ঝালেঝোলে অম্বলে

শাহবাগে ঘাড়ত্যাড়াদের লাগাতার আন্দোলন ও বিএনপি নেতাদের বায়ুচড়া রোগ

এবার দেশে যেভাবে তীব্র শীত এসেছিল, মনে হয়েছিল এই শীত বুঝি আর যাবেই না। কিন্তু এই শীতের তীব্রতা আকস্মিকই কমে গেল, বলা যায়—শীত যেন মার খেয়ে গেল। শাহবাগ আন্দোলনের তাপে শীত বাপ-বাপ করে পালিয়ে বাঁচল। শাহবাগে তরুণ সমাজ নাওয়াখাওয়া-ঘুম-বিশ্রাম লাটে তুলে আন্দোলন-শ্লোগানে দেশ গরম করে ফেলেছে। তারা বায়না ধরেছে, চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দিতে হবে। জামায়াত-শিবির হচ্ছে ঘাতক-দালাল-রাজাকার, দেশবিরোধী অপশক্তি। তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। এই দাবিতে তারা এতটাই অটল এবং অনড় যে, কিছুতেই তাদের কাবু করা যাচ্ছে না। রোদ-বৃষ্টি কিছুই তাদের দমাতে পারছে না। প্রতিপক্ষরা এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতদের নামে নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। আন্দোলনকারীরা ইসলামবিরোধী, ওরা মদ-গাঁজা খায়, একে অপরকে ধর্ষণ করে—এমনি নানা কুত্সা-রটনা ইন্টারনেটে, ওদের পক্ষের পত্রপত্রিকায় প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে দিচ্ছে। হাইকোর্টের এক বিচারপতিও এই অপপ্রচারে শরীক হয়েছেন (যদিও জামায়াত-বিএনপির পক্ষে ভূমিকা পালন করতে গিয়ে এই বিচারপতি মহোদয় বিপদে পড়ে গেছেন। এই বিচারপতির বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে অভিযোগ গঠনের জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে বলা হবে বলে সংসদকে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী)। এতকিছুর পরও এই আন্দোলন একটুও দুর্বল করা যাচ্ছে না এবং আন্দোলনকারীদেরও টলানো যাচ্ছে না। ওরা ‘রাজাকারের ফাঁসি চাই’ এই ‘মাতম’ চালিয়েই যাচ্ছে। ঢাকা শহরের মানুষগুলোরও খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই। দলে দলে গিয়ে তারা ভিড় করছেন শাহবাগে। গলা মেলাচ্ছেন, গলা ফাটাচ্ছেন। তরিকুল ইসলাম শান্ত নামের এক যুবক তো উত্তেজনা আর ভাবাবেগের চাপ সামলাতে না পেরে মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করে বসলেন। এমন বেহাল পরিস্থিতিতে সবাই আছেন টেনশানে। কখন কী হয়—এই আশঙ্কায় সবাই টিভির সামনে বসে থাকছেন। রাজাকারের ফাঁসির দাবিতে অবিরাম উচ্চারিত শ্লোগানেও বুঝি কী এক জাদু আছে! সংবাদকর্মীরাও এই সুরে সুর মেলাচ্ছেন। এখন আন্দোলনকর্মীদের সঙ্গে সংবাদকর্মীদের পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দর্শকরাও এই গড্ডলপ্রবাহে গা ভাসিয়েছেন। রেডিও-টিভিতে তারা শাহবাগের শ্লোগান ছাড়া অন্য কিছু দেখতে বা শুনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। জাতীয় অধঃপতন বুঝি একেই বলে! শাহবাগে লাগাতার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণ-তরুণীদের মা-বাবারাও এখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন। এরা ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে যদি কোনোদিন ঘরে ফিরে আসে। এই ‘ঘাড়ত্যাড়া’ তরুণদের কেউ কিছুতেই বাগে আনতে পারছে না। মৃত্যু-হুমকিও না। এদেরই একজন সহযোদ্ধা রাজীব হয়দারকে নির্মম-নৃশংসভাবে কুপিয়ে-কলা কেটে হত্যা করল ঘাতকদের দোসর—অন্ধকারের অপশক্তিরা। কিন্তু তারপরও এরা নির্বিকার। মৃত্যুকেও এরা ভয় পায় না। এমন অদ্ভুত ‘গোঁয়ার-প্রজন্মকে’ এখন তাই সবাই ভয় পেতে শুরু করেছে। শাসক দলের নেতাকর্মীরা তো মান-অপমান-অহমিকাবোধ তুচ্ছ করে নিয়মিত শাহবাগ-আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। মাটিতে বসে শ্লোগান ধরছেন। হাসি হাসি মুখে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন। অন্যসব শ্রেণিপেশার মানুষরাও এখন দলে দলে গিয়ে এই ক্ষ্যাপাটে তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানাচ্ছেন। এই আন্দোলন সবচেয়ে বেশি সংকটে ফেলেছে বিএনপির নেতাদের। তারা পড়েছেন মহাফাঁপরে। তারা সরাসরি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতাও জানাতে পারছেন না। আবার এই আন্দোলনের মহাজাগরণের ঢেউ থেকে নিজেদের দূরেও সরিয়ে রাখতে পারছেন না। পারবেন কেমন করে? নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যে দলেরও তোয়াক্কা করছে না। পাছে অনুমতি ছাড়াই যদি তলে তলে গিয়ে এই ‘শাহবাগ-হুজুগে’ নাম লেখায়—তাহলে যে আম-ছালা, বিরানি-ঢেকুর সবই যাবে! ওই ‘উড়নচণ্ডি, অকালকুষ্মাণ্ডদের দল’ গোঁ ধরেছে, রাজাকারের ফাঁসি না হলে ঘরে ফিরবে না। এই ‘একরোখা বাঁদরদের’ সমীহ করে না চললে কী আর উপায় আছে? আপাতত ওরা মোমবাতি জ্বালানো শুরু করেছে, এরপর যদি মশাল, তারপর বাড়িঘর জ্বালানো শুরু করে? তিন মিনিট নীরব থাকার কর্মসূচিতেই তো কেমন অসহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, যদি ওরা তিন ঘণ্টা, কিংবা তিন দিন অথবা তিন বছর গর্জন করার কর্মসূচি নেয়, তাহলে কী হবে? তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে কে সামাল দেবে? কে দেবে আশা? কে যোগাবে ভরসা? এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলনকে সমর্থন না দিলে একঘরে হয়ে পড়ার আশংকা, অন্যদিকে জামায়াতের মত ‘একান্ত স্বজন’কে বিসর্জন দিতে না-পারার কষ্ট—বিএনপি নেতাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। ‘বন্ধন’ তো আর সহজে ত্যাগ করা যায় না। আর যদি সেই বন্ধন হয় ‘নাড়ির’—তাহলে তা ত্যাগ করা তো আরও কঠিন। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক হচ্ছে অন্তরের, প্রাণের। তাদের জন্ম হয়তো আলাদা, কিন্তু একই জলহাওয়ায় থাকতে থাকতে, এক সঙ্গে চলতে চলতে, একই ভাষায় একই সুরে কথা বলতে বলতে ‘আত্মার আত্মীয়’ বনে গেছে। বিশ্বাস, আচরণ, আদর্শ কোনো কিছুতেই এখন আর তাদের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। জামায়াত এবং বিএনপি যেন তামাক আর ফিল্টার, দুজনে দুজনার। এই সম্পর্ক ছিন্ন করা সত্যিই কঠিন। তাইতো বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ মনের দুঃখে একবার বলছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে ১৮ দলীয় জোট ভাঙ্গার চেষ্টা চলছে। আবার কোনো কোনো নেতা একথাও বলছেন যে, আগামীতে ক্ষমতায় গেলে তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে (সবাই যাদের যুদ্ধাপরাধী মনে করে, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত, তাদের সঙ্গে নিয়ে বিএনপি তা হলে কোন যুদ্ধাপরাধের বিচার করবে? বিএনপির কাছে যুদ্ধ আসলে কোনটা? যুদ্ধাপরাধীইবা কারা? মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভূমিকা পালনকারীরা?)! কী আচানক কথা! আসলে চরম সংকটের সময় মানুষের মাথা খারাপ হয়ে যায়। তারা উল্টাপাল্টা কথা বলে, অসংলগ্ন বাক্য রচনা করে। আপাতত বিএনপি নেতাদের ‘বায়ুচড়া’ রোগে পেয়েছে যেন। তারা যে যার মত কথা বলছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তা পরস্পরবিরোধী হয়ে যাচ্ছে। বিএনপির নেতাদের জীবনে এমন দুর্যোগ অতীতে কখনও এসেছে বলে মনে হয় না। বিএনপি হচ্ছে ‘আপোষহীন নেত্রীর’ নেতৃত্বে গড়ে উঠা এক ‘আপোষহীন দল’। তারা হয় কোনো ইস্যুর পক্ষে, না হয় বিপক্ষে। আমাদের দেশের কিছু কিছু বুদ্ধিজীবীর মত—‘হলে হতে পারে, নাও হতে পারে’ মার্কা ঝুলন্ত অবস্থানের দল বিএনপি নয়। কিন্তু এই ইস্পাতকঠিন সোজা দলটির নেতাদের কথা এখন কেমন জিলাপির মত প্যাঁচানো হয়ে গেছে। তারা অনেকে মিলে অনেক কথা বলছেন, কিন্তু কিছুই বোঝাতে পারছেন না। তারা অনেক কথা বলছেন, কিন্তু একটিও বাক্যও রচনা করতেন পারছেন না (ছোটকালে ব্যাকরণ বইয়ে পড়া বাক্যের সংজ্ঞা মতে, অর্থবোধক শব্দ বা শব্দসমষ্টিকে বাক্য বলা হয়, বিএনপি নেতাদের উচ্চারিত শব্দগুলো অর্থবোধক হচ্ছে না)। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সমাবেশে বলেছেন, আদালতের এই রায় (কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড) জনগণ মেনে না নেয়ায় সরকারের উচিত পদত্যাগ করা। অন্য এক সমাবেশে তিনি বলেছেন, শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলন এই সরকারের প্রতি অনাস্থা। অন্য অরেক সমাবেশে তিনি বলেছেন, এই আন্দোলন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন। ব্যারিস্টার মওদুদ এবং জয়নাল আবেদীন ফারুক এমপি প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনকে ‘সাজানো নাটক’ বলছেন, আবার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে দেশে গৃহযুদ্ধ হবে বলে হুমকি দিয়ে শাহবাগ আন্দোলন বন্ধ করতে বলছেন। বিএনপির আরেক নেতা হান্নান শাহ ক্রমাগত বলে চলেছেন, শাহবাগের আন্দোলন সব নাটক। ঢাকা মহানগর বিএনপির আহবায়ক ও সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা শাহবাগে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, জনগণের মধ্যে আবেগ কাজ করছে। এই আবেগকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই। এদিকে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, বলেছেন, শাহবাগ আন্দোলন যেন সরকারি দল দখল করে নিতে না পারে সে ব্যাপারে তরুণদের সজাগ থাকতে হবে। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, তরুণ সমাজকে দলীয়করণের অপকৌশল সম্পর্কে সজাগ হতে হবে। জনগণের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা সৃষ্টি করতে হবে যে, শাহবাগের এই আন্দোলন দলমত নির্বিশেষে তরুণ সমাজের আন্দোলন। শাহবাগ চত্বরে সরকারের ভয়াবহ অপকীর্তিগুলো যুক্ত করে একটা সার্বজনীন আন্দোলনের সম্ভাবনাকে ব্যর্থ করতে ক্ষমতাসীন মহলের সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত সম্পর্কেও তরুণ-তরুণীদের সচেতন হতে হবে। শাহবাগের ‘তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন’ দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির বাঘা বাঘা নেতাদের মাথা খারাপ করে দিয়েছে। বিএনপি নেতাদের উচিত, এজন্য আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা। সুস্থ এবং স্বাভাবিক থাকা বা থাকতে পারা নিঃসন্দেহে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার। এই সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকার ক্ষেত্রে যদি কেউ ব্যাঘাত ঘটায়, মাথা নষ্ট করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে তবে অবশ্যই তার বিচার ও শাস্তির বিধান থাকা উচিত। দেশটা তো আর মগের মুল্লুক নয়। যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে ‘বেতাল আন্দোলন’ গড়ে তুলে দেশে এক অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হবে, এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ায় প্রধান বিরোধী দলের মাননীয় নেতানেত্রীদের মাথা বিগড়ে যাবে, তা হয় না, হতে পারে না। এটা নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত মামলা করার বিষয়টি বিএনপি নেতারা গভীরভাবে ভেবে দেখতে পারেন। লেখক : কলামিষ্ট