চাই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারকে যে প্রজন্ম ব্যাপক হারে সমর্থন দিয়েছিল,তাদের মূল দাবিই ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। খুব ধীরগতিতে হলেও বিচার যে শুরু হয়েছে,তাতেই উদ্বেলিত তরুণ সমাজ। পলাতক আসামি বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ হলো,অথচ তাকে ধরা গেলো না। আর স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার হলো যাবজ্জীবন,যে কিনা বহাল তবিয়তে কারাগারে,শোনা যাচ্ছে সে নাকি এখন জেল বাগানে গাছ লাগাচ্ছে, একি প্রহসন নয়? খুন,ধর্ষণ,লুটতরাজ কিনা করেছে সে? আর তার বিচার এই? একি করে মানবে তরুণ প্রজন্ম? তরুণ সমাজ বাংলার মাটিতে ঐ কুলাঙ্গারদের আর এক মুহূর্তও দেখতে চায় না। কারণ পাপিষ্ঠরা ক্রমেই বিষিয়ে চলেছে বাংলার আকাশ-বাতাস-অন্তরীক্ষ। তাই আজ শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর দ্বিতীয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পরিণত হয়েছে। লক্ষ মুজিবের বজ্রকণ্ঠে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে সে চত্বর,তবে ওখানেই থেমে থাকেনি সে হুংকার, দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছে এদেশের প্রতিটি জেলায়-উপজেলায়,ইউনিয়নে ইউনিয়নে,স্থাপিত হয়েছে এক একটি জনতার মঞ্চ,চলছে সরবে প্রতিবাদ,গানে,কথায় ও কবিতায়।ওদিকে পাপিষ্ঠদের বিষ সন্তানেরা তবুও মরণ কামড় দিয়ে যাচ্ছে এখানে ওখানে,রাজশাহী ও চিটাগাং-এ চালাচ্ছে ঝড়ো তাণ্ডবতা,মসজিদে নামাজ আদায়ের পর ঝাঁপিয়ে পড়ছে হায়েনার মত এদেশের মানুষের উপর,আর মুখে ফোটাচ্ছে ধর্মের বুলি। ধর্মের লেবাসে আটা ঐ হিংস্র শ্বাপদকুলের জন্য এদেশ স্বাধীন হয়নি।এ বার্তাই ধ্বনিত হচ্ছে প্রজন্ম চত্বরে।ধ্বনিত হচ্ছে সমস্ত বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে। এ এমনই এক প্রতিবাদের আগুন, এমনই এক আগুন-ঝরা বসন্ত,যে আগুন সত্যকে সুমহান মর্যাদায় উত্তীর্ণ করেই তবে শান্ত হয়। যে আগুন ’৫২-এ জ্বলে উঠেছিল,১৯৭১-এ দাবানলে রূপ নিয়েছিল,পরাধীন বাংলায় স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েই তবে শান্ত হয়েছিল। আজ আবার জেগে উঠেছে বাংলার জনতা,তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে ,আজ সেখানে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই এসে সমবেত হয়েছে,জানাচ্ছে একটাই দাবি—যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দিতে হবে।তাদের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই, নেই তাদের জামাই আদরে কারাগারে থাকার কোন এখতিয়ার। ফলে ভড়কে গেছে পাপিষ্ঠরা,অন্তরাত্মা তাদের কেঁপে কেঁপে উঠছে যারা কারান্তরালে, আর যারা এখনও বাইরে,ভয় তাদেরও শিরদাঁড়ায় ভর করেছে,ওদিকে চুপসে গেছে তাদের দোসররাও যারা মদির স্বপ্নে ছিল বিভোর। আমরা নিশ্চিত ঐ স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচার আর কোন পথই আজ খোলা নেই, ওদের ফাঁসি হবেই হবে। বাংলা মা আমাদের এবার কলংক মুক্ত হবেই। তরুণ প্রজন্মের কাছে আমাদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী, কারণ ভেঙে আবার গড়তে পারে এই তরুণ সমাজই। দীর্ঘদিনের লালন-পালনে এদেশের রাষ্ট্র-যন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির যে শিকড় গেড়ে বসেছে,সেটিও কিন্তু অনেক গভীরেচলে গেছে,এদিকেও এবার নজর দিতে হবে নব প্রজন্মকে।গঠনমূলক কোন কাজই আজ আর সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন হতে পারছে না লোভ-লালসার আতিশয্যে। ফলে দেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছে না। কাদের হাত ধরে দেশ এগোবে? দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আদর্শচ্যুতির মহড়া চলছে দেশ জুড়ে।ফলে স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে অনেকের, কিন্তু সামষ্ঠিক স্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে পদে পদে। মেধার অবমূল্যায়ন হচ্ছে যত্রতত্র। শিক্ষক নিয়োগে কোথাও দলীয় বিবেচনায়, কোথাও অর্থের ঝকমারিতে অযোগ্য ব্যক্তিরা শিক্ষকের পদগুলো কলংকিত করছে, আর এভাবে মর্যাদা হানি করছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোরও । সরকারি আমলারা ফাইলের মাহাত্ম্যে বিত্তশালী হয়ে উঠছে,খবরদারি করার কেউ নেই, তারা প্রজাতন্ত্রের এক একজন যেন রাজা-মহারাজা বনে গেছে। ভোগান্তি বাড়ছে সাধারণ মানুষের ,যারা ওদের দ্বারস্থ হচ্ছে কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনে। সরকার যদিও বা উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য ভৌত ও একাডেমিক অবকাঠামো বিনির্মাণে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছে,কিন্তু ফাটা কপাল জনগণের সেক্ষেত্রেও। সেসব বরাদ্দ টাকা জনগণের কল্যাণে লাগার আগেই মাঝপথেই ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন পয়েন্টে ওত পেতে থাকা লোভী-স্বার্থপর মানুষগুলো। কোথাও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগে,কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়ের দাপটে, কোথাও বা এটাই নিয়ম,এই অজুহাতে।ফলে জনগণকেই পড়তে হচ্ছে শুভংকরের ফাঁকিতে। কাগজে-কলমে বরাদ্দ টাকার পাই-পয়সা লিপিবদ্ধ আছে, ফাঁক ধরার কোন জো নেই, কিন্তু যে জন্য টাকা , সেই দালান-কোঠা রাস্তা-ঘাটের কংকালসার দেহ তেমনিই নগ্ন-বিদ্রূপে শোভ্যমান। এই দুর্নীতির বেড়াজাল থেকে বেরোতে না পারলে এদেশ কখনই সোনার বাংলায় পরিণত হবে না, হতে পারবে না। যে অঙ্গীকার নিয়ে স্বাধীন হয়েছিল এদেশ,আত্মদান করেছিল লাখো বাঙালি,সম্ভ্রম হারিয়েছিল অগুনতি মা-বোন আমাদের, তাদের সে আত্মত্যাগ ব্যর্থতার আঁধারেই ডুবে যাবে। তাই প্রজন্ম চত্বরের লাখো তরুণের কাছে এই আহবান জানাই ,জেগে ওঠো তোমরা,সত্যিকারের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এগিয়ে চলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে , যে স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সে স্বপ্ন সার্থক করে তোলার দায়িত্ব তোমাদের। রাজাকার-মুক্ত বাংলাদেশ চাই আমাদের, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই আমাদের। তামাদের হাতে সঁপে দিলাম সে গুরুভার,তোমরা পেরেছিলে ১৯৭১-এ স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা ছিনিয়ে আনতে। তোমরাই পারবে রাজাকার মুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। লেখক :প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা, বাউফল কলেজ বাউফল, পটুয়াখালী shikha231960@yahoo.com