[ রা জ নী তি ]
আত্মবিশ্বাস হারালে পরাজয় এড়ানো যায় না
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৩২
ক্ষমতাসীন দলের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরেকটি ভয়ংকর হত্যাকান্ডের আশংকা ব্যক্ত করেছেন। তিনি প্রধান বিরোধী দলের প্রতি এই হত্যাকান্ডের রূপরেখা তৈরির অভিযোগ তুলেছেন। এজন্য তিনি দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। এই ষড়যন্ত্রের তথ্য প্রমাণ তার হাতে আছে বলেও দাবি করেছেন।
দেশবাসী এমনিতেই উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। ‘১৩’ সংখ্যা (আনলাকি থার্টিন) থাকায় নতুন বছরকে অনেকেই দুর্ভাগ্যের বছর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যদিও এটা প্রচলিত কুসংস্কার, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই যেন বাস্তব রূপ লাভ করেছে। বছরের শুরু থেকেই আমরা স্বস্তিতে নেই। রাজনৈতিক অস্থিরতা লেগেই আছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব বিরাজ করছে। তাছাড়া শাহবাগ আন্দোলনের সূত্রপাতের পর জোট ও মহাজোট আরও মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এরইমধ্যে কয়েকটি হরতাল হয়ে গেছে। লাশের পর লাশ পড়েছে। শাহবাগের একজন ব্লগার ও সংগঠক নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। এরপরও যদি কেউ ভয়াবহ হত্যাকান্ডের কথা বলেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবে তাতে আঁেক উঠা ছাড়া উপায় নেই। এতে সাধারণ মানুষ আরও আতংকগ্রস্ত না হয়ে পারেন না।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসে ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে। এরপর হানিমুন পেরিয়ডের দুই মাসও অতিবাহিত হয়নি। এরমধ্যে ঘটে যায় ভয়াবহ বিডিআর বিদ্রোহ ও নৃশংস হত্যাকান্ড। এই ঘটনায় সারা দেশের মানুষ হতবাক ও স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। এই ঘটনায় দেশি-বিদেশি যারাই জড়িত থাকুক না কেন, শেষপর্যন্ত ক্ষতিটা বাংলাদেশেরই হয়েছে। এরপর আমরা বলতে শুনলাম, একটা বুলেট আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকে ধেয়ে আসছে। আরেকটি ১৫ই আগস্ট আসছে ইত্যাদি। কী ভয়াবহ কথা! তখনও আমরা উদ্বিগ্ন ও উদ্বেলিত না হয়ে পারিনি।
সরকারি দলের অন্যতম প্রধান নেতা চিকিত্সার জন্য বিরোধী দলীয় নেত্রীর সিঙ্গাপুর সফর নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সেখানে চিকিত্সা উন্নত মানের। তবে তিনি শুধু চিকিত্সার জন্য সিঙ্গাপুর যাননি। একটি বিশেষ শক্তিশালী দেশের সঙ্গে বোঝাপড়া করার জন্য সিঙ্গাপুর গেছেন। কিভাবে আগামীতে ক্ষমতায় আসা যায়, কি করলে তারা ক্ষমতায় বসাবে এ বোঝাপড়ার জন্যই তিনি এ সফরে গেছেন’ (ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)। আবার বিরোধী দলীয় প্রধানের সম্ভাব্য লন্ডন সফর সম্পর্কেও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন যে, লন্ডনে তার ছেলে বসবাস করে বলে তিনি সেখানে যেতে পারেন। তবে সেটাও মূল কারণ নয়। তার অন্যতম কারণ সেখানে আরো একটি শক্তিশালী দেশের সরকারের সঙ্গে বোঝাপাড়া করা।
যিনি বা যাঁরা এভাবে বলতে পারেন, নিশ্চয়ই তাঁদের পেছনেও একটা শক্তি থাকা লাগে। একইভাবে শক্তিশালী দেশ থাকা লাগে। বোঝাপড়া লাগে। তা না হলে প্রকাশ্যে এমন সাহসী কথা বলা যায় না। এখন প্রশ্ন হল, তাঁর বা তাঁদের আত্মবিশ্বাস কি হারিয়ে যাচ্ছে? বা আত্মবিশ্বাস হারাবার এমন কোন কারণ ঘটেছে? যেভাবে বলা হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, তাঁরা ভড়কে গেছেন বা যাচ্ছেন। এতে পেছনের শক্তিধর দেশটি কি আশাহত হবে না? আমরা বলি আত্মবিশ্বাস হারানো পাপ। আত্মবিশ্বাসই সকল কিছুর চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই শক্তি হারালে জীবনের সবক্ষেত্রে বিপর্যয় নেমে আসে। আসে পরাজয়।
পদ্মা সেতুর ঋণ নিয়ে অনেক জল ঘোলা করা হয়েছে। শেষপর্যন্ত সরকার বিশ্বব্যাংকের এ সংক্রান্ত ঋণ নেওয়া থেকে সরে এসেছে। যদিও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়টি এখনও মীমাংসিত হয়নি। ঝুলে আছে। তবে এ নিয়ে সরকারের মধ্যকার একটি প্রভাবশালী মহল ইতোমধ্যেই একটি শক্তিশালী দেশের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে ছেড়েছেন। মুক্তিযুদ্ধকালে দেশটির কী ভূমিকা ছিল তা নিয়ে অতীতের কাসুন্দি ঘাঁটা হয়েছে বারবার। যেভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। আঞ্চলিক শক্তির দাবিদার ও এই সরকারের সমর্থক সেই শক্তিশালী দেশও এভাবে কখনো প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, বিশ্বব্যাংক মানে আমেরিকা নয়। বিশ্বব্যাংক জাতিসংঘের একটি অঙ্গ সংগঠন বা সংস্থা। চাইলেই আমেরিকা বিশ্বব্যাংক নিয়ে সবকিছু করতে পারে না। যাহোক, এভাবে একটি শক্তিধর দেশের সাথে সম্পর্কের অনেকটা অবনতি হয়েছে বাংলাদেশের। এর ফলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষত আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে। একে অপরিণামদর্শিতা ছাড়া আর কিবা বলা যায়।
অনুরূপভাবে গ্রামীণ ব্যাংক ও বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল লরিয়েট ড. ইউনূসের ব্যাপারে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে এবং যেভাবে বিরুদ্ধাচরণ ও অপপ্রচার চালানো হয়েছে তাকে অনেকে অসম যুদ্ধের শামিল বলে মনে করেছেন। কেননা ড. ইউনূস মানেই বাংলাদেশ নয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র তাঁর ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। তাছাড়া একজন ব্যক্তি একটি দেশের কাছে কখনো বড় হতে পারে না। এই কথা যারা চিন্তা করেননি, তাদের আত্মবিশ্বাস নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী অর্জুন অনেক শক্তিশালী। তিনি আসলে শ্রী রামকৃষ্ণের আশীর্বাদপুষ্ট। তাঁর কৃপা ও শক্তিতে তিনি বলীয়ান। কিন্তু এই আশীর্বাদ নিয়েও তিনি যদি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন, তাহলে শক্তিদাতারই শরম পাওয়ার কথা। এ প্রসঙ্গে একটি ছোট গল্প বলা প্রয়োজন। একবার এক ব্যক্তি দৈব ও মহাশক্তি লাভের জন্য ধ্যানে নিমগ্ন হলেন। গহীন ও নির্জন বনে বসে বহু তপস্যা করলেন। কিন্তু কোন ফলোদয় হল না। অতঃপর আরও তপস্যার পালা শুরু হল। তারপর একদিন তিনি স্নানের জন্য একটা পুকুরে নামলেন। সেই সময় একটা কাক তার গায়ে মল ত্যাগ করে উড়ে যাচ্ছিল। তিনি অকস্মাত্ ক্রোধান্বিত হয়ে কেবল কাকটার দিকে একবার তাকালেন। অমনি তার চোখের আগুনে কাকটা পুড়ে মরে নিচে পড়ে গেল ধপাস করে।
এরপর তিনি নিজ বাড়িতে এলেন। মায়ের কাছে খাবার চাইলেন। খাবার দিতে দেরি হলে তিনি আগের মতো আবার রেগে মায়ের দিকে তাকালেন। কিন্তু এবার বিধি বাম। তার চোখ রাঙানিতে কোন কাজ হল না। তার তপস্যা বৃথা গেল। অর্থাত্ শক্তি প্রদর্শন করতে হয় জায়গা মতো। তা না হলে সেই শক্তি কাজ করে না। বরং হিতে বিপরীত হয়।
বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পর আমেরিকার বৈশ্বিক ক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। সামরিক বাজেট কাটছাট ও ঋণগ্রস্ততার মাধ্যমে তা প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, বড় লোকের ঠাঁট সহজে যায় না, এজন্য কয়েক যুগ লাগে। আর পৃথিবীতে বহু আঞ্চলিক শক্তির উত্থানে এখনকার যুগকে বহুমেরুকরণের যুগ বলা হলেও সেই আঞ্চলিক শক্তিগুলি বড় শক্তিরই ছত্রছায়ায় রয়েছে। এমতাবস্থায় উগ্রপন্থিদের তর্জন-গর্জন সার হওয়াটাই স্বাভাবিক। তারা এই সরকারের ঘাড়ে চেপে বসে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশকে বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। শেষে দেখা যাবে যেই শক্তির ওপর ভরসা করে এত আস্ফাালন, তারাই পেছনে নেই।
অতএব, সরকারকে আত্মবিশ্বাসের জায়গাটিতে ফিরে যেতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক