স্মরণ

বিয়োগান্তক সেই ২৫ ফেব্রুয়ারি

আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি তোমাকে স্মরণ করি, স্মরণ করি আমাদের ৫৭ বীর সেনা কর্মকর্তাসহ সব শহীদকে। তোমরা শহীদ হয়েছো চারটি বছর পার হয়ে গেছে। দাদা, আমি জানি, আমরা এই পৃথিবীতে তোমাকে আর কথা বলতে শুনবো না। নিয়তির নির্ধারিত ঐ দিনে তোমার মনে কী ভাবনা এসেছিলো? তুমি কি সূর্যাস্ত, পাখির কলতান অথবা কোনো নৈঃশব্দ্য অনুভব করেছিলে কিংবা কাপুরুষের গুলি ও বিস্ফোরণে বিচলিত হয়েছিলে যার ধারাক্রমে প্রিয় মাতৃভূমির ৫৭ জন বীর সেনানীকে হারিয়েছি আমরা। কোন ভাবনাগুলো তোমাকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছিলো? তুমি কি তোমার প্রিয় স্ত্রী, সন্তান ও ভাই-বোনদের সাথে কথা বলতে চেয়েছিলে? তুমি কি জানতে পেরেছিলে যে তোমার একটি সন্তান খুব কাছেই প্রাণ ভয়ে লুকিয়েছিলো? তুমি জানতে যে তোমার স্ত্রী পিলখানার ভেতরেই লুকিয়ে আর কন্যা স্কুলে? শেষ কি কথা বলতে চেয়েছিলে তুমি? সম্পূর্ণ অস্ত্র সজ্জিত কাপুরুষোচিত বিশ্বাস ঘাতকদের মাঝে নিরস্ত্র অবস্থায় তুমি ঝুঁকি নিয়েছিলে, সেনাপতির নির্দেশে নিয়তির পথে পা বাড়িয়েছিলে, একজন আদর্শ সৈনিকের যা পরম আরাধ্য। বিজয়ী কিংবা শহীদ হবার অঙ্গীকারে অবিচল থেকেছো তুমি। আমরা গর্বিত তোমার জন্য। আজ, দেশ থেকে অনেক দূরে আমি, আমার টেবিলে তোমার ছবি রেখেছি। ছবিতে তোমাকে সামরিক পোষাকে দেখা যাচ্ছে, তোমার টুপি মাথার বামদিকে হালকা বাঁকানো যার মাঝে রয়েছে জাতিসংঘের প্রতীক চিহ্ন। ছবিটি জর্জিয়াতে তোমার সেনাপতিত্বের একটি মুহূর্ত। অন্য একটি ছবিতে তোমাকে একজন গলফ খেলোয়াড় হিসেবে দেখা যাচ্ছে। তুমি একজন ভাল বিতার্কিক ছিলে। তোমার আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি উজ্জীবিত করতো শ্রোতাদের। সেই প্রাণশক্তি আজও আমাকে শক্তি দেয় সামনে এগিয়ে যেতে। দাদা সেদিনের কথা আজো মনে আছে। আমি অর্বাচীনের মতো তোমার সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হয়েছিলাম। বড় ভাই হয়েও তুমি ক্রুদ্ধ হওনি বরং স্বভাব সুলভ সংযম প্রদর্শন করেছিলে। সুস্পষ্ট আত্মবিশ্বাসের সাথেই তুমি বলেছিলে, মর্যাদাপূর্ণ জীবন ও নীতির সাথে আপোষ করে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। তোমার দৃঢ়তা ও নৈতিক অবস্থানের সেই উপাখ্যান আমার জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে সারা জীবন। তোমাকে ভাই হিসেবে পেয়ে আমি গর্বিত। দাদা, আমাদের প্রিয় কর্নেল মুজিব, তোমার প্রশান্ত, নিষ্প্রাণ মুখ সর্বশেষ দেখেছি সিএমএইচ-এর হিমঘরে। আমি তোমার দৃঢ় ও তেজদীপ্ত মুখকে স্মরণ করতে পারছি যা মাত্র ১ দিন আগের বিডিআরের বার্ষিক প্যারেডে অভিবাদন দেয়া অবস্থায় দেখেছি। যে প্রাণহীন মুখ আমি দেখেছি হিমঘরে তা ছিল বিনয় ও নম্রতার প্রতীক। তোমার এমন নির্মম প্রস্থানের পরও তোমার চেহারায় শহীদের দীপ্তি ছিল যা একজন সত্যিকার সৈনিকের, একজন দেশপ্রেমিকের দৃঢ় অনুভূতি ও দেশের মানুষের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধার বলিষ্ঠ প্রকাশ। দাদা তুমি বড় বড় স্বপ্ন দেখতে বলতে, স্বদেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে কষ্ট হতো আমার, কারণটাও তোমার জানা ছিলো। তোমার মাতৃভূমিতে মানুষ এখনো নির্মমভাবে, অর্থহীনভাবে ও অকালে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করে। সেদিন বিশ্বজিতকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করা হলো, ১০০ জনেরও অধিক গার্মেন্টস শ্রমিক আগুনে পুড়ে ছাইয়ে পরিণত হলো, এখনো রাজীবদের মুক্তবুদ্ধি চর্চার জন্য, মুক্ত চিন্তার জন্য প্রাণ দিতে হয়। তোমার আশাবাদী কথায় তুমি যে আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে তা তথাকথিত গণতন্ত্রের রক্ষাকারীদের আচরণ, আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কায়েমী স্বার্থের দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের গঠনমূলক আশাবাদসমৃদ্ধ কথা না বলার চর্চা জাতির জন্য কোনো আশার সঞ্চার করে না। এমন নিরাশার মাঝেও আমি আশার আলো দেখি, আমাদের তরুণদের জাগরণ দেখি। এই মুহূর্তের বাংলাদেশের প্রচ্ছদ, শাহবাগে তারুণ্যের জয়গানে আমি আশাবাদী হই। স্বপ্নের বীজ বুনি বাংলার মাটিতে। আমি বিশ্বাস করি, আশা করি ও প্রার্থনা করি যে, বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি খুব শিঘ্র একদিন তার অচলায়তন থেকে বেরিয়ে সম্ভাবনা সংস্কৃতি গ্রহণ করবে। আমাদের তারুণ্য শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের দেশপ্রেমের চেতনা ও আদর্শে আশীর্বাদপুষ্ট। আমি জানি যুবসমাজ বিশ্বাসঘাতক চক্র এবং তাদের গোলামদের সম্পর্কে সচেতন রয়েছেন এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। এই তারুণ্য আমাদের দেশকে এমন একটি দেশে পরিণত করবেন যেখানে সবাই মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে বাঁচতে পারবে। প্রিয় দাদা এবং শহীদ ভাইয়েরা তোমরা চিরস্মরণীয় হয়ে আছো। আমাদের যুব সম্প্রদায় তোমাদের সাহসিকতা প্রত্যক্ষ করেছে এবং তারা গর্ব বোধ করে যে, জাতি তোমাদের মতো সাহসী সন্তানদের জন্ম দিয়েছিলো। তারা তোমাদের প্রত্যয়ের প্রশংসা করেছে। তোমাদের কাছে এই প্রজন্মের যে ঋণ এবং জাতির কাছে তাদের যে অঙ্গীকার সে সম্পর্কে ওরা সজাগ রয়েছে। আমাদের তারুণ্য মাতৃভূমির রং লাল-সবুজকে ধারণ করছে হূদয়ে। আমি তোমাদের নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, এই প্রজন্ম সবকিছু প্রত্যক্ষ করছে এবং তারা তোমাদের নিরাশ করবে না। তোমরা নিশ্চিন্ত থাকো যে, তোমাদের অনুসরণীয় নিঃস্বার্থ সাহসিকতা ও সম্মানের উত্তরাধিকার রেখে গেছো তোমরা। প্রিয় শহীদ ভাইয়েরা, তোমাদের উত্তরাধিকার সজাগ রয়েছে এই বাংলায়। এই প্রজন্মের রক্তে প্রবাহিত হচ্ছে একই রক্ত যা প্রবাহমান ছিল তোমাদের ধমনীতে। এবার ওদের জাগরণ জাগাবে সবাইকে, ওরা ছেড়ে যাবে না শাহবাগ, নিশ্চুপ থাকবে না এবার, স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়বেই ওরা। আজ শহীদসেনা দিবসে আমরা তোমাদের সকলকে আমাদের চোখের জলে, অন্তরের কৃতজ্ঞতায় ও হূদয়ের গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করি। তোমরা সবাই শান্তিতে ঘুমাও। লেখক :সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা emam85@hotmail.com