কেমন আছে এতিমখানার শিশুরা

দেশে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এতিমখানার সংখ্যা ৩ হাজার ৩৬৪টি। পক্ষান্তরে সরকারি এতিমখানার সংখ্যা মাত্র ৮৫টি। এই এতিমখানাগুলিকে বলা হইয়া থাকে শিশু পরিবার। এইসব শিশু পরিবারে আশ্রিত অসহায় শিশুর সংখ্যা মাত্র ৯ হাজার। ইহাতে প্রতীয়মান হয় যে, সারাদেশে যত সংখ্যক এতিম-অসহায় শিশু রহিয়াছে, তাহাদের বেশিরভাগই বেসরকারি এতিমখানায় লালিত-পালিত হইতেছে। সরকারি হিসাবে বেসরকারি এতিমখানা তিন সহস াধিক হইলেও প্রকৃতপক্ষে সংখ্যাটি যে আরও বেশি হইবে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। কেননা, বেসরকারি উদ্যোগে এমন আরও বহু এতিমখানা পরিচালিত হইতেছে, যেগুলি সরকারের খাতায় নিবন্ধিত নয়। এই ধরনের এতিমখানার উদ্যোক্তাগণ সরকারি সাহায্যের প্রত্যাশা করেন না বিধায় নিবন্ধিত হইবার প্রয়োজনও বোধ করেন না। প্রসঙ্গত, এই খানে উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় যে, সরকারি হিসাবে দেশে মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশই শিশু এবং তাহাদের শতকরা ৪০ ভাগই আবার হতদরিদ্র পরিবারের সদস্য। দরিদ্র শ্রেণীর শিশুদের সামান্য অংশই বিশেষ করিয়া পিতৃমাতৃহীন নিরালম্ব শিশুরাই এতিমখানায় আশ্রয় লাভ করিয়া থাকে। এতিমখানায় আশ্রিত সহায় সম্বলহীন শিশুদের সংখ্যা যে নেহায়েত্ কম নয়, তাহা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু এতিমখানার শিশুরা কেমন করিয়া বাড়িয়া উঠিতেছে, তাহারা কেমন আছে, সেই খবর রাখিবার ফুরসত্ আমাদের কমই হইয়া থাকে। এই অসহায় কোমলমতি শিশুদের তিনবেলা খাবারের সরকারি বরাদ্দের অংক দেখিয়াই অনুমান করা যায় যে, তাহারা ভাল নাই। তাহাদের তিন বেলা মানসম্মত খাবার জুটে বলিয়া মনে করিবার কোনোই কারণ নাই। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক রিপোর্ট হইতে জানা যায় যে, বেসরকারি এতিমখানায় বসবাসরত শিশুদের খাওয়া পরার জন্য দৈনিক মাথাপিছু সরকারি মঞ্জুরি মাত্র ৩৩ টাকা। পক্ষান্তরে সরকারি শিশু পরিবারের সদস্যদের জন্য মাথাপিছু বরাদ্দ দৈনিক ৬৬ টাকা। বেসরকারি এতিমখানার ১ জন শিশুর দৈনিক খাবার কি করিয়া ৩৩ টাকায় হইতে পারে, অতি বড় কৃপণের পক্ষেও সে হিসাব মিলান কঠিন। বর্তমান বাজারে তিন বেলা শুধু ডাল-ভাত কিংবা শাকান্ন খাইলেও তেত্রিশ টাকায় কোনো শিশুর খাবার হইবে না। পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার তো পরের কথা। সরকারি এতিমখানায় যে মাথাপিছু ৬৬ টাকা দেওয়া হইয়া থাকে, তাহাও যথেষ্ট বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে না। ৬৬ টাকা দিয়া একজন শিশুর তিন বেলা আহারের জন্য কী খাবার পাওয়া যাইতে পারে— তাহা কাহাকেও বুঝাইয়া বলিবার দরকার পড়ে না। এতিম শিশুদের জন্য বরাদ্দ এত কম কেন, এ রকম প্রশ্নের হাজির জবাবের অবশ্য অভাব নাই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব রিপোর্টারকে বলিয়াছেন, এখন তো মাথাপিছু বরাদ্দ বার্ষিক ১ হাজার টাকা করা হইয়াছে। আগে তো ইহা ছিলো মাত্র ৭ শত টাকা। অতীতে যুক্তিহীনভাবে কম বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে বলিয়া এখন যাহা দেওয়া হইতেছে, তাহাই যথেষ্ট হইয়া যাইতে পারে না। ইহা নিয়া আমরা আর কথা বাড়াইতে চাই না। এতিমখানায় আশ্রিত শিশুদের মোটামুটি পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবারের জন্য ন্যূনতম যে টাকা প্রয়োজন, তাহাই বরাদ্দ দেওয়া উচিত। সেই সঙ্গে আরেকটি কথা না বলিলেই নয়। বেসরকারি পর্যায়ে যেসব এতিমখানা রহিয়াছে, সে সবের প্রতিষ্ঠাতা-উদ্যোক্তাগণের উচিত নয় শুধু সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষায় বসিয়া থাকা। স্থানীয় দানশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিকট হইতেও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অনুদান সংগ্রহ করা যাইতে পারে। সচ্ছল-সামর্থ্যবানদেরও এই ব্যাপারে আগাইয়া আসা কর্তব্য। এতিম শিশুদের লালন-পালনের দায়িত্ব নিয়া তাহাদের ব্যাপারে উদাসীন থাকিবার কোনোই সুযোগ নাই।