বন্ধু হয়ে উঠুন

কী জামা পরব, কোন খাবার খাওয়া উচিত, কোথায় যাব, কার সাথে মিশব—এ রকম হাজারো বিষয়ে যাদের নজরদারি তাদের কি বন্ধু ভাবা যায়? আসলে বাবা-মায়ের এই খবরদারির পেছনে থাকে ভালোবাসার উত্কণ্ঠা। এটা ঠিক যে, টিনএজ বয়সে ছেলেমেয়েরা আনন্দ করতে চাইবে। জীবনের মূলমন্ত্রই তখন সব ভুলে আনন্দে মাতোয়ারা হওয়া—আড্ডা, সিনেমা, আজ এই বন্ধুর বাড়িতে নিমন্ত্রণ তো কাল অন্য বন্ধুর বাড়িতে পার্টি। এর মাঝে সবার আড়ালে বিশেষ কারও সাথে ঘুরতে যাওয়া। তাই স্বাভাবিকভাবেই বাবা-মায়ের মন সব সময় অশান্তিতে ভোগে এই বয়সী ছেলেমেয়েদের নিয়ে—এই বুঝি ছেলেমেয়েরা হাতের বাইরে বেরিয়ে গেল! আর এ জন্য আরও বেশি করে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ফেলেন। সব মিলিয়ে পুরো অবস্থাটাই হয়ে পরে গোলমেলে। তাই সব কিছুকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রথমেই দরকার টিনএজ সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ। এ নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ছে সাকিবা। জানাল, টিনএজের এ সময়টাকে বৈচিত্র্যময়ভাবে উপভোগ করছে সে। যদিও এ বয়সে নানা রকম সমস্যারও উদ্রেক হয়। কিন্তু সম্পূর্ণ আধুনিক ও প্রগতিশীল একটি পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে সবকিছু সামলে নিতে তার কোনো অসুবিধাই হচ্ছে না। বাবা-মা তো বটেই, কাছের আত্মীয়স্বজনও নানাভাবে সহযোগিতা করছে তাকে। তার চলাফেরা-কথাবার্তা কেমন হওয়া উচিত তা খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলছে সবাই। তাই সেসব উপদেশ সে সাদরে গ্রহণ করছে, সেভাবেই চলছে। তবে বান্ধবীদের ক্ষেত্রে প্রায়ই সে কিছু কিছু সমস্যা দেখে আসছে। যেমন—কোনো ছেলে যদি তার কোনো বান্ধবীকে অনবরত ফোন করতে থাকে ও প্রেমের প্রস্তাব দেয় আর বিষয়টি যদি কোনোক্রমে মেয়েটির বাবা-মা জেনে যায় তখন মেয়েটির ওপর জাহির হয় নানা নিষেধাজ্ঞা। পরিণতিতে মেয়েটি হয়ে ওঠে বেপরোয়া। এই প্রেক্ষিতে সাকিবা বলেন, ‘আসলে আমার উপলব্ধিতে এ বয়সে বাবা-মা যদি খোলামেলা ভাবে তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আলোচনা করে তাকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলেন তাহলে তা ছেলেটি বা মেয়েটির জন্য অনেক হিতকর হবে।’ সাকিবার মতে, সারাক্ষণ নিষেধের বাণী শুনতে থাকলে স্বভাবতই মনটা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ফলে ভালোর পরিবর্তে মন্দের পাল্লাটাই ভারি হয়ে যায় এ বয়সী অনেক ছেলেমেয়ের ক্ষেত্রে। আর এ ক্ষেত্রে নিজেকে সে ভাগ্যবান মনে করে এমন একটি সহযোগিতাপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে। যেকোনো সমস্যাই সে নির্ভয়ে খোলামেলাভাবে বাবা-মা বা আত্মীয়-স্বজনের কাছে খুলে বলতে পারে। ফলে সমস্যার সমাধান ও কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে একটা অনুকূল পরিবেশ সে পায়। এটা তার মানসিক বিকাশ ও চারিত্রিক দৃঢ়তা গঠনে সহায়তা করছে দারুণভাবে। সাধারণত ১৩ থেকে ১৯ বছর সময়টাকে টিনএজ হিসেবে ধরা হয়। তবে অনেকের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন তাড়াতাড়িও আসতে পারে। ছেলেমেয়ে এবং বাবা-মা দুজনের কাছেই এ সময়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটিকে ক্রিটিক্যাল সময় ধরা হয় এবং বেশ সতর্কভাবে হ্যান্ডেল করতে হয়। আপাতদৃষ্টিতে টিনএজকে আমরা সমস্যায় পরিপূর্ণ মনে করি। যেমন নিজের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করা, অন্যের মতো হওয়ার প্রবণতা, অনেকের হীনম্মন্যতায় ভোগা, অপরিষ্কার থাকা, কথা না শোনা, রেগে যাওয়া, মনোযোগের অভাব ইত্যাদি। মনে রাখবেন, এগুলো আপনার চোখে তার সমস্যা। কিন্তু ছেলে বা মেয়েটিও যে নানা রকম সমস্যা অনুভব করছে যার অনেক কিছুই সে শেয়ার করতে পারছে না, সেটাও আপনাকে বুঝতে হবে। তখন আপনাকে তার প্রয়োজন অভিভাবক হিসেবে নয়, বন্ধু হিসেবে। আপনার টিনএজ সন্তান যেন আপনার মধ্যে সেই বন্ধুকে অনুভব করতে পারে যাকে সব কথা বলা যায়। আমাদের সমাজে ছেলে সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের দূরত্বকে খুব স্বাভাবিক ধরা হয়, এটা ঠিক নয়। চেষ্টা করুন উভয়ের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে। তুলনামূলকভাবে সংসারে বাবারা কম সময় দিয়ে থাকেন, কাজেই এ ক্ষেত্রে মায়েদেরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও পরিলক্ষিত হয়। বন্ধন তৈরি করুন বয়স বাড়ার সাথে সাথে টিনএজ সন্তানরা আরও বেশি স্বাধীনতা চায়। আর তা না পেলে তাদের মধ্যে অদ্ভুত এক বিদ্রোহী মনোভাব দেখা যায়। ফলে বাবা-মায়ের সঙ্গে টিনএজ ছেলেমেয়েদের ব্যক্তিত্বের সংঘাত হওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। এই সময়ে তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে। তা ছাড়া এ সময় বড় হওয়ার একটা অবুঝ বাসনা কাজ করে। মুখে না বললেও বাবা- মায়ের সঙ্গ এই সময়ে খুব প্রয়োজন। তবে শুধু নিরাপদ আশ্রয় হিসেবেই নয় টিনএজরা তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে আশা করে বন্ধুত্বও। তাই বাবা-মায়েরা এ সময় সন্তানকে একটু আর্থিক স্বাধীনতা দিন, প্রতি মাসে ওকে একটা নির্দিষ্ট অংকের পকেটমানি দিন। নিজের ইচ্ছেমতো টাকা খরচ করতে দিন। কোথায় খরচ করল, কী কিনল এ রকম বেশি প্রশ্ন করবেন না। তবে প্রথমেই বলে দিন যে, এর বেশি টাকাও সে চাইতে পারবে না। অনেক সময় বাবা-মায়েরা নিজেদের অজান্তেই সন্তানদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করে ফেলেন যার ফলে তারা অপমানিত বোধ করে। তাই সব সময় ওর আচরণ, পোশাক-আশাক, পড়াশোনা ইত্যাদি নিয়ে নিন্দা না করে মন খুলে ওর প্রশংসা করুন। দেখবেন আপনার প্রশংসাই ওকে ভালো ব্যবহার করতে অনুপ্রাণিত করছে। সন্তানকে বড় হওয়ার মানে বোঝান বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানো ছেলে বা মেয়েকে বড়দের জগতে পা রাখতে শেখাবার ব্যাপারে অনেক বাবা-মাই খুব সন্ধিহান থাকেন। কতটা বলব? কীভাবে বলব? এ রকম কত প্রশ্ন যে মনে দেখা দেয়, তার হিসাবে নেই। শেষে কিছু ঠিক করতে না পেরে বেশিরভাগ বাবা-মাই চুপ করে যান। ফলে বন্ধুবান্ধবদের থেকে বা বইপত্র পড়ে ছেলেমেয়েরা সম্পূর্ণ না বুঝেই ভুল কিছু একটা শিখে ফেলে বিভ্রান্ত হয়ে থাকে এবং জীবনের নানা মোড়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাই আগে থেকেই আপনার টিনএজার সন্তানকে চারপাশের বদলে যাওয়া জগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিন। বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর একটু আগে থেকেই গল্পচ্ছলে ওকে ‘বড় হয়ে উঠা’ নিয়ে সহজ সরল ভাষায় বোঝান। একটা বয়সের পর থেকে আমাদের শরীরে যেসব পরিবর্তন আসতে শুরু করে সেগুলো উদাহরণের সাহায্যে বোঝান। বিশেষ করে মেয়েদের ঋতুচক্র, জীবনে তার গুরুত্ব কীভাবে সামলাতে হবে ইত্যাদি খুঁটিনাটি ওকে বুঝিয়ে বলুন। লজ্জা পাবেন না, কারণ এটা কুণ্ঠিত হওয়ার বিষয় নয়, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এমনভাবে ওকে এই ব্যাপারগুলো বোঝান যাতে ও ভয় না পায়। এই সময়ে আপনার সন্তানের ব্যবহারে কিছু বদল আসবেই। কেউ খুব আগ্রেসিভ হয়ে যায়। অতিরিক্ত কথা বলতে শুরু করে বা খুব বেশি মতামত দেয় কেউ বা আবার একেবারে চুপ হয়ে যায়। এই সময় আপনার সন্তান নানা রকম ইমোশনাল ক্রাইসিসের সম্মুখীন হতে পারে তার মধ্যে বন্ধুবিচ্ছেদ বা প্রেম থাকাও অসম্ভব নয়। পুরোনো ধ্যানধারণা সংস্কার ধরে রাখলে আপনার টিনএজ সন্তানের সঙ্গে সহজভাবে মিশতে পারবেন না। বড় হওয়ার সাথে সাথে মা-বাবার প্রভাব থেকে দূরে থাকতে চায় সন্তানেরা। মা-বাবার সঙ্গে সময় কাটানো খুব একটা পছন্দ করে না। এমনটি বাবা-মায়ের সাথে বাইরে ঘুরতে বা কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়া একেবারেই পছন্দ করে না। আসলে বয়ঃসন্ধির সময় নানা শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হয় ফলে দেখা যায় কনফিশন। আর এখানেই তৈরি হয়ে যায় ছোটবেলার আইডেনটিটির সঙ্গে সংঘাত। বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে এ সময় তারা নিজের অজান্তেই অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে চায়। টিভি বা সিনেমার পর্দায় দেখা প্রিয় তারকাদের মতো হওয়ার বাসনা তাদের মধ্যে তৈরি হয়। শুধু খেয়াল রাখবেন ও যেন ভুল পদক্ষেপ না নিয়ে ফেলে। তাই বাবা-মায়ের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সময় কাটানো তাদের ব্যক্তিগত জীবন সর্ম্পকে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া এবং কিছু বিশেষ ব্যাপারে নজর রাখা অবশ্যই উচিত। বাড়ির বড়দের দেখে ছোটরা অনেক কিছু শেখে তাই আপনার সন্তানের সামনে কখনোই সিগারেট বা মদ খাবেন না। বাবা-মায়ের স্নেহ ও ভালোবাসা ছেলেমেয়েদের জীবনের যেকোনো বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। নানা সমস্যা আর ক্যারিয়ার সফল না হতে পারার চিন্তা প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিভাবকদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যর্থতা কাটিয়েও যে আবার ঘুরে দাঁড়ানো যায়, সেই আত্মবিশ্বাস অভিভাবকরাই সন্তানদের মধ্যে গড়ে তুলতে পারে।