বিশ্ব শুনছে তারুণ্যের গর্জন

তারুণ্য মানেই বাধা না মানা, শৃঙ্খল ভাঙার প্রত্যয়। তীব্র স্রোতে উজানে সাঁতরে চলাই তারুণ্যের ধর্ম। অফুরন্ত প্রাণশক্তি আর সৃষ্টির উন্মাদনাই তারুণ্যের অহংকার। ঘুণে ধরা সমাজের পচে যাওয়া ব্যবস্থার উত্পাটনই তারুণ্যের মন্ত্র। বদ্ধঘরের দরজা ভেঙে জীবনের জয়গান গাওয়াই তারুণ্যের কর্ম। সে তারুণ্যই আবার জেগে উঠেছে। এ জাগরণ বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক বিজয়ের ধারাবাহিকতা, ৬৯’র গণঅভূত্থানের বিজয় মুকুট অর্জনের উত্তরাধিকার, ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম লাভের যে ঘটনা সে সিঁড়িপথের উপরই আজকের জাগরণ। ক্ষুধিরাম, সূর্যসেন, প্রীতিলতার মধ্যকার রক্তই আবার জেগে উঠেছে। সালাম, বরকত, শফিউরের আত্মদান এ জাগরণের প্রেরণা। শহীদ নূর হোসেন আর ডা. মিলনের আত্মাহুতি এ তারুণ্যের বুকের কবচ। তারুণ্য আমাদের দেশপ্রেমের শক্তি; জাতির ক্রান্তিকালের মাঝি। সে তারুণ্যের আজকের জাগরণ বাংলাদেশেরই জাগরণ; অমিত সম্ভাবনার আগামীর জয়গান। সত্য, সুন্দর চেতনার কখনও মৃত্যু হয় না। যে চেতনা নিয়ে যুদ্ধ করে, রক্ত দিয়ে, আত্মবলিদান করল অসংখ্য তাজা প্রাণ সে চেতনার কি কখনও মৃত্যু হতে পারে? সত্য বড় নির্মম, বড় কঠিন। সত্য ও ন্যায়ের চেতনা যে দিপশিখা জ্বালিয়ে ছিল ৭১’এ তা কি অত সহজে নিভে যেতে পারে? যে আলোয় পথ দেখেছিল বাংলার দামাল ছেলেরা; ছিনিয়ে এনেছিল বাংলার স্বাধীনতার সূর্য—সে আলোর তেজোদীপ্ত উন্মেষ কি এত সহজে হারিয়ে যেতে পারে? আলো এসে তাই পথিকের বেশে পথ দেখিয়েছে শত-সহস্রবার। ক্লান্তহীন এ পথিকের যাত্রা তো মহাকালের মহামিলনের পথে। সুতরাং কোনো বাধাই কি তার কাছে অলঙ্ঘনীয়? চেতনার এ স্ফুরণ তাই আজ সহজেই ছড়িয়েছে শহর থেকে গ্রামে। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার যাত্রা তাই সহজে এসে মিশেছে শাহবাগে। উত্তাল সব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস চত্বর উপশহরের শহীদ মিনারগুলোর চত্বর উত্তাল সব বাঙালি যাদের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ চেতনায় বাংলাদেশ উত্তাল শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর উত্তাল সমগ্র বাংলাদেশ। তারুণ্যের গর্জনে উন্মাতাল পুরো দেশ। মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি তবু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ এ তরুণ প্রজন্ম বীরশহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান দেখিয়ে, স্বজন হারানোদের ব্যথা নিজের বুকে গেঁথে নিয়ে এই সোনার দেশ থেকে যুদ্ধাপরাধী নিধনের লড়াইয়ে আজ রাস্তায় নেমেছে। তাদের হূদয়ের অবগাহন জুড়ে প্রতিশোধের উত্তাল তরঙ্গ বইছে। প্রতিটি তরুণ-তরুণী যেন ফুল হয়ে ফুটেছে প্রজন্ম চত্বরে। ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর। তেজোদীপ্ত সকল তরুণ-তরুণীদের উত্তাল গর্জনের দৈহিক ভঙ্গিমা যেন ফুলের পাপড়ি হয়ে হেসে উঠছে, তাদের গর্জনের শব্দ তরঙ্গ যেন মধুমাখা ফুলের সুগন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে আমরা আরও ফুল চাই কোথায় নবীন-জোয়ানের দল? আরেকটি ইতিহাসের সাক্ষী হতে চলছে প্রজন্ম চত্বর। জীবন মানুষের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ। এই জীবন সে পায় মাত্র একটি বার। তাই এমনভাবে বাঁচতে হবে, যাতে বছরের পর বছর লক্ষ্যহীন জীবন যাপন করার যন্ত্রণার অভিশাপে ভরা অনুশোচনায় ভুগতে না হয়, মরতে না হয়। যাতে বিগত জীবনের গ্লানি ভরা লজ্জার দহন সইতে আর না হয়। তাই এমনভাবে বাঁচতে হবে, যাতে মৃত্যুর মুহূর্তেও মানুষ বলতে পারে-আমার সমগ্র জীবন আমার সমগ্র শক্তি আমি ব্যয় করেছি এই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আদর্শের জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রামে। একাত্তরে গণজাগরণে আমজনতা ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে যে চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই একই চেতনায় একই স্লোগানে আজ তারুণ্য শক্তি ঐক্যবদ্ধ, এই ভাষার মাসে। তবে এবারের লক্ষ্য তাদের একটাই :সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি চাই। এই দাবিতে আজ গোটা জাতি সোচ্চার। আজকের প্রজন্মের মুক্তিকামী তারুণ্যর মুখে মুখে প্রতিমুহূর্তে উচ্চারিত হচ্ছে, আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে, ধ্বণিত হচ্ছে, গণমানুষকে জাগিয়ে। সংবাদপত্র এবং মিডিয়ায় তা প্রতিদিন প্রকাশিত হচ্ছে, প্রচারিত হচ্ছে—বারংবার গোটা পৃথিবীজুড়ে। একটি স্লোগানের যে শক্তি, যে প্রাণ তা যেন সেই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আদর্শের জন্য নিবেদিত, উত্সর্গিত হচ্ছে, হতে চলেছে। লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে বোধকরি তা থামবে না, একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামের মতোই। তারুণ্য প্রজন্ম চত্বর থেকে প্রতি মুহূর্তেই উচ্চারিত হচ্ছে—‘প্রীতিলতার বাংলায়, রাজাকারের ঠাঁই নাই’, ‘সূর্য সেনের বাংলায়, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’, ‘শেখ মুজিবের বাংলায়, যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি চাই’ ইত্যাদি সব স্লোগান, প্রাণের দাবিতে। আর এতসব স্লোগানের মূল মন্ত্র, প্রধান চালিকাশক্তি যেন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। ১৯৭১-২০১৩ যেন এক এবং অভিন্ন। মানুষের মুক্তি ও মানবতার পক্ষে, ন্যায়ের দাবিতে তাই সময়ের ব্যবধান থাকে না। ন্যায়ের পক্ষে দাবি তাই সময়কে একাকার করে দেয়, মানুষে-মানুষে দূরত্ব কমায় এবং সব মানুষকে এক এবং অভিন্ন করে তোলে। যারা এই স্রোতের বিপরীতে অবস্থান নেয় এবং কথা বলে-তাদেরকে ইতিহাস একদিন চিহ্নিত করবেই। মুক্তিযুদ্ধের প্রেমে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস। তাইতো চেতনা মঞ্চে মুহুর্মুহু উচ্চারিত হচ্ছে জয় বাংলা, বীর বাঙালি প্রভৃতি মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জাতির এই প্রজন্মের তারুণ্য ও যৌবনের মাতামাতিতে মুগ্ধ গোটা জাতি। অবহেলিত বীরাঙ্গনা মা-বোনেরা ফিরে পেয়েছে প্রাণের সঞ্চার। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা অনুভব করছে দেশমাতৃকা। সম্ভ্রম রক্ষার যোগ্য সন্তান পেয়ে অহংকারী হয়ে উঠেছে স্বাধীনতা। সৃষ্টি হয়েছে স্বাধীনতাযুদ্ধের পুনঃজাগরণ চেতনা। নষ্ট করে দেওয়া স্বাধীনতার পবিত্রতাকে ফিরিয়ে আনার চেতনা নিয়ে ঘর ছেড়েছে জাতির নতুন প্রজন্মের দামালেরা। তারা গাইছে ‘ভয় নেই মা, আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে’ গান। এদের উপস্থিতিতে দীর্ঘ বিরতির পর আজ প্রশান্তির হাসি হাসছে দেশমাতৃকা। ৭১ পেরিয়ে গেছে বহু আগে; সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে অনেকদূর চলে এসেছি কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা দেশের স্বাধীনতা চায়নি, এই বাংলার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আবার এই প্রজন্মের আবির্ভাবের জন্যই এতদিন দেরি হয়েছে। আজ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সকল মানুষ, বিভিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বাঙালিরা আর চুপ না থেকে জেগে উঠেছে নতুন প্রজন্মের সাথে; তারা জানে নতুন প্রজন্মের জয় হবেই হবে। তারুণ্যই জীবন, তারুণ্যই গতি। পৃথিবীর যত কল্যাণ, ইতিবাচক অর্জন- সবখানেই রয়েছে তরুণদের অবদান। যুগে যুগে তারুণ্যই সব অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। বাঙালির সাহস, গৌরব ও শক্তির প্রেরণা তারুণ্য।