ফ্রেমে ফ্রেমে স্বপ্নগাঁথা

সাংস্কৃতিক একটা পরিমণ্ডলে ওঠাবসা ছিল আগে থেকেই। থিয়েটারে কাজ করতেন, তখন থেকেই অভিনয় আর পরিচালনা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। তারপর বুঝতে শেখার পর চলচ্চিত্র তাকে অন্য এক মোহে টানতে থাকে, খুব শখ জাগে—এমন একটা চলচ্চিত্র যদি নিজেই বানাতে পারতাম, মন্দ হতো না! এভাবেই আগ্রহের জন্ম। আর স্বপ্নটা তিনি শুধু দেখে বসেই থাকেননি। নিজেই স্কুলের পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে দেশ-বিদেশির নামকরা চলচ্চিত্রগুলো দেখতেন। খোঁজখবর নিয়ে জানার চেষ্টা করতেন। কীভাবে এই চলচ্চিত্রগুলো তৈরি হয়? সাধারণ দৃশ্যগুলো কী অসাধারণ করেই না ফুটিয়ে তোলেন তারা। এইসব বুঝে উঠতে উঠতেই ক্যামেরা হাতে নিলেন তাওকীর। নবম শ্রেণীতে পড়ুয়া অবস্থাতেই তৈরি করেন প্রথম ফিল্ম ‘কঙ্কপুরাণ’। নিজের প্রথম শর্ট ফিল্মটাই তখন সুযোগ পেয়ে যায় ৩য় আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উত্সবে। সেখানে দেখানোর জন্য মনোনীত হয়ে যায়। ‘কঙ্কপুরাণ’ এটাই বা কম কী? বিশ মিনিটের সেই চলচ্চিত্রে পথশিশুর সাথে কাকের তুলনা করছিলেন তাওকীর। তুলনা করেছিলেন বলতে, ক্যামেরার ফ্রেমে নান্দনিক করে উপস্থাপন করেছিলেন শিশুদের সামনে। সে সময় চলচ্চিত্র উত্সবে বেশ সুনামও কুড়িয়েছিল চলচ্চিত্রটি। তারপর মেডিকেল সায়েন্স নিয়ে নির্মিত ‘নামা’ চতুর্থ আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উত্সবে প্রদর্শিত হয়। এতদিনে কাজ করে হাত পাকিয়ে ফেলেন তাওকীর। ৫ম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে ‘দ্য ইউলিট’ ফিল্ম দিয়ে বাজিমাত করে ফেলেন ক্ষুদ্রে এই নির্মাতা। হয়ে যান সেরা নির্মাতা, পুরস্কার হিসেবে পেয়ে যান পঁচিশ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়েই নির্মিত ‘গোল ও যোগ’ এই বছরে শুরুতে হয়ে যাওয়া ৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উত্সবে পুনরায় সেরা নির্মাতা’র পুরস্কার এনে দেয় তাওকীরের হাতে। ‘গোল ও যোগ’-এর কাহিনীটাও আবর্তিত হয়েছে তুচ্ছ একটা ঘটনা নিয়ে। তুচ্ছ ঘটনাতেই কি তুলকালাম কাণ্ড বানিয়ে ফেলি আমরা আর তার পরিণতিই বা কেমন হয় তাই নিয়েই একশটেই চলচ্চিত্রটি বানিয়েছেন তাওকীর। এক শট মানে এক শটেই, একটানা পনের মিনিট ধরে শট নেওয়া হয়েছে এই শর্ট ফিল্মটির জন্য। কেউ মনে করতেই পারেন এক শর্ট মানে তো আরও সহজ, আদৌ তা নয়। অনেকবার অনুশীলন করেই তাদেরকে কাজটা করতে হয়েছিল। তাওকীর নিয়মিত চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি অনেকগুলো ডকুমেন্টারিও নির্মাণ করেছেন। বৃহত্তর রাজশাহীর উপর রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তিনি তৈরি করেছে অসাধারণ একটি ডকুমেন্টারি। রাজশাহীর অতীত, বর্তমান এমনকি ভবিষ্যত্ পরিকল্পনাও তিনি যুক্ত করেছেন এই প্রামাণ্যচিত্রে। তার কাজের মানে সবাই এতটাই সন্তুষ্ট যে, রাজশাহীর বরেন্দ্র মিউজিয়ামের শতবর্ষ পূর্তির লোগেফিল্টাও তার হাতে বানানোর দায়িত্ব দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ এবং সেটাও যারপরনাই প্রশংসিত হয়েছে। বহুগুণের অধিকারী এই তাওকীরের ছেলেবেলা কেটেছে রাজশাহীতেই। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি দেওয়ার পর বর্তমানে বরেন্দ্র মহাবিদ্যালয়ে উচ্চ মাধ্যমিক অধ্যয়নরত তিনি। তাওকীরের বাবা একজন সরকারি কর্মকর্তা, মা গৃহিণী। একমাত্র বড় ভাই শুভ সব সময়ই তার কাজে উত্সাহ ও সহযোগিতা করেন। তাওকীর ভবিষ্যতে চলচ্চিত্র নিয়েই পড়াশোনা করতে চান, অনেক ভালো ভালো চলচ্চিত্র তার হাত দিয়ে পাব আমরা, তরুণকণ্ঠের এই শুভকামনা তার জন্য।