ছোট দেশে বড়ো উদ্যোগ

জাতিসংঘের তত্কালীন মহাসচিব কফি আনানের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করিয়াছিলেন ২০০১ সালের ১৫ মার্চ। প্রায় একযুগ পর ইনস্টিটিউটটি পুরোদমে সচল হইয়া উঠিয়াছে। জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করিয়া দেওয়া হইয়াছে ভাষা জাদুঘরের দরোজা। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, ভাষাবিষয়ক এই জাদুঘরটি ইনস্টিটিউটের তাত্পর্যপূর্ণ উদ্যোগগুলির অন্যতম। ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক জানাইয়াছেন যে, উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষাসহ আমাদের দেশের সচল ও বিলুপ্ত ভাষাসমূহের প্রমাণাদিসহ ভাষা সম্পর্কিত অনেক তথ্য রহিয়াছে এই জাদুঘরে। পাশাপাশি, এশিয়া মহাদেশের ভাষা সম্পর্কিত নানা নির্দশন এবং এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৪৪টি দেশের ভাষা-পরিচিতি শীর্ষক প্রদর্শনীরও সকল আয়োজন সম্পন্ন করা হইয়াছে। সেই সাথে অব্যাহত আছে ভাষাবিষয়ক বিশ্বমানের একটি লাইব্রেরি গড়িয়া তোলার কাজও। আমাদের সামর্থ্যের নিরিখে উদ্যোগটি উচ্চাভিলাষী মনে হইলেও ইহা যে অত্যন্ত মহত্ ও অতি প্রয়োজনীয় একটি উদ্যোগ তাহাতে সন্দেহ নাই। আমরা ভাবিতে প্রলুব্ধ হই যে, আমাদের এই ক্ষুদ্র মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটটিই একদিন হয়তো বিশ্বের ভাষাবৈচিত্র্যের সর্বাপেক্ষা মূল্যবান সংরক্ষণাগার হইয়া উঠিবে। দেশ হিসাবে আমরা ছোট হইতে পারি এবং আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকিতে পারে, কিন্তু মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়া সেই স্পর্ধা প্রকাশের অধিকারও নিঃসন্দেহে আমরা অর্জন করিয়াছি। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে আমরা জোরেশোরে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কথা বলিয়া আসিতেছি দীর্ঘদিন যাবত্। অথচ মানবসভ্যতার ভারসাম্যপূর্ণ বিকাশের জন্য ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ অপরিহার্য হইলেও সেইদিকে প্রত্যাশিত নজর দেওয়া হয় নাই। ফলে ইতোমধ্যে বিশ্বের বহু ভাষা বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। বিলুপ্তির পথে আছে এমন ভাষার সংখ্যাও বিপুল। প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও পরিচর্যার অভাবে বিস্তীর্ণ সবুজ শস্যক্ষেত যেমন ক্রমে নিস্তেজ হইয়া পড়ে, ভাষার ব্যাপারটিও অনেকটা তাই। অতএব, ভাষাকে সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্র হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখিবার কোনো উপায় নাই। রাষ্ট্রের বৈরিতা ভাষার জন্য কতোটা বিপজ্জনক হইতে পারে তাহা যেমন আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করিয়াছি, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা ভাষাকে কতোটা প্রাণবন্ত ও গতিশীল করিয়া তুলিতে পারে সেই অভিজ্ঞতাও আমাদের আছে। মাতৃভাষার অধিকারই যে আমাদের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পথ প্রশস্ত করিয়াছে— তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। পাশাপাশি, আমাদের মহান ভাষাশহীদদের স্মৃতিবিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরব অর্জন করিয়াছে। মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটও এই গৌরবেরই ফসল। ইহাকে আরও অর্থবহ ও বিকশিত করিয়া তুলিবার চ্যালেঞ্জ এখন আমাদের সামনে। সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে সত্য। পাশাপাশি, অনন্য কিছু উদাহরণও আছে আমাদের সামনে। সর্বাপেক্ষা বড়ো উদাহরণটি হইল শান্তি নিকেতন ও বিশ্বভারতী। সংকল্প ও সদিচ্ছা থাকিলে এমনকী ব্যক্তি-উদ্যোগেও যে অসাধ্য সাধন করা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহা প্রমাণ করিয়া গিয়াছেন। সেই সাথে আরও একটি জিনিস দরকার। সেইটি হইল সৃজনশীলতা। সেই যুগে রবীন্দ্রনাথ শুধু যে বাংলার সাথে বহির্বিশ্বের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন রচনার নিমিত্তে বিশ্বমানের একটি প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিবার তাগিদ অনুভব করিয়াছিলেন তাহাই নহে, একই সাথে বিশ্বের বহু বরেণ্য ব্যক্তিকে তাঁহার উদ্যোগের সাথে সফলভাবে জড়িত করিতেও সক্ষম হইয়াছিলেন। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাইতে হইবে। সত্যিকারের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়িয়া তুলিতে হইবে আমাদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে। সর্বোপরি, কোনোভাবেই এইটি যেন আরেকটি গতানুগতিক সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয় সেইদিকেও লক্ষ্য রাখিতে হইবে। সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার স্বার্থে পরিহার করিতে হইবে বাংলা একাডেমীসহ সমধর্মী অন্য সকল প্রতিষ্ঠানের সাথে সর্বপ্রকার দ্বৈততা।