহর ছিল মুখর। সকাল থেকেই শহরের রাস্তাগুলোতে ছোট যানবাহন চলাচল শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা ছিলো, পরীক্ষা যথারীতি চলেছে। মহাসড়কে দূরপাল্লার অনেক পরিবহনই চলাচল করতে দেখা গেছে।
শেরপুর প্রতিনিধি জানান, জেলায় হরতাল পালিত হয়নি। শহরের দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক অফিস-আদালত খোলা ছিল। স্কুল-কলেজসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের স্বাভাবিক উপস্থিতি ছিল। দূরপাল্লাসহ সকল যানবাহন যথারীতি চলাচল করেছে। পুলিশ রবিবার রাতে নালিতাবাড়ি থেকে হামিদুল নামে এক শিবির কর্মী এবং শেরপুর থেকে শুকুর নামে এক জামায়াত কর্মীকে আটক করেছে।
জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, হরতাল চলাকালে জয়পুরহাটের হিচমী পল্লী বিদ্যুত্ এলাকায় শিবির কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ ও শিবির নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। তাদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশ শটগানের ৫ রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে আক্কেলপুর উপজেলা জামায়াতের আমীর এসএম রাশেদুল ইসলাম সবুজ ও জয়পুরহাট শহর জামায়াতের আমীর আব্দুল কাইয়ুমকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া হরতাল চলাকালে পাঁচবিবিতে টহলরত পুলিশের উপর জামায়াত-শিবির কর্মীরা চোরাগোপ্তা হামলা চালায়। এ সময় আব্দুর রাজ্জাক নামে এক পুলিশ কনস্টেবল আহত হন। পুরানাপৈল এলাকায় শিবির কর্মীরা ডিবি পুলিশের ১টিসহ ২টি মোটরসাইকেল ভাংচুর করে।
রংপুর প্রতিনিধি জানান, জামায়াতে ইসলামীর ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল প্রত্যাখ্যান করেছে রংপুরের মানুষ। শনিবার রাতে সভা করে হরতাল প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছিল রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, জেলা দোকান মালিক সমিতি, জেলা ১৪ দল এবং জাগরণী মঞ্চের আন্দোলনকারীরা। সকাল থেকেই দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসেন ব্যবসায়ীরা। জাগরণী মঞ্চের আন্দোলনকারীরা নগরীতে দফায় দফায় হরতাল বিরোধী মিছিল করেছেন।
তবে কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবির ক্যাডারদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে ৩ পুলিশ কনস্টেবলসহ ২০ জন আহত হয়েছেন। রংপুর মহানগরীর হাজিরহাটে জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা পুলিশের ব্যবহূত ১টি পিকআপ ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। বিক্ষুব্ধ জনতা নগরীর ধাপ এলাকায় জামায়াত পরিচালিত ইসলামী ব্যাংক কমিউনিটি হাসপাতাল ও শিবির পরিচালিত রেটিনা কোচিং সেন্টারে হামলা চালিয়ে দরজা-জানালা, আসবাবপত্র ভাংচুর এবং কাগজপত্রে অগ্নিসংযোগ করে। উত্তর হাজিরহাটে পুলিশের উপর হামলার অভিযোগে ইসলামী ব্যাংক কমিউনিটি হাসপাতালের ম্যানেজার শামছুল হুদাসহ জামায়াত-শিবিরের ৬ ক্যাডারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
মাগুরা প্রতিনিধি জানান, হরতাল পালিত হয়নি। শহরের দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, স্কুল- কলেজ খোলা ছিল এবং কাজকর্ম স্বাভাবিক হয়েছে। শহরের যানবাহন চলাচলও স্বাভাবিক ছিল।
নাটোর প্রতিনিধি জানায়, সকালে জেলা যুবলীগ নেতা-কর্মীরা বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে হরতাল বিরোধী মিছিল ও সমাবেশ করে। পরে তারা শহরের ছায়াবাণী মোড়ে সড়ক অবরোধ করে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার বেশ কিছু কপি আগুনে পুড়িয়ে দেয়।
সকালে হয়বতপুর ও হাগুরিয়া এলাকায় টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে পিকেটিং করে হরতাল সমর্থকরা। এ সময় তারা বনপাড়ায় একটি মাইক্রোবাস ও তিনটি অটোরিক্সা ভাংচুর করে।
পাবনা প্রতিনিধি জানায়, দুপুরে হরতাল বিরোধী বিক্ষোভ মিছিল বের করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। মিছিলটি শহর প্রদক্ষিণ করার সময় ঢিল ছুঁড়ে এ আর কর্নারের তৃতীয় তলায় অবস্থিত ইসলামী ব্যাংকের জানালার কাঁচ ভাংচুর করে মিছিলকারীরা।
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, জেলায় চন্দ্রগঞ্জে দুটি মোটর সাইকেলে অগ্নিসংযোগ, মিয়ার রাস্তার মাথা ও বাস টার্মিনালে সড়ক অবরোধ, ককটেল বিস্ফোরণ ও টায়ারে অগ্নিসংযোগের মধ্য দিয়ে হরতাল পালিত হয়েছে।
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, টুঙ্গিপাড়ায় বিক্ষুব্ধ জনতার ধাওয়া খেয়ে ইবনে সিনা কোম্পানির গাড়ি রেখে ড্রাইভার পালিয়ে গেছে। পুলিশ গাড়িটি উদ্ধার করে টুঙ্গিপাড়া থানায় নিয়ে গেছে। এ সময় কোম্পানির সেলসম্যান ও সাতক্ষীরা জেলার মধুমাল্লা গ্রামের আব্দুস সবুরের ছেলে মারুফ হোসেনকে (২৬) উদ্ধার করে থানার নিরাপত্তা হেফাজতে নেয়া হয়।
শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, হরতাল চলাকালে সকালে জামায়াত-শিবির কর্মীদের অতর্কিত হামলায় ৪ পুলিশ আহত হয়। এ সময় গণজাগরণ মঞ্চ ও আওয়ামী লীগ অফিস ভাংচুর করা হয়। এ ঘটনায় ১০ জন জামায়াত-শিবির নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে উপজেলা ছাত্রলীগ। এ সময় বিক্ষুব্ধ ছাত্রলীগ কর্মীরা শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন উপজেলা জামায়াতের কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে।
সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, সকালে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা হরতাল বিরোধী মিছিল করেছে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাবেক এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান। হরতালের সময় জামায়াত-শিবিরের কোন নেতা-কর্মীকে রাস্তায় পিকেটিং করেতে দেখা যায়নি। সড়ক ও মহাসড়কে স্বাভাবিকভাবেই যানবাহন চলাচল করেছে।
রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের অফিসে হামলা
রাজশাহী অফিস জানায়, গতকাল রাত ৮টার দিকে নগরীর বিনোদপুরে আওয়ামী লীগের স্থানীয় কার্যালয়ে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা তাণ্ডব চালিয়েছে। তারা অফিসের আসবাবপত্র ছাড়াও অফিসে রাখা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাজশাহীর মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের ছবি মাটিতে ফেলে দিয়ে পদদলিত করে। জামায়াত-শিবিরের ওই হামলায় কেউ হতাহত হয়েছে কিনা জানা যায়নি।
খুলনা অফিস জানায়, জামায়াতের ডাকা গতকাল সোমবারের সকাল-সন্ধ্যা হরতালে খুলনায় তেমন কোন প্রভাব পড়েনি। সকাল থেকেই নগরীর রাজপথ ছিলো আওয়ামী লীগের দখলে। প্রতিটি মোড়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। জামায়াত-শিবিরের কোন নেতাকর্মীকে রাজপথে দেখা যায়নি। হরতালের সমর্থনে তারা নগরীতে কোন মিছিল বের করতে পারেনি। তবে জামায়াত-শিবিরের পিকেটাররা নগরীর বয়রা এলাকায় একটি ট্রাক ও একটি ইজিবাইক এবং ফজরের নামাজের পর ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর এলাকার মালতিয়া নামক স্থানে খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কে দুটি যাত্রীবাহী বাস, একটি ট্রাক ও একটি পিকআপ ভাংচুর করে। এসময় জামায়ত-শিবিরের ১০/১৫জন নেতাকর্মী রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে খুলনা-সাতক্ষীরা সড়ক অবরোধ করে রাখে। খবর পেয়ে স্থানীয় ফাঁড়ি ও ডুমুরিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এ সময় পুলিশ ১৪ রাউন্ড শটগানের ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে।
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, জেলায় ঢিলেঢালা হরতাল পালিত হয়। হরতালে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। শহরে সকালে কিছু দোকানপাট বন্ধ থাকলেও দুপুরের পর থেকে অনেকেই দোকান খুলেছে। দূরপাল্লার বাস চলাচল করেনি। তবে অটো রিকশা ও ট্রেন চলাচল ছিল স্বাভাবিক। হরতাল চলাকালে জামায়াত শিবিরের কোন তত্পরতা ছিল না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার শিবগঞ্জে গণজাগরণ মঞ্চ ভাংচুর ও আওয়ামী লীগ অফিসে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে হরতালকারীরা। এর প্রতিবাদে জামায়াতের শিবগঞ্জ উপজেলা অফিস ও জামায়াত সমর্থিত আল-মদীনা নামে একটি ক্লিনিক ভাংচুর করে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ কর্মী-সমর্থকরা।
মংলা সংবাদদাতা জানান, হরতালের কোন প্রভাব পড়েনি মংলা বন্দরে। সকাল থেকে বন্দরে অবস্থানরত সবকটি বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য বোঝাই-খালাস চলেছে স্বাভাবিকভাবে। মংলা-খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়কে বাস চলাচল করছে, ছেড়ে গেছে দূরপাল্লার সব বাস। বন্দরের শিল্প এলাকার সকল মিল কারখানার কার্যক্রম চলেছে যথানিয়মে। হরতালের পক্ষে কোন মিছিল মিটিং বা পিকেটিং দেখা যায়নি। তবে হরতাল প্রতিরোধে আওয়ামী লীগ-মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ প্রজন্মের উদ্যোগে শহরে কয়েক দফায় মিছিল হয়েছে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, হরতালের কারণে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন গাড়ী ক্যাম্পাসে আসেনি। ফলে ক্যাম্পাস ছিলো শিক্ষক-শিক্ষার্থী শূন্য। কোন বিভাগেরই কোন ক্লাস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে অফিস করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জ ও উল্লাপাড়ায় হরতাল চলাকালে পিকেটিং করার সময় পুলিশ ৮ জামায়াত-শিবিরকর্মীকে আটক করেছে।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলায় হরতালের কোন প্রভাব পড়েনি। সকাল থেকেই জেলা শহরসহ উপজেলা শহরগুলোতে দোকানপাট খোলা ছিল। যান চলাচলও ছিল স্বাভাবিক। হরতালের সমর্থনে কোথাও দাঁড়াতে পারেনি জামায়াত-শিবির।
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, জেলায় ঢিলেঢালা হরতাল পালিত হয়েছে। শহরের দোকানপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস আদালত খোলা ছিল। জেলার অভ্যন্তরীণ রুটে রিকশা ও মোটর সাইকেল চললেও ভারি কোন যানবাহন চলাচল করেনি। সকালে ও দুপুরে জেলা শহরে হরতাল বিরোধী মিছিল করেছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। রবিবার রাতে বিভিন্ন থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে জামায়াত-ছাত্রশিবিরের ১৬ নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, জামায়াত-শিবিরের ২০-২৫ জন নেতাকর্মী নীলফামারী-সৈয়দপুর সড়কের টেক্সটাইল মিল বাজারে মিছিল বের করে দোকানপাট বন্ধের চেষ্টা করলে ব্যবসায়ীরা স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এসময় লাল মুন্সি, শফিকুল ইসলাম, হামিদুল¬াহ, জয়নাল ও মকছেদুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন জামায়াত-শিবির কর্মীকে বেধড়ক পেটায় স্থানীয় লোকজন। অবস্থা বেগতিক দেখে অন্যরা দিকবিদিক দৌড়ে পালায়।
এদিকে হরতালের কোন প্রভাব পড়েনি নীলফামারীতে। স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, দোকান-পাট সবকিছুই ছিল খোলা। চলাচল করেছে সব ধরনের যানবাহন।
বরগুনা (উত্তর) প্রতিনিধি জানান, জেলায় হরতালের বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিল করেছে নতুন প্রজন্ম। মিছিলটি বন্দর ক্লাব চত্বর থেকে শুরু হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণকালে নজরুল ইসলাম সড়কের ইসলামী ব্যাংকে হামলা চলায়। তারা ব্যাংকের এটিএম বুথে মেশিন ভাংচুর করে।
ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানান, সকালে শিবির শহরের পুরাতন ডিসি অফিস থেকে ঝটিকা লাঠি মিছিল বের করে ওয়াজির হাইস্কুল পর্যন্ত যায়। এরপর হরতালের পক্ষে আর কোন পিকেটিং ছিল না। দোকানপাট খোলা ছিল। শুধু দূরপাল্লার বাসট্রাক চলেনি। আওয়ামী লীগ শহরে হরতাল বিরোধী মিছিল বের করে। সকালে দৈনিক নয়া দিগন্তের প্যাকেটগুলো পুড়িয়ে দেয় হরতাল বিরোধীরা।
এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সীগঞ্জ, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, কোটালীপাড়া, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ঈশ্বরদী, নেত্রকোনা, বোদা, আমতলীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় হরতাল পালিত হয়নি বলে খবর দিয়েছেন ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা।