বিচারপতির বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল গঠনের দাবি
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৫৮
ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অপপ্রচারমূলক সংবাদের কপি বিতরণকারী বিচারপতি মিজানুর রহমান ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জাতীয় সংসদে দাবি উঠেছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে অধিবেশন শুরু হলে প্রথমেই পয়েন্ট অব অর্ডারে অনির্ধারিত আলোচনায় মহাজোটের সংসদ সদস্যরা এ দাবি করেন। আর তাদের দাবির প্রেক্ষিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, প্রধান বিচারপতির সাথে আলোচনা করে সংবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। স্পিকার মো. আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট-এর সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হলে প্রথমেই পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর দাবি করেন জাতীয় পার্টির (এ) মো. মুজিবুল হক চুন্নু। তিনি বলেন, শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের প্রথম শহীদ আহমেদ রাজীব হায়দারকে নিয়ে সংগ্রামসহ কিছু পত্রিকা অসত্য খবর প্রকাশ করছে। জামায়াত-শিবির আন্তর্জাতিকভাবে ষড়যন্ত্র করছে। ধর্মীয় বিষয়ে মিথ্যা পোস্ট দিচ্ছে। আর এ খবরগুলো একজন বিচারপতি কপি করে সুপ্রিম কোর্টের সব জায়গায় বিলি করেছেন। এটা অন্যায়, ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের সাথে ওই বিচারপতি জড়িত।
তিনি আরো বলেন, কেউই জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করা হোক। ১৯৭২ সালের সংবিধানের আলোকে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে আনতে ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃপ্রবর্তনের দাবি করছি।
চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ মো. আবদুস শহীদ বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে তরুণ সমাজ উত্তাল। কয়েকদিন আগে সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করেছেন। ৩৩ জন সংসদ সদস্য এ নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেই তরুণদের একজন শহীদ রাজীবের বিরুদ্ধে এ ধরনের মনোভাব প্রকাশ করাই নগ্নতা ও ধৃষ্টতার প্রকাশ। অথচ ওই বিচারপতি সে কাজ করেছেন।
চিফ হুইপ স্পিকারের নিকট বিচারপতির এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যদের আলোচনা ও একটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব নেয়ার সুযোগ করে দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ৬৮ বিধিতে যে ব্যবস্থা আছে তাতে নোটিশ দিলে এ বিষয়টির ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার সুযোগ পাবেন সংসদ সদস্যরা। সংসদীয় পদ্ধতিতে কিভাবে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত দেয়া যায় সে প্রস্তাবও উঠে আসবে। আইন মন্ত্রী সে প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নিতে পারবেন। তিনি বলেন, বিচারপতি অপপ্রচারমূলক সংবাদ হকারের মতো লিফলেট আকারে বিতরণ করে ধৃষ্টতাপূর্ণ কাজ করেছেন।
স্পিকার বলেন, আমি এখনই শুনলাম বিষয়টি। বিচারপতিদের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে দেশের মানুষ কোথায় যাবে? আইনমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে এ ঘটনার একটি সুরাহা আশা করি। তা না হলে আমি এ বিষয়ে একটি রুলিং অবশ্যই দেবো।
এরপর আইনমন্ত্রী বলেন, একজন বিচারপতি বিচারকের দায়িত্ব নিয়ে যে কাজ করেছেন তা একেবারেই জঘন্য। নিন্দনীয়। অসদাচরণমূলক। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনে রাষ্ট্রপতি দায়িত্বপ্রাপ্ত। তিনি কাউন্সিল গঠনে প্রধান বিচারপতিকে বলতে পারেন। আমি প্রধান বিচারপতির সাথে আলোচনা করবো যাতে কাউন্সিল গঠন করে সংবিধানের ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়। তিনি বলেন, বিচারপতি হয়ে কখনও এ ধরনের কাজ করা উচিত নয়। এটা সংবিধান বহির্ভূত। ইনকিলাব ও আমার দেশ পত্রিকা রাজীবের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের কাজটি করেছে। এই সংবাদটি তারা মিলে তৈরি করে প্রকাশ করেছে। ছড়িয়েছে। যাতে রাজীবকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা যায়। রাজীব এ ধরনের কাজ করেনি, করতে পারে না। আমি এর বিরুদ্ধে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেবো।
এর আগে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, বিচারপতি যদি তার দায়িত্ব ও কতর্ব্য সম্পর্কে না জানেন, যদি রাজনৈতিক দায়ে কাজ করেন তাহলে তার বিষয়ে আর কী বলার আছে? বিচারপতি হিসাবে ওই বিচারক যখন শপথ নেন তাতে কিছু সীমারেখা দেয়া ছিলো। বিচারক সেসব ভঙ্গ করেছেন। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচারপতি এমন সময়ে এ কাজটি করছেন, যখন পুরো জাতি শাহবাগের গণজাগরণের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছে। গণজাগরণের একজন রাজীবকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাকে হত্যার ধরন একাত্তরে জামায়াত-শিবিরের জঘন্য কর্মকাণ্ডের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
সেলিম বলেন, বিচারপতি রাজীবকে মুরতাদ বলে আখ্যায়িত করেছেন। একজন বিচারপতি হয়ে কীভাবে তিনি এ কথা বলেন? তিনি জামায়াত-শিবিরের পক্ষে কাজ করছেন। তাহলে কী এই হত্যার সঙ্গে তিনিও জড়িত? তা না হলে তিনি এ কাজ কেন করলেন? রাজীব হত্যার ঘটনায় তাকেও ইন্টারোগেশনের আওতায় আনা হোক। তাহলে পেছনের অনেক ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে।
তিনি বলেন, একটি দু’টি পত্রিকা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির জন্য রাজীব সম্পর্কে তার মৃত্যুর পর অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা নিজেরাই রাজীবের নামে লেখা তৈরি করে প্রচার চালাচ্ছে। ওই বিচারপতি বিএনপি-জামায়াতের সময় বিচারপতি হন। আমরা জানি, কারা বিএনপি-জামায়াতের সময় বিচারপতি হয়েছিলেন। সে সময় জাল সার্টিফিকেট নিয়ে অনেকে বিচারপতি হন। তারা এখন রাজাকারের পক্ষ নিয়ে শপথ ভঙ্গের পাশাপাশি আইন লংঘন করে কাজ করছেন। বিচারপতি এ কাজটি করেছেন শাহবাগের গণজাগরণকে নস্যাত্ করার জন্য। বিচারপতি হয়ে এ কাজ তিনি করতে পারেন না।
বিচারপতির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য যত দ্রুত সম্ভব সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়ে সেলিম বলেন, গতবারও দেখেছি স্পিকারের একটি বক্তব্য নিয়ে একজন বিচারপতি অযাচিত মন্তব্য করেছিলেন। আমরা ওই বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রস্তাব করলেও আজ পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। এ বিষয়ে আরও বক্তব্য রেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বি মিয়া, মো আবদুল মান্নান।