প্র জ ন্ম আ ই ক ন
একজন নকশাকার
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:২৭
শিল্পচর্চার নানা মাধ্যমের মধ্যে গ্রাফিক্স ডিজাইন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সৃজনশীল কাজের ব্যাপকতার সাথে সাথে ডিজাইন ওয়ার্ল্ডে গ্রাফিক্স ডিজাইন একটি বিশাল জায়গাজুড়ে আছে বর্তমান বিশ্বে। শিল্পচর্চার এ মাধ্যমে বিশ্ব গ্রাফিক্স ডিজাইনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশও বর্তমানে এগিয়ে যাচ্ছে প্রায় সমানতালে। বাংলাদেশের অনেক গ্রাফিক্স ডিজাইনার বর্তমানে তাদের মেধার স্বাক্ষর রেখে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করছে তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে। এদের একজন হলেন এসএম মিজানুর রহমান মাসুম। আমাদের আজকের আয়োজনে তিনি জানিয়েছেন এই প্রজন্ম নিয়ে তার নানাবিধ ভাবনাগুলো। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন মোহাম্মদ মোর্শেদ নাসের
ড্রয়িং কিংবা গ্রাফিক্সের প্রতি আপনার আগ্রহ জন্মাল কীভাবে?
আসলে এই মাধ্যমে আসার ইচ্ছেটা কীভাবে জন্ম নিল সেটা আমি নিজেও জানি না। কারণ আমি ছোটবেলা থেকেই দেখেছি আমার আগ্রহ এই দিকেই। পত্রিকাতে যখন সিনেমার বিজ্ঞাপনগুলো দেখতাম, সেগুলো আমাকে আকৃষ্ট করত। ঝন্টু আর্ট বা শিবেন যারা এই কাজগুলো করত, তাদের কাজগুলো আমি নিবিড় যত্ন নিয়ে দেখতাম। বলা যায়, জন্মের পর থেকে যখন বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই এর প্রতি একটা আলাদা আকর্ষণ আমাকে অজান্তেই টেনে নিয়ে যেত এর দিকে। এর পেছনে কোনো কারণও আমি খুঁজে বের করতে পারব না, এমনকি ভালোলাগার পেছনে কোনো যুক্তিও দাঁড় করাতে পারব না। কারণ, তখন আমি কোনোভাবেই চিন্তা করিনি একটা সময় এই শিল্পটাই আমার জীবনের পেশা হয়ে উঠবে। অন্যান্য ছেলেমেয়েরা যখন খেলাধুলা কিংবা অন্য কিছু নিয়ে মাঠে পড়ে থাকত, তখন আমি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে এসব ডিজাইনগুলো দেখতাম এবং এগুলোকে আমি কপি করতাম। আমাদের বেড়ে উঠার সময়, মফস্বলে এই ব্যাপারগুলো জানার বা শেখার তেমন কোনো সুযোগ ছিল না। কোনো আর্ট স্কুল ছিল না তখন, যেখানে গিয়ে আমরা এ সম্পর্কে এতটুকু ধারণা লাভ করব। তাই ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও সাধারণ স্কুলগুলোতেই আমাদেরকে পড়তে হতো। আর আমরাও তাই করতাম। কিন্তু ভালোবাসার পরিপূর্ণ তৃপ্তি আনতে তখন বাইরে যা দেখতাম তা ঘরে এসে কপি করার চেষ্টা করতাম। ওই সময় ছাত্র ইউনিয়ন বেশকিছু কাজ করত আমাদের এলাকাতে। তারা বিভিন্ন আর্ট কম্পিটিশনের ব্যবস্থা করত মাঝে মাঝে। তারই সুবাদে কিছু পত্র-পত্রিকা আসত আমাদের এলাকাতে। সেগুলো দেখে দেখেও নানা রকম আর্টের প্রতি ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করতাম। সে সময়টাতে এসব কম্পিটিশনে অংশগ্রহণ করতাম। তাই এ মাধ্যমে আসার ক্ষেত্রে কোনো আগাম পরিকল্পনা ছিল না বলা যায়। এটা আপনাআপনি মন থেকে হয়ে গেছে।
অনেকেই বলে ছোটবেলা থেকে যাদের একটু আঁকাআঁকি করার অভ্যাস থাকে বা একটু হাতের লেখা ভালো হয়, তারা ডিজাইনের এই পেশার প্রতি আকৃষ্ট হয় বা এই লাইনে সাফল্য পেয়ে থাকে। এই কথার যথার্থতা আপনার কাছে কী রকম মনে হয়?
এটা তো খানিকটা সত্য বলেই আমার কাছে মনে হয়। তবে আমি মনে করি যে, সৃষ্টিশীলতার এটা একটা পার্ট। সৃষ্টিশীল মানুষরা তো সব পেশাতেই আছে। শুধু এই পেশাতে নয়, তাদেরকে নানা পেশাতেই দেখা যায়। একজন লেখক হয়তো সেই সময় তার মেধা সম্পর্কে কিছুই বুঝতে পারে না। আরও একটু পড়ালেখা এবং লেখালেখির পর বুঝতে পারে তার অবস্থা কী রকম হবে বা সে এই পেশাতে কতটা সফলতা পাবে। কিন্তু ভিজ্যুয়াল আর্ট নিয়ে যারা কাজ করে তাদের এই আঁকাআঁকির মধ্যেই প্রকৃতিগতভাবে প্রকাশ পায় এই পেশাতে তাদের ভবিষ্যতের দৈর্ঘ্যটা। আর যদি জন্মগতভাবে সৃষ্টিশীলতার কথা বলা হয় তাহলে আমি বলব, আমাদের দেশেও অনেক সৃষ্টিশীলতাসম্পন্ন লোক জন্ম নিচ্ছে। এমন মানুষ জন্ম নিচ্ছে আমেরিকা, কানাডা কিংবা অন্যান্য উন্নত দেশগুলোতেও। কিন্তু মূল বিষয়টা হচ্ছে চর্চার ক্ষেত্র। আমাদের এখানে সত্তর-আশির দশকে সেই সুযোগটা তৈরি হয়নি। আমাদের দেশে এই কাজের কেমন সম্ভাবনা রয়েছে বলে আপনার মনে হয়?
আসলে ডিজাইনের নানা ক্ষেত্রে আমাদের কাজ করার দারুণ সুযোগ রয়েছে। আমাদের দেশেও কাজ করার জন্য অনেক ক্রিয়েটিভ লোক রয়েছে। কিছুটা পরিবর্তনও হয়েছে। আগে কাজ করার সেই ক্ষেত্র ছিল না, তাই আমরা কাজ করতে পারতাম না। তবে এখন আমাদের অর্থনীতি অনেক ভালো হয়েছে। ভেবে দেখুন, ভারতের আইপিএল দেখে আমরা বিপিএল করছি। তাদের কাছাকাছি যাওয়ার একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই ডিজাইনের দ্বারও উন্মুক্ত হয়েছে। আর আমাদের ক্লায়েন্টদের আসলে সচেতনতা অতটা নয়, সেই দিক দিয়ে ভাবলেও অনেক স্বাধীনভাবে কাজ করা যায়।
আমাদের দেশীয় পর্যায়ে ব্র্যান্ডিংয়ের কী অবস্থা?
আমাদের সরকারি পর্যায়েও এখন কাজ করা হচ্ছে, যেমন বিউটফুল বাংলাদেশ-এর কথা ভাবুন, লোগোটা কিন্তু অতটা সন্তোষজনক হয়নি। তেমনি আমরা যদি এই মাধ্যমে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে চাই, তাহলে তাতে সবকিছু সংযুক্ত করতে হবে। সরকারি ওয়েবসাইটগুলোও দিনকে দিন থেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। আমরা মানুষকে আমন্ত্রণ জানাব এ দেশে আসার জন্য, কিন্তু তার আগে বুঝতে হবে, কেন তারা আসবে? কী দেখবে? কী আমাদের ঐতিহ্য? যা আছে সেটাই তো ঠিকমতো তুলে ধরতে হবে। আর এ জন্যই মনে হয় অনেক কাজের সুযোগ রয়েছে আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপট থেকেও।
আপনি এখন নিজেই স্বাধীন সত্তায় কাজ করা শুরু করছেন? এই দিকটাকে কীভাবে দেখেন?
আসলে একা কাজ করার মাঝে অনেক স্বাধীনতা রয়েছে। সত্তাকে বিকিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই এখানে। যখন একটা প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করতে যাই, তখন সবার মতামত শুনতে হয়, সেই মাফিকই কিন্তু কাজ করতে হয়। এখানে যেটা বড় কাজ, সেটা হলো, নিজের ভাবনাটা অন্যকে বুঝাতে পারতে হবে।
প্রথমেই কি স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করতে হবে? না কি অভিজ্ঞতা অর্জন করে আসা উচিত?
আসলে ক্রিয়েটিভ ক্ষেত্রে নিজেই কিছু করার জন্য অনেক সময়ের দরকার হয়। তাই প্রথমেই প্রয়োজন পড়ে কাজটা করার দক্ষতায় নিজেকে নিয়ে যেতে পারলাম কি না তা বিবেচনা করা? আমি অন্যের কাছে কিছুদিন কাজ করে দেখতেই পারি। সেটা আমার যোগ্যতা যাচাই করে নেওয়ার জন্য। বিষয়টা আসলে আপেক্ষিক। যেমন এখন চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে মঞ্চেও তরুণরা নির্দেশনা দিচ্ছে। তারা কী অনেক বছর কাজ করে এসেছে অন্যের সাথে? হয়তো নয়। তবুও তাদের যোগ্যতা আছে, আর সেই সাথে তারা অনেক ভালো কাজ আগ্রহ নিয়েই অবলোকন করছে। অনেক অনেক আগে কিন্তু তেমন ছিল না। আমাদের সময়ে ডাক্তারী-ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া কেউ কিছু পড়ার কথা ভাবত না। এই প্রজন্মের অনেক সৌভাগ্য তাদের অনেক কিছুকেই পেশা হিসেবে নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। ভেবে দেখুন, সেই সময়ে পত্রিকাও সাদাকালো ছিল, একটা বিজ্ঞাপন দেওয়ারও সুযোগ ছিল না রঙিন করে। আর আমার তৃষ্ণা যে দিকে থাকবে, আমি তো সেই দিক খুঁজে বের করবই। ধরে নিন, বইয়ের কভার। আবার আগে যেমন ইন্টেরিয়র নিয়েও অনেক কাজের আগ্রহ ছিল। সময়ের অভাবে সব করতে পারিনি, তবে যখন যেটা করতে গিয়েছি, সাধ্যমতো করার চেষ্টা করেছি। আর একটা কথা বলাই লাগে, নিজের পছন্দের দিকেই নিজেকে ধাবিত করতে হবে।
আপনার নিজের ডিজাইন হাউজের কাজের কথা বলুন? কী রকম স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছেন আপনি?
আসলে এই জগতে কাজের সুযোগ তো অনেক। আমি আর্কিটেকচার, ইন্টেরিয়র, গ্রাফিক্সসহ সব ধরনের কাজ করতে চাই। আর আমাদের কাজটাও হতে হবে সব ধরনের গ্রাহকদের জন্য। আমরা চাইব, সরকারও তাদের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারবে। এ ছাড়া দেশীয় অনেক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন ঘটাতে চাই আমরা এ শিল্প দিয়ে।
ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু