আমার প্রযুক্তি, আমার বাংলা ভাষা
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:২৩
সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েই চলেছে আমাদের দেশে। কম্পিউটার বা ল্যাপটপের ব্যবহার এখন আর নির্দিষ্ট ধরনের কোনো মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সব ধরনের শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে এখন ছড়িয়ে পড়েছে এসব কম্পিউটিং ডিভাইস। সময়ে সাথে সাথে এসব ডিভাইসে বাংলা ভাষার ব্যবহারও বেড়েই চলেছে। বাংলার ব্যবহার বাড়ছে ইন্টারনেটেও। সবমিলিয়ে এখন প্রযুক্তি বিশ্বে এখন ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষার সাথে সমানতালে পাল্লা দিয়ে যাচ্ছে বাংলা ভাষা। আর সামনের দিনে যে এর ব্যবহার আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য। সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগেও রয়েছে তার প্রমাণ। অনেকদিন পরে হলেও শেষ পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগে তৈরি হতে যাচ্ছে বাংলা ইউনিকোড ফন্ট। আবার পিসিতে বাংলা লেখার জনপ্রিয় সফটওয়্যার ‘বিজয়’-এরও অ্যান্ড্রয়েড সংস্করণ বাজারে আসতে যাচ্ছে। আগামীকাল একুশে ফেব্রুয়ারিতেই এগুলো বাজার আসার কথা রয়েছে। এই দুই উদ্যোগ এবং কম্পিউটারে বাংলার ব্যবহার নিয়ে কিছু তথ্য জানানো হলো এই লেখায়।
কম্পিউটারের পর্দায় বাংলা
ঠিক প্রথম কবে, কে কম্পিউটারে বাংলা ভাষা ব্যবহারে সক্ষম হন, তার সঠিক তথ্যটি পাওয়া যায় না। তবে ১৯৭৭ সালে সুইডেনের এক বাঙালি প্রথম একটি বাংলা নিউজ লেটার প্রকাশ করে বলে জানা যায়। ওই সময়েই বুয়েটে কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহার নিয়ে একটি প্রকল্প চালু হয়। প্রায় ৬ বছরের চেষ্টায় তারা গ্রাফিক্স মোডে লেখার সফটওয়্যারের বদলে বাংলা বর্ণমালা সমর্থিত একটি হার্ডওয়্যার ডিভাইস তৈরি করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে সাইফুদ্দোজা শহিদ ১৯৮৩ সালে ম্যাক সিস্টেমের জন্য ফন্ট এবং কিবোর্ড ডিজাইনের কাজ শুরু করেন। ১৯৮৪ সালে অ্যাপল’র রিসোর্স এডিটরের সহায়তায় বিটম্যাপ নির্ভর ফন্টে তিনি তৈরি করেন ‘শহীদলিপি’, যাকে কম্পিউটারের প্রথম বাংলা ফন্ট বলা যায়। এর ধারাবাহিকতায় ম্যাকিন্টোশের জন্য প্রথম বাংলা লেজার ফন্টটি তৈরি করে কলকাতার রাহুল কমার্স কোম্পানি। তাদের ফন্টের নাম ছিল ‘বঙ্কিম’। কলকাতায় তৈরি হলেও এ ফন্টটি তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশেরই গৌতম সেন। প্রথম এই লেজার ফন্টটিও ছাপার উপযোগী ছিল না। মানের দিক থেকে প্রথম মানসম্মত বাংলা ফন্ট বলা যায় মইনুল লিপিকে যা উন্মুক্ত হয় ১৯৮৬-৮৭ সালে। এটি দিয়ে আনন্দপত্র নামের একটি প্রকাশনাও বের হয়। এর পরেই আসে জব্বারলিপি (১৯৮৭)। এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, এই সময় পর্যন্ত কম্পিউটারে বাংলা লেখার জন্য কোনো ইনপুট সফটওয়্যার ছিল না। ফলে কম্পিউটারে বাংলা টাইপ করার সুবিধা থাকলেও টাইপিং ছিল অত্যন্ত ধীরগতির। এই সমস্যার সমাধান প্রথমবারের মতো নিয়ে আসেন প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার। ‘বিজয়’ নামে তিনি নিয়ে আসেন প্রথম বাংলা ইনপুট সফটওয়্যার। ১৯৮৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করে এই বিজয়। ম্যাক অ্যাসেম্বলি ল্যাংগুয়েজ ব্যবহার করে তৈরি করা বিজয় প্রথমবারের মতো কম্পিউটারে যুক্তাক্ষর ব্যবহার করার সুবিধা প্রদান করে।
আইবিএম এবং উইন্ডোজ-এ বাংলা
ম্যাক দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে আইবিএম-এর ব্যবহার শুরু হয়ে গেলে আইবিএম পিসির জন্যও তৈরি হয় বাংলা সফটওয়্যার। ১৯৯২ সালে প্রথম তৈরি হয় ‘বর্ণ’ নামের একটি ওয়ার্ড প্রসেসিং সফটওয়্যার। ১৯৯৩ সালে ‘বিজয়’ও আসে আইবিএম-এর জন্য। নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে উইন্ডোজ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকলে উইন্ডোজের জন্যও বাংলা সফটওয়্যার তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এদিক থেকে প্রথম বাজারে আসে ‘অনির্বাণ ৩.০’। পরবর্তীতে প্রশিকা এবং লেখনীও বাজারে নিয়ে আসে উইন্ডোজের জন্য টাইপিং সফটওয়্যার এবং বাংলা ফন্ট। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে আরও অনেক ফন্টই তৈরি হয় বাংলায় লেখার জন্য।
ইউনিকোড ও বাংলা
কম্পিউটারে বাংলার ব্যবহারের অনেকদিন পেরিয়ে গেলেও ইউনিকোডভিত্তিক বাংলা ফন্ট বা ইনপুট সফটওয়্যারের দেখা মেলেনি দীর্ঘদিন। কম্পিউটারে লেখালেখির একটি মূল সমস্যা হলো একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে যা লেখা হয়, তা অন্য কোনো সফটওয়্যার ঠিকমতো পড়তে পারে না। ফলে কোনো একটি কম্পিউটারে কোনো একটি সফটওয়্যারে কিছু লিখলে তা অন্য কম্পিউটারে নিয়ে গেলে পড়া যাবে না, যদি ওই সফটওয়্যারটি ওই পিসিতে ইন্সটল করা না থাকে। এই ঝামেলা থেকে মুক্তি দিতেই আসে ইউনিকোডের প্রসঙ্গ। ইউনিকোড এমন একটি পদ্ধতি, যার ব্যবহার যেকোনো কম্পিউটারের কাছে তাকে পরিচিত করে তুলতে পারে। ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম নামের একটি অলাভজনক সংস্থা পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার জন্য ইউনিকোড অনুমোদন করে থাকে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি ভাষার প্রতিটি অক্ষরের জন্য তারা বরাদ্দ করে থাকে একটি নির্দিষ্ট কোড। যে কম্পিউটার ইউনিকোড সমর্থন করে, সেই কম্পিউটারে ইউনিকোডে যেকোনো ভাষায় লেখা যেকোনো কিছুই পড়া যায়। ইউনিকোডের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, বর্তমানের প্রায় সব ধরনের অপারেটিং সিস্টেমই ইউনিকোড সমর্থন করে থাকে। শুধু তাই নয়, অপারেটিং সিস্টেমের বাইরে ওয়েব ব্রাউজারগুলোও এখন ইউনিকোড সমর্থন করে থাকে। ফলে ইউনিকোডে আপনি যদি বাংলা লেখার সুযোগ পান, তাহলে এটি বেশিরভাগ অপারেটিং সিস্টেম এবং ওয়েব ব্রাউজারেই পড়া যাবে।
ইউনিকোডের এই প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই ২০০০ সালের পর থেকেই বাংলা ইউনিকোড সফটওয়্যার এবং ফন্ট তৈরি নিয়ে কাজ করতে থাকেন আগ্রহীরা। সরকারিভাবে অবশ্য এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সফলভাবে প্রথম ইউনিকোড বাংলা সফটওয়্যারটি তৈরি করতে সমর্থ হয় ওমিক্রন ল্যাব। তাদের তৈরি সফটওয়্যারটির নাম ছিল ‘অভ্র’। প্রায় সব ধরনের ওয়েব ব্রাউজারে এটি ব্যবহারের সুবিধা থাকায় এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে শুরু করে। শুরুর দিকে ইউনিকোডের জন্য যে বাংলা ফন্টগুলো ছিল, তাতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যাও ছিল। বিশেষ করে যুক্তাক্ষর ভেঙ্গে যাওয়া, ‘ত্’ বা রেফ বা ‘র ফলা’ যুক্ত করা নিয়ে সমস্যা ছিল অনেক ফন্টেই। তবে ধীরে ধীরে এসব সমস্যাও কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হয় স্বেচ্ছাসেবীরা। আর তার ফলশ্রুতিতেই এখন অনায়াসেই ইন্টারনেটের অলিগলিতে বাংলা ছড়িয়ে দিচ্ছেন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা।
সরকারি উদ্যোগে বাংলা ফন্ট
ইন্টারনেটে আর কম্পিউটারে যখন বাংলা অনেকটা জায়গা দখল করে নিতে সমর্থ হয়েছে, তখন দেরিতে হলেও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়ে একটি ইউনিকোড ফন্ট তৈরির। এর আগে নির্বাচন কমিশন একটি ফন্ট তৈরি করলেও তাতে কিছু কিছু বিষয়ে কিছু সমস্যা ছিল। এসব সমস্যা দূর করে পূর্ণাঙ্গ একটি ফন্ট তৈরি করতেই গত বছরের শেষের দিকে সরকার এই উদ্যোগ গ্রহণ করে। মূলত বাংলা একাডেমীর নেতৃত্বে এই ফন্ট তৈরির কাজ শুরু হয়। এর পেছনে আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই)। আর এতে কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক্স ডিজাইন বিভাগ। ফন্ট তৈরি থেকে যাবতীয় কার্যক্রমের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক ড. শামসুজ্জামান খান এবং ফন্ট বিশেষজ্ঞ জামিল চৌধুরী। তবে এই উদ্যোগে তৈরি ফন্টটি যাতে সুন্দর ও নান্দনিক হয়ে ওঠে, সে বিষয়টির দেখভাল করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক্স ডিজাইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাইমা হক এবং ওই বিভাগের আরেকজন শিক্ষক মাকসুদুর রহমান।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে জানা গেছে, সরকারি উদ্যোগে তৈরি বাংলা ইউনিকোড এই ফন্টের নাম দেওয়া হয়েছে ‘আমার বর্ণমালা’। এতে থাকবে তিন ধরনের ফন্ট। এর প্রথম দুইটি তৈরি করা হবে বিভিন্ন ধরনের দাপ্তরিক কাজে ব্যবহারের জন্য। অন্যদিকে তৃতীয় ফন্টটি তৈরি করা হবে হাতের লেখার আদলে। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে প্রথম দুইটি ফন্ট চূড়ান্তকরণের বিষয়ে কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর হাতের লেখার আদলে যে ফন্টটি তৈরি করা হবে, সেটি তৈরি হবে সকলের মতামতের ভিত্তিতে। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এই ফন্টটির জন্য সবার মতামত গ্রহণ করা হবে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপনের পরেই প্রধানমন্ত্রী ল্যাপটপে ক্লিক করার মাধ্যমে ‘আমার বর্ণমালা’ ব্যবহারের উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
আপনার হাতের লেখাও হতে পারে ‘আমার বর্ণমালা’
আমার বর্ণমালার তৃতীয় ফন্টটি তৈরি হবে হাতের লেখার আদলে, সেটা আগেই বলা হয়েছে। এই ফন্টটি হতে পারে আপনার হাতের লেখাও। আপনার হাতের লেখার একটি বাক্য বা একটি শব্দ বা একটি বর্ণ আপনি স্ক্যান করে আপলোড করে দিতে পারেন আমার বর্ণমালার নিজস্ব ওয়েবসাইটে (www.ama rbor nomala.gov.bd/)। এখানে যেসব হাতের লেখা জমা পড়বে, সেগুলোর মধ্য থেকে বিচারকরা নির্বাচন করবেন ফন্ট তৈরির জন্য ডিজাইন। ‘আমার বর্ণমালা’র ওয়েবসাইটে গিয়ে নিজের হাতের লেখা আপলোড করতে চাইলে অবশ্য আপনাকে নিবন্ধন করতে হবে সাইটে গিয়ে। নিবন্ধন করা যাবে বিনামূল্যেই। www.amar bornom ala.gov.bd/news/ details/7 লিংকে ফন্ট জমা দেওয়ার বিস্তারিত নীতিমালা পাওয়া যাবে। ‘আমার বর্ণমালা’র জন্য অবশ্য একটি অফিশিয়াল ফেসবুক পেজও খোলা হয়েছে। সেখানে গিয়েও এই সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ বা মতামত জানাতে পারবেন যে কেউ। ‘আমার বর্ণমালা’র এই ফেসবুক পেজের ঠিকানা www.fa cebook.com/AmarBor nomalaOfficial।
আসছে বিজয় অ্যান্ড্রয়েড
সময়ের সাথে সাথে কম্পিউটার আর ল্যাপটপের পাশাপাশি ট্যাবলেট পিসি আর স্মার্টফোনের ব্যবহার বেড়েছে এবং এর ব্যবহার বেড়েই চলেছে। ফলে স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট পিসিতেও বাংলা লেখার সুবিধা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। স্মার্টফোন আর ট্যাবলেট পিসির ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে এগিয়ে রয়েছে অ্যান্ড্রয়েড। তাই অ্যান্ড্রয়েডের জন্য বাংলা ইনপুট সফটওয়্যার ও ফন্ট তৈরির দিকেই বেশি মনোযোগী হয়েছে সকলেই। অভ্র অবশ্য ইতোমধ্যেই অ্যান্ড্রয়েড এবং অ্যাপল’র আইওএস-এর জন্য তাদের সফটওয়্যারের নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করেছে। এবারে জনপ্রিয় ‘বিজয়’ও আসছে অ্যান্ড্রয়েডের জন্য। এ প্রসঙ্গে মোস্তাফা জব্বারের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগামীকাল অর্থাত্ ২১ ফেব্রুয়ারি থেকেই অ্যান্ড্রয়েডের জন্য বিজয়ের অনলাইন সংস্করণ ব্যবহার করতে পারবেন আগ্রহীরা। ইতোমধ্যেই এই সংস্করনের জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ করেছেন তারা। ইউনিকোডভিত্তিক এই সংস্করণের পরে অবশ্য তারা আসকি সংস্করণের বিজয়ও নিয়ে আসতে চান অ্যান্ড্রয়েডের জন্য। সে জন্য আরও কিছু সময়ও লাগবে বলে জানান তিনি। কবে নাগাদ এটি বাজারে আসতে পারে—এ প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফা জব্বার জানান, তারা আগামী ২৬ মার্চকে ডেটলাইন ধরে কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন। এখনও পর্যন্ত অবশ্য এর নামটাও চূড়ান্ত করতে পারেন নি তারা। তবে আগামীকাল নাগাদ নামটাও চূড়ান্ত করে জানিয়ে দিতে পারবেন সকলেই।