চিকিত্সা-বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা

অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকিস্বরূপ হাসপাতাল বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা বিধি মানিয়া চলিতেছে না। পরিবেশ আইনে রহিয়াছে, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপনের পূর্বে নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা ব্যবহূত প্লাস্টিক সুঁচ, সিরিঞ্জ, টেস্ট, প্লাস্টিক বর্জ্য অটোক্লেভ যন্ত্রে জীবাণুমুক্ত করিয়া অপসারণ করিবার সুবিধা রাখিতে হইবে। প্যাথলজির তরল বর্জ্য পরিশোধনপূর্বক জীবাণুমুক্ত করিয়া অপসারণ এবং তুলা, গজ, ব্যান্ডেজ, ইত্যাদি পরিবেশসম্মতভাবে ইনসিনারেটরে পুড়াইয়া ফেলিবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করিয়া পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র গ্রহণ করিতে হইবে। কিন্তু অধিকাংশ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়গনস্টিক সেন্টার পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই চলিতেছে। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে দেখা যাইতেছে, রাজশাহীতে সরকার অনুমোদিত ৪৫টি ক্লিনিক ও হাসপাতাল এবং ৪১টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার রহিয়াছে। নগরের বাহিরে নয়টি উপজেলায় রহিয়াছে ২১টি ক্লিনিক ও ১৯টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বর্জ্য নষ্ট ও শোধনের ব্যবস্থাহীন এইসব প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ ছাড়পত্র দেওয়া না হইলেও সেগুলি ঠিকই অনুমোদন লইয়া ব্যবসা চালাইয়া যাইতেছে এবং যত্রতত্র মেডিক্যাল বর্জ্য ফেলিয়া জনস্বাস্থ্য হুমকিগ্রস্ত করিতেছে। কেবল রাজশাহী নহে, সারা দেশেই এই চিত্র দেখা যাইবে। বেশিরভাগ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেই বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা নাই। খোদ রাজধানীতেই দেড় সহস্রাধিক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ৯২ শতাংশ চিকিত্সা-বর্জ্য রাস্তার উপর খোলা ডাস্টবিন, নর্দমা বা রাজধানীসংলগ্ন নদীতে ফেলা হইতেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বলিতেছে, একটি ক্লিনিক একটি ইটভাটার সমগোত্রীয় পরিবেশ দূষণকারী প্রতিষ্ঠান। এই ধরনের প্রতিষ্ঠান হইতে ১১ প্রকার বর্জ্য উত্পাদিত হয়। যাহার মধ্যে ভয়ানক হইতেছে সংক্রামক বর্জ্য। যেমন রক্ত, পুঁজ, দেহরস দ্বারা সংক্রমিত গজ, ব্যান্ডেজ, তুলা, স্পঞ্জ, সোয়াব, মব, প্লাস্টার, ক্যাথিটার, ড্রেনেজ টিউব, রক্ত সঞ্চালনের ব্যাগ/ টিউব, রক্ত দ্বারা সংক্রমিত স্যালাইন সেট, জমাট বাঁধা রক্ত বা দেহরস, ডায়রিয়া রোগির সংক্রমিত কাপড়চোপড়, সংক্রমিত সিরিঞ্জ ইত্যাদি। একই ধরনের ভয়াবহ অ্যানাটমিক্যাল বর্জ্য হইল মানব দেহের কেটে ফেলা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, টিস্যু, টিউমার, গর্ভফুল বা গর্ভসংক্রান্ত বর্জ্য। তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের ভিতর রহিয়াছে রেডিওঅ্যাকটিভ আইসোটোপ, তেজস্ক্রিয় বস্তু দ্বারা সংক্রমিত বর্জ্য, অব্যবহূত এক্স-রে মেশিনের হেড ইত্যাদি। হিসাব করিলে দেখা যাইবে, জনবহুল শহরগুলিতে দৈনিক যে বর্জ্য সৃষ্টি হয় তাহার ৮০ শতাংশ সাধারণ গৃহস্থালি বর্জ্য আর ২০ শতাংশ হইতেছে মেডিকেল বর্জ্য। সাধারণ বর্জ্য মারাত্মক ক্ষতিকারক না হইলেও ২০ শতাংশ মেডিকেল বর্জ্য ভয়ানক হুমকিস্বরূপ। এই ২০ শতাংশ মেডিকেল বর্জ্য কোনো না কোনোভাবে ৮০ শতাংশ সাধারণ বর্জ্যের সহিত মিশিয়া যায়। ফলে সকল বর্জ্যই জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া দাঁড়ায়। তাই মেডিকেল বর্জ্য ডাস্টবিন, নালা-নর্দমায় কিংবা খোলা জায়গায় না ফেলিবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক। কারণ, মেডিকেল বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বাড়িতেছে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, যক্ষা, ডিপথেরিয়া, এমনকি এইডসের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকি। ২০০৭ সালে তত্কালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও প্যাথলজি সেন্টার স্থাপন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ হালনাগাদ করিবার উদ্যোগ লইলেও তাহা আলোর মুখ দেখে নাই। ২০০৮ সালে দেশে চিকিত্সা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা তৈরি করা হইয়াছিল। কিন্তু ইহাতে হাসপাতালগুলির জন্য কোনো নির্দেশনা নাই। মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আইনগত বাধ্যবাধকতা ও প্রয়োজনীয় সচেতনতা গড়িয়া তোলা অত্যন্ত জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।