আমীরাতের কারাগারে বাংলাদেশি শ্রমিক
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:২৯
পত্রিকান্তরের খবরে প্রকাশ, আমিরাতের জেলে ৫ হাজার বাংলাদেশি। খবরটিতে নিশ্চয়ই উদ্বিগ্ন না হইয়া পারা যায় না। কেননা এ দেশের দরিদ্র সন্তানেরা জমিজিরাত বিক্রয় কিংবা প্রচুর ধারকর্জ করিয়া সোনার হরিণ ধরিবার আশায় বিদেশে গমন করেন, কিন্তু সেখানে যাইয়া যখন নিজেদেরকে অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি দেখিতে পান তখন মহাবিপদ নামিয়া আসে তাহাদের উপর। এ অবস্থায় সকল কিছু খোয়াইবার যন্ত্রণায় কাতর হইয়া পড়েন তাহারা। তখন এই সকল অসহায় বিপন্ন মানুষের সাহায্যে আগাইয়া আসার জন্য কেহ থাকে না। আমাদের দূতাবাসগুলিতে এইজন্য যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রহিয়াছেন তাহারাও তাহাদের সাহায্যে আগাইয়া আসা দূরে থাক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চরম ঔদাসীন্য প্রদর্শন করিয়া থাকেন-এমন অভিযোগ হরহামেশা শোনা যায়। প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, গত ৪ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ক্ষমার মেয়াদ শেষ হইবার পর দিন হইতেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হইয়াছে। পুলিশ বিভাগ এ পর্যন্ত সাড়ে ৬ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে পাকড়াও করিয়া জেলহাজতে প্রেরণ করিয়াছে। যাহার মধ্যে পাঁচ হাজারই বাংলাদেশি। উল্লেখ্য, সৌদী আরবের পর আরব আমীরাত হইতেছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার। যেখানে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ১৪ লক্ষ। তন্মধ্যে লক্ষাধিক অবৈধ। অবিশ্যি সাধারণ ক্ষমার সুযোগ ২২ হাজার বাংলাদেশি ইতোমধ্যে গ্রহণ করিয়াছে। কিন্তু ঐ সুযোগের সময়সীমা আর বর্ধিত না করায় বিপুল সংখ্যক অবৈধ বাংলাদেশি মহাবিপদে পড়িয়াছেন। এই ধরনের ঘটনা যে শুধু আরব আমীরাতে ঘটিতেছে তাহা কিন্তু নহে, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও অনেক সময় এই ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হয়।
যে সকল শ্রমিক বাংলাদেশ হইতে বিদেশে যান তাহাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক একশ্রেণীর রিক্রুটিং এজেন্সি দ্বারা প্রতারিত হইয়া ফি বত্সর বিপদাপন্ন হইয়া পড়েন। এই সকল রিক্রুটিং এজেন্টের অর্থলোভ ও লালসা এতই বেশি যে, জনশক্তি রফতানির লাইসেন্সকে তাহারা মানুষ ঠকাইয়া বিপুল অর্থাগমের কাজে নির্মমভাবে ব্যবহার করে। অনেকে ইহাদের দ্বারা প্রতারিত হইয়া বিদেশে গিয়া দেখিতে পান যে, যে চাকরির বা যে পদের জন্য তাহাকে নিয়োগ করা হইয়াছে এবং তাহাকে এ বাবদ যে বেতন-ভাতাদি প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছে প্রকৃত প্রস্তাবে এ সকলই শুভংকরের ফাঁকি। অর্থাত্ না সে ঐ পদে পদবী লাভ করিয়াছে, না প্রতিশ্রুত বেতন-ভাতা। অনেক ক্ষেত্রে আবার জাল পাসপোর্ট, জাল ভিসা ও জাল ওয়ার্ক পারমিট ধরাইয়া দেওয়া হইয়াছে অনেককে আর এই অর্থগৃধ্নু রিক্রুটিং এজেন্ট নামধারী কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের অমানবিক আচরণের ফলশ্রুতিতে বহু দরিদ্র মানুষের জীবন ও সংসার তছনছ হইয়া গিয়াছে ও যাইতেছে। আমাদের জনশক্তি এক বিরাট সম্পদ। ইহাকে দক্ষ করিয়া গড়িয়া তোলার মাধ্যমে কল্পনাতীত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করিতে পারি। কিন্তু এ ব্যাপারে না সরকারের তেমন কোন সুপরিকল্পনা আছে, না বেসরকারি পর্যায়ে আছে কোন মমত্বশীল ও বাস্তবোচিত উদ্যোগ। সকলেই কেবল যেন শর্টকাট পথে পয়সা কামাইবার ফিকির খোঁজে। ফলে মানুষ ঠকাইয়া অর্থাগমের ন্যায় সহজ পন্থা অবলম্বন করিতেই ইহাদের আগ্রহ বেশি। এ সকল অসাধুতার জন্য বিশ্বের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হইতেছে এবং এখনকার জনশক্তি রফতানিতেও তাই ভাটা পড়িতেছে। দরিদ্র মানুষেরা এক শ্রেণীর প্রতারকের শিকার হইয়া বিদেশ বিভুয়ে মানবেতর জীবন যাপন করিবে আর দেশে তাহাদের গোটা পরিবার ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইবে ইহা কোনভাবেই কাম্য হইতে পারে না এবং চলিতে দেওয়া যায় না। এ জন্য নিয়ম-নীতি অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন অত্যাবশ্যক তেমনি যাহারা বিদেশে এই কারণে আটক রহিয়াছে তাহাদের উদ্ধার করার উদ্যোগ নেওয়াও অতি জরুরি।