উন্নত জীবনধারার জন্য চাই পরিকল্পিত নগরায়ন

একবিংশ শতাব্দীতে উন্নত নগরায়ন মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে। জীবনযাত্রার অনিবার্য প্রয়োজনে মানুষ এখন নগরমুখী। সে কারণেই নগরায়নকে পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যকর ও সুষম হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বলা যায়, নগরজীবনকে স্বাচ্ছন্দ্য, পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও উন্নয়নমুখি করা এখন সময়ের দাবি। আসলে পরিকল্পিত নগর বলতে বুঝায় একটি পরিকল্পিত জনবসতি। যার সবকিছু হবে পরিকল্পনা অনুযায়ী। কোথায় স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল হবে, অফিস-আদালত কোথায়, কোথায় বসবাসের জায়গা সবকিছুই হবে পরিকল্পনামাফিক। পরিকল্পনামাফিক সবকিছু হলে প্রত্যেক নগরেই মানুষ শৃঙ্খলাপূর্ণ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। এতে তার নাগরিক জীবন হয় মর্যাদাপূর্ণ, গ্রাম কিংবা মফস্বলের তুলনায় উন্নততর, স্বস্তিদায়ক। কিন্তু এই নগরই আবার পরিকল্পনাহীনভাবে বেড়ে উঠলে তাতে নাগরিকদের জীবন অস্বস্তিকর হয়ে উঠে। জনজীবনকে তা বিপর্যস্ত করে ফেলে। মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ থাকে না। যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী বিশ্বের ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৯ নম্বরে। অর্থাত্ বসবাসের অনুপযোগী শহরের মধ্যে ঢাকার পরে মাত্র একটি শহরের স্থান। এই অবস্থা যে আমাদের জন্য গৌরবজনক নয় সেটি কি বলার অপেক্ষা রাখে? জরিপকারী ওই প্রতিষ্ঠানটি একটি শহরের বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এর মান নির্ণয় করে। এরমধ্যে রয়েছে—নগরীতে বসবাসের সুযোগ-সুবিধা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষা ব্যবস্থা, চিকিত্সা পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা, অপরাধের হার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, পরিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামোর গুণগতমান, পানি সরবরাহের মান, খাদ্য, পানীয়, ভোক্তাপণ্য এবং সেবা, সরকারি বাসগৃহের প্রাপ্যতা ইত্যাদি। এসব দিক থেকে আমাদের নগরগুলোর কী অবস্থা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এছাড়া ঢাকা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতিপূর্বে অন্য জরিপে প্রকাশ পেয়েছে, ঢাকা বিশ্বের দূষিত নগরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর করুণ অবস্থায়ই এই জরিপের সত্যতা প্রমাণে যথেষ্ট। এছাড়া যানজট, যানবাহন এবং কল-কারখানার কালো ধোঁয়া, টেনারি বর্জ্য, খাদ্যে ভেজাল, সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিম্নমানও ঢাকার জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অধিক জনসংখ্যার চাপে ন্যুব্জ এই শহরে নেই পয়ঃনিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা। জনসংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি-ঘোড়া। কিন্তু সে তুলনায় রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, গ্যাস, বিদ্যুত্, পানি ইত্যাদি নাগরিক সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। সবকিছুতেই পরিকল্পনাহীনতার ছাপ। অথচ রাজধানী ঢাকাই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। দেশের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাত্ প্রায় ৫ কোটি মানুষ এখন শহরে বাস করছে। এজন্য পরিকল্পিত নগরায়নের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা আবাসস্থল থেকে পরিণত হয়েছে বিরাট বাজারে। বস্তুত এই শহরের সুনির্দিষ্ট কোনো চরিত্র নেই। যত্রতত্র যে যেখানে পারছে যে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এতে নগরী তার বিশিষ্টতা হারাচ্ছে। এক জগাখিচুরি অবস্থায় রাজধানীবাসী এখানে বাস করছে। ফলে অনেক নাগরিক সুবিধা থেকেই তারা বঞ্চিত হচ্ছে। শিল্প-কারখানার দূষিত বর্জ্য পানিতে মিশেও ঢাকার পরিবেশকে করে তুলছে বিষাক্ত। বিশেষ করে ট্যানারি বর্জ্যের দূষণ নগরবাসীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার যেন কেউ নেই। হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প স্থানান্তরের জন্য হাইকোর্ট নির্দেশ দিলেও তা ১০ বছরেও কার্যকর হয়নি। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু হলেও হাজারীবাগে এখনও আড়াই শ’রও বেশি ট্যানারি রয়েছে। আর এই ট্যানারির তরল বিষাক্ত বর্জ্য স্থানীয় জলাশয় থেকে হাজারীবাগ খাল হয়ে পশ্চিমাঞ্চলীয় বাঁধের ভেতরের স্লুইসগেটসহ নানা পথে বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে মেশে। ট্যানারির বর্জ্য অত্যন্ত বিষাক্ত। এই বর্জ্য পানিতে মিশলে তা দেখে মনে হবে রং মেশানো পানির মতো। আর এই রঙিন পানিই দিনের পর দিন নদীতে গিয়ে পড়ে নদীর পানিকে কী পরিমাণ দূষিত করছে তা সহজেই অনুমেয়। হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প সরিয়ে নেয়ার জন্য পরিবেশবাদী সংগঠনসহ বিভিন্ন মহল থেকেই জোর দাবি রয়েছে দীর্ঘদিনের। এমনকি হাইকোর্টও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়। ১৯৯৪ সালে রাজধানীর পরিবেশ দূষণরোধে দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধের দাবিতে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা করা হয়। ওই মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০১ সালে ১৫ জুলাই হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ রায় প্রদান করেন। রায়ে পরিবেশ অধিদফতরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল—মারাত্মক দূষণকারী শিল্প কারখানা যেন এক বছরের মধ্যে সরিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, বিগত ১০ বছরেও ট্যানারি শিল্প সরিয়ে নেয়া হয়নি। ঢাকার অদূরে সাভারে এ শিল্প স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা খুব একটা এগোয়নি। বুড়িগঙ্গাকে বলা হয় ঢাকার প্রাণ। কিন্তু দখল দূষণে এই নদীর অবস্থা এখন বড়ই করুণ। বিশেষ করে ট্যানারির বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। যে পরিমাণ অক্সিজেন আছে তাতে জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। বুড়িগঙ্গা নদীকে বাঁচাতে হলে ট্যানারি শিল্পের বর্জ্য যাতে নদীতে আর না পড়তে পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি কারখানা সাভারে স্থানান্তরের কোন বিকল্প নেই। এ নিয়ে অনেক গড়িমসি হয়েছে, আর নয়। নগরজীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং গতিশীল করতে হলে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে পরিকল্পিত নগরায়নই হবে মুক্তির পথ। যেখানে থাকবে না যানজট, দখল, দূষণসহ নেতিবাচক যে কোনো কর্মকাণ্ড। মনে রাখতে হবে নাগরিক জীবনের সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা ব্যতিরেকে দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নও অসম্ভব। এ লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণই এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে সক্রিয় হবেন— এমনটিই প্রত্যাশা করি। লেখক ঃ সাংবাদিক Email : harun_press@yahoo.com