আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় উজ্জ্বল স্বদেশ
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:১৬
এসবিএস স্পেশাল ব্লডকাস্টিং সার্ভিস অস্ট্রেলিয়ার সবচে বড় বহুজাতিক মিডিয়া টিভি রেডিও ডিজিটাল টিভি ও ওয়েব মিলিয়ে বিশাল এক জগত্। সেই মিডিয়ার সাংবাদিক ডেভিড ক্রেইস্টনের ফোন পেয়ে গোড়াতে একেটু চমকে উঠেছিলাম বৈ কি। ডেভিড যখন ফোন করেছিলেন আমি তখন কাজে। উন্নত দেশ নামে পরিচিত পুঁজিবাদী দেশ ও মুক্তবাজারের কাজ মানে গোলামি। সে আপনি আমলা, বুদ্ধিজীবী, কেরানী, ড্রাইভার বা মালিক যাই হন না কেন। দ্রুত বিদায় করার জন্য বলি আমি লাঞ্চ টাইমের আগে কথা বলতে পারব না। নাছোড়বান্দা ডেভিড তাতেই রাজি। যখন বললেন বিষয় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি শাহবাগ আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও শাহবাগ-সিডনি সংহতির ব্যাপারে কথা বলবেন। আমিও আগ্রহী হয়ে উঠলাম, মন হয়ে উঠল চঞ্চল ও বিক্ষিপ্ত। লাঞ্চের সময় কথোপকথনকালে দেখি ডেভিড তথা এসবিএস মিডিয়া ভালোই খবর জানে, তাদের আগ্রহ গণতান্ত্রিক উদার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, যুদ্ধাপরাধের মত মানবতাবিরোধী গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠনেরও বিচার চায় তারা। অস্ট্রেলিয়া গোড়া থেকে অর্থাত্ একাত্তর সাল থেকেই আমাদের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে চলেছে। জর্জ হ্যারিসন এসে গান গেয়ে গেছেন এই দেশে। তার বাংলাদেশ, বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ছিল এখানে অতীব জনপ্রিয়। যে দু’চারজন চাক্ষুষ সাক্ষী আছেন তারাও বলেছেন, একাত্তরে অন্যান্য পশ্চিমা রাষ্ট্র বিশেষত আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা যখন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে দোদুল্যমান, ফলাফল বিষয়ে সন্দেহ আর দোটানায় ভুগছিল, অস্ট্রেলিয়া তখনো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভূমিকা রাখতে কার্পণ্য করেনি।
বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানকারী শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলোর ভেতরও এই দেশ ছিল শীর্ষে। হবারই কথা। আমাদের মুক্তি সংগ্রামের একমাত্র বিদেশি বীরপ্রতীক প্রয়াত ওডারল্যান্ডও ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান। আজ হাজার হাজার বাংলাদেশির বসবাস এখানে। খোদ সিডনিতেই পঞ্চাশ সহস্রাধিক বাংলাদেশি বাস করেন। কয়েকদিন আগে রাষ্ট্রদূত জেনারেল মাসুদ উদ্দীন চৌধুরীর সাথে দেখা হল এক অনুষ্ঠানে। এক সাথে ভাষণ দেয়ার সুযোগে মঞ্চে নিরিবিলি কথা বলারও সুযোগ হয়েছিল। তিনি জানালেন, অদাপ্তরিক সূত্রে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের সংখ্যা লাখের কোঠা ছাড়ানোর পথে।
দু’কোটির কিছু অধিক জনসংখ্যার দেশে এই সংখ্যা ফেলনা কিছু নয়। ফলে অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়ার আগ্রহ যৌক্তিক ও বাস্তবতানির্ভর বলা যেতেই পারে। এসবিএস শাহবাগের চলমান আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এর যোগ্য সমাধান ও শান্তিপূর্ণ নিরসন বা অবসানে আগ্রহী। ডেভিডের মূল প্রশ্ন ছিল, কিছুদিন আগে রাগে-ক্ষোভে-অপমানে ফেটে পড়া সিডনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জমায়েতটি স্থানীয় একটি পার্কে হবার কারণ কি? এ্যশফিল্ড নামক জায়গার ঐ পার্কটির পরিবর্তে পার্লামেন্ট হাউসের সামনে অপেরা হাউসের কাছাকাছি বা শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিক্ষোভ সমাবেশ কেন হল না? যৌক্তিক প্রশ্নই বটে? কিন্তু ঐ পার্কটি যে প্রাণের আবেগ দিয়ে ঘেরা, এখানেই অনুষ্ঠিত হয় এ দেশের বাঙালির বই মেলা। এই পার্কে নির্মিত হয়েছে একুশে একাডেমীর প্রাক্তন সভাপতি নির্মল পালের নেতৃত্বে মাতৃভাষা স্মৃতি সৌধ। বহুজাতিক সমাবেশে সকল ভাষার অস্তিত্ব ও স্থান রক্ষার স্বার্থে নির্মিত এই সৌধ ও শহীদ মিনার আজ আমাদের অহংকার। বেশ কয়েক বছর আগে ঘরে-বাইরে শত প্রতিকূলতা, নিজেদের ভেতর লুকিয়ে থাকা ছদ্মবেশী জামাতী ও ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়ে যোগ্য নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত এই মিনারটিটই আমাদের আশা বিক্ষোভ ও চেতনার সিডনি কেন্দ্রবিন্দু। দেশের যে কোন ক্রান্তি লগ্নে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা এখানে ছুটে আসবেন-এ ভবিষ্যদ্বাণী আমি আগেই করে রেখেছি। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ডেভিড জেনে বিস্মিত ও আশাবাদী হয়েছে। বাঙালি ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েই থেমে থাকেনি তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও ছিনিয়ে এনেছে। যা আজ হিটলার-মুসোলিনী বা নাত্সীদের মত যুদ্ধাপরাধী রাজাকার দালাল চক্রের বিরুদ্ধেও অনন্ত প্রেরণার উত্স। এসবিএসের এই আলাপচারিতা প্রবাসী জামাতীদের পছন্দ হয়নি। পছন্দ হয়নি একুশের স্পর্ধা বা চেতনাও। বইমেলাটির সকালবেলায় সে উত্তেজনার কিছু আঁচও দেখা গেছে। নবীন লেখক শাহরিয়ার পাভেল ও এখানকার তরুণরা যা প্রতিরোধ করে নিজেদের বিবেক ও সংস্কৃতির দায় মিটিয়েছেন। আজ দেশের মত বিদেশেও শাহবাগের শক্তি, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনায় জেগে উঠেছে নতুন বাংলাদেশ। তার ঢেউ বাংগালি জগত্ ছাড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার মূল ধারাকেও স্পর্শ করেছে। তারাও সজাগ আর পূর্ণ সমর্থন নিয়ে পাশে দাঁড়াতে চাইছে। আমাদের প্রগতিশীলতা, গণতন্ত্র আর মুক্তবুদ্ধির স্বদেশ একা কেউ নয়, দেশে দেশে জাগ্রত মানুষ, চেতনা আর প্রগতিশীল মিডিয়া আছে আমাদের পক্ষে, আছেন সর্বস্তরের জনগণ।
( সিডনি থেকে)