নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হবে কি?

নারীর নিয়তি কী এটিই যে, সে সব সময় নির্যাতিত হবে? মুখ বুজে সহ্য করবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সব অন্যায়? প্রাচীন ও মধ্যযুগীয়দের মাঝে এমন মানসিকতা থাকলেও বর্তমানকালে সভ্যতার স্বর্ণশিখরাহোরীরাও কী সেরকম মানসিকতাই লালন করেন? যদি তাই না হবে, তাহলে ধারাবাহিকভাবে দ্রুততার সাথে নারী নির্যাতন বৃদ্ধির কী কারণ থাকতে পারে? মিডিয়ার কল্যাণে যখন নারী নির্যাতনের ঘটনা জানাজানি হয় তখন লোক দেখানো সামান্য প্রতিবাদ হয়। এক সময় তা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। সরকার ও তার আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনী তত্পর হয় ঘটনা কত দ্রুত ধামাচাপা দেয়া যায় তার জন্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলা না করে লোকলজ্জার ভয়ে গোপন রাখে নারীর ওপর চালানো লোমহর্ষক পাশবিক নির্যাতনের কথা। যদি কোনভাবে থানা পর্যন্ত ঘটনা চলে যায় তবে মামলা নেয়া তো দূরের কথা নারীকে হতে হয় আরেক দফা নির্যাতনের শিকার। সব অপরাধ যেন নির্যাতিতা নারীর? কেন সে ধর্ষিত হলো? দেশের প্রচলিত আইন, বিচার ব্যবস্থা আর আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনী নারী নির্যাতন বন্ধ করতে পারছে না কেন? সম্ভবত এখন পর্যন্ত কোন নারী নির্যাতনের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে না পারাটাই এ কাজে অপরাধীদের উত্সাহ যুগিয়ে থাকবে। এছাড়াও নারীর প্রতি পাশবিক সহিংসতা বৃদ্ধির কিছু প্রত্যক্ষ কারণও রয়েছে। প্রথমত: নিজস্ব জাতীয় সংস্কৃতি ও চেতনাকে বিসর্জন দেয়া। পহেলা বৈশাখ বাঙ্গালির প্রাণের উত্সব। সেখানে ঢোল আর বাঁশী একতারা-দোতারার সুর শোনা যায় না বললেই চলে। তার পরিবর্তে ওপেন কনসার্টে তরুণ-তরুণীদের দেয় সুড়সুড়ি। মেলায় যাইরে....বখাটে ছেলেদের ভিড়ে ললনাদের রেহায় নাইরে...এরকম একটি গান গাওয়ার সময় ২০১১ সালে ঢা.বি. টিএসসিতে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে প্রায় দুই ডজন নারী বখাটেদের কোপানলে পড়েন। দ্বিতীয়ত: ঢাকার প্রায় সব রাস্তার পাশে লাগানো অধিকাংশ অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বিলবোর্ড । যা এ দেশের সংস্কৃতির সাথে যায় না । যায় কি? একজন পত্রিকা সম্পাদককে তার এক বিদেশি বন্ধু নাকি জিজ্ঞাসা করেছিলেন বিমানবন্দর থেকে তোমার অফিস পর্যন্ত আসতে যে বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড দেখলাম তার সাথে তো তোমাদের সমাজের কোন মিল নেই? এত অসংগতি কেন? তৃতীয় যে কারণটি যৌন নির্যাতন বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ তা হলো হিন্দী সিনেমা, বিজ্ঞাপন ও টিভি সিরিয়াল। বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে সংঘটিত নারী নির্যাতনের ঘটনাবলীর সাথে ভারতীয় চলচ্চিত্রের হুবহু মিল একথাই প্রমাণ করে। চতুর্থ কারণ হলো অযাচিতভাবে বিজ্ঞাপন চিত্রে প্রায় নগ্নভাবে নারীকে উপস্থাপন। মোটর সাইকেল আর পুরুষের শেভিং ক্রিমের বিজ্ঞাপনে নগ্ন নারীর দেহবল্লরী প্রদর্শনের কোন কারণ থাকতে পারে কি? খোদ ভারতেই সেখানকার মিডিয়াগুলোর দাবি নারী নির্যাতন বৃদ্ধির মূল কারণ হিন্দী চলচ্চিত্রের আর অশ্লীল বিজ্ঞাপনের প্রভাব। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে ডি.জে পার্টির নাম শুনিনি কখনও। এতে সমাজের উচ্চবিত্তদের একচ্ছত্র অংশগ্রহণ থাকলেও তা ছিল অনেকটা সাধারণ সমাজ ও লোকচক্ষুর অন্তরালে। স্যাটেলাইট চ্যানেলের লাইভ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তা এখন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কুঁড়ে ঘরটিতেও পৌঁছে গেছে। আবার দৈনিক পত্রিকা পোস্টার, এমনকি বিলবোর্ডের মাধ্যমে এসব অপসংস্কৃতির প্রচারও চালানো হয়। এভাবে নানাবিধ উপায়ে আমাদের জননী, জায়া, ভগ্নি, কন্যাদের প্রতি আমাদের শেষ শ্রদ্ধাটুকুও কেড়ে নেয়ার বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। যদি নিজ রক্ত সম্পর্কীয় মহিলাদের প্রতিই শ্রদ্ধাবোধ কমতে থাকে তবে অন্যদের প্রতি কতটুকু শ্রদ্ধা প্রদর্শিত হবে তা বলাই বাহুল্য। সম্প্রতি বাসভর্তি যাত্রীদের সামনে কলকাতার কয়েক যুবক এক তরুণীকে গণধর্ষণ করে মুমূর্ষু অবস্থায় বাস থেকে ফেলে দেয়। যাত্রীরা এ দৃশ্য সিনেমা দেখার মতই দেখেছে। প্রতিবাদ করেনি কেউ। মূল্যবোধ কতটুকু নিচে নামলে এমন হতে পারে। এখনও বাংলাদেশের সমাজে যতটুকু মূল্যবোধ, মানবিকতাবোধ আছে তাকে রক্ষার কাজ করতে হবে সর্বাগ্রে। ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হলে এর বিকল্প নেই। সেজন্য চাই কার্যকর উদ্যোগ। ক্যান্সারের কোষের সামান্যতম অংশও যদি রয়ে যায় তবে ক্যান্সার যেমন ভাল হয় না, তেমনি নারীর ওপর ক্রমবর্ধিষ্ণু নির্যাতন বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ কারণ দূর না করে অন্য যত কিছুই করা হোক তা কাজে আসবে না। আইন নতুন করে তৈরি করার চেয়ে বেশি দরকার বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ। ঘন ঘন নারী নীতি তৈরি করার চেয়ে সমাজ, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের আলোকে সুদূর প্রসারী জাতীয় দলিল প্রণয়ন আবশ্যক। ভিনদেশী সংস্কৃতির মোকাবেলায় আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির নির্ভেজাল বিকাশ, চর্চা এবং লালন ও রক্ষণই হতে পারে নারী নির্যাতন বন্ধের কার্যকর উপায়। সুতরাং এ মুহূর্তে যুগপত্ভাবে চালিয়ে যেতে হবে দুটো আন্দোলন। এক. নিজস্ব জাতীয় সংস্কৃতি রক্ষার আন্দোলন দুই. নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। প্রথমটি সফল হলে দ্বিতীয়টির সফলতাও অবশ্যম্ভাবী। লেখক :এমএসএস (রাষ্ট্র্রবিজ্ঞান), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় rakibulislambd11@gmail.com