জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড ও ইতিহাসের দায়
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৩০
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডকে ‘চরম লজ্জাজনক’ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। তিনদিনব্যাপী ভারত সফরের শেষদিনে গত ২০শে ফেব্রুয়ারি তিনি এই মন্তব্য করেন। পরিদর্শন বইয়ে তিনি লিখিয়াছেন যে, যুক্তরাজ্যের ইতিহাসের এই লজ্জাজনক ঘটনা কখনোই ভুলিয়া যাওয়া উচিত হইবে না। ঘটনার প্রায় শতবর্ষ পরে তাহার এই মন্তব্য ইতিহাসের অন্ধকার একটি অধ্যায়কেই শুধু পুনরুজ্জীবিত করে নাই, সেই সাথে ইতিহাসের দায় শোধের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটিকেও পুনরুত্থাপিত করিয়াছে আমাদের সামনে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ব্রিটিশ শাসিত ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে নৃশংস এই হত্যাযজ্ঞটি সংঘটিত হইয়াছিল ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল। ব্রিটিশ সরকারের সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল রেগিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে নিরস্ত্র নারী-পুরুষ ও শিশুদের এক সমাবেশে শত শত রাউন্ড গুলিবর্ষণ করা হইয়াছিল। সরকারি হিসাবেই হতাহতের সংখ্যা ছিল দেড় সহস্রাধিক। তবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মতে, শুধু নিহতের সংখ্যাই ছিল এক হাজার। মহাত্মা গান্ধী ইহাকে ‘ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছিলেন। কারণ কোনো প্রকার পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই যে এই হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করা হইয়াছিল জেনারেল ডায়ার নিজেও তাহা স্বীকার করিয়াছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে তাহার ‘নাইট’ উপাধি বর্জন করিয়াছিলেন।
দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হইল, কলঙ্কজনক এই ঘটনাটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপাইয়া দিলেও প্রকৃত অর্থে কেহই সত্যের মুখোমুখি হইবার মতো সত্ সাহস প্রদর্শন করিতে পারেন নাই। ঘটনার এক বত্সর পরে, ১৯২০ সালে, তত্কালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ঘটনাটিকে ‘নিষ্ঠুর’ অভিহিত করিয়াই দায় সারিয়াছিলেন। আরও দীর্ঘ ৭৭ বত্সর পরে, ১৯৯৭ সালে, ভারত সফরকালে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ওই ঘটনাকে ‘দুঃখজনক মুহূর্তগুলির’ এক ‘বেদনাদায়ক’ উদাহরণ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের মন্তব্যটি যে খুবই তাত্পর্যপূর্ণ তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই বলিলেই চলে। কারণ তিনিই দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি অনেকটা দ্বিধাহীনভাবে কঠিন এই সত্যের সম্মুখীন হইয়াছেন— যদিও অনেকের প্রত্যাশা আরও বেশি।
প্রায় শতবর্ষব্যাপী ইতিহাসের ঘাড়ে জগদ্দল পাথরের মতো যে কলঙ্কের গুরুভার চাপিয়া আছে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য বা মন্তব্যের মাধ্যমে সেই দায় শোধ হইবে কিনা তাহা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে ইহার প্রয়োজনীয়তা ও তাত্পর্য যে অপরিসীম তাহাতে সন্দেহ নাই। পৃথিবী জুড়িয়া জালিয়ানওয়ালাবাগের মতো মনুষ্যসৃষ্ট অমোচনীয় ক্ষতের দৃষ্টান্ত এমনিতেই কম নহে। তদুপরি, প্রতিনিয়তই তৈরি হইতেছে আরও ভয়ঙ্কর, আরও ঘৃণ্য সব উদাহরণ। ইহার লাগাম টানিয়া ধরিতে হইলে— সত্য যতো কঠিনই হউক না কেন— আমাদের অবশ্যই তাহার মুখোমুখি হইতে হইবে। যাহার যাহা প্রাপ্য তাহাকে তাহা বুঝাইয়া দিতে হইবে কড়ায়গণ্ডায়। ইতিহাসের দায় শুধু নহে, শোধ করিতে হইবে বিবেকের দায়ও।