সকল রাজনীতির ঊর্ধ্বে দেশ
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:০৯
আমি জন্মেছি ৭১-এ যুদ্ধের মধ্যে মাটির নিচে ছোট এক বাঙ্কারে। সেদিন আমার মা আমাকে পেটে নিয়ে কতই না উদ্বিগ্ন ছিলেন। মা আমার আজ নেই। কিন্তু আমার আর একজন মা আছেন; দেশ। দেশ আমার মা। আমি সেই মায়ের সন্তান। মা আমাকে গর্ভে ধারণ করেছেন, ভূমিষ্ঠ হয়েছি মাতৃগর্ভ থেকে আর এক মায়ের কোলে। সেই মা আমার দেশ। আমার ভালবাসা আমার মাতৃভূমি। আমরা সবাই তার সন্তান। জন্মসূত্রে অনেক দেশে নাগরিকত্ব দেয়া হয়। মানুষের জন্মের সংগে মা এবং দেশের যে সম্পর্ক তা আত্মার সম্পর্ক। সেই মা এবং মাতৃভূমির প্রতি সহানুভূতি, মমতা পৃথিবীর প্রতিটি জাতি, প্রত্যেক দেশের মানুষের মধ্যে ছিলো, আছে এবং থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজ আমি ভীষণভাবে ব্যথিত হচ্ছি বা শংকিত হচ্ছি। আমার মায়ের কোল খালি হচ্ছে। মা আমার কাঁদছেন। বিখ্যাত একটি গানের দু’লাইন মনে পড়ে গেল, ‘মাগো তোর কান্না আমি সইতে পারি না, দোহাই মা আমার লাগি আর কান্দিস না।’ আর বাস্তবিক যেসব গর্ভধারিণী ‘মা’রা এখনো কাঁদেননি তারাও শংকিত আছেন। রাজনীতির চোরাবালিতে মা’কে কাঁদিয়ে কি লাভ? লাশ পড়লে রাজনীতির সুবিধা হয়। আর কাঁদতে কাঁদতে মা বাকরুদ্ধ হয়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ কত সুন্দর নাম। অর্থাত্ সাধারণ জনগণ এ দেশের মালিক। কিন্তু মরছে কারা? দীর্ঘ পথপরিক্রমায় অনেক ত্যাগ, রক্তের পর দেশে গণতন্ত্র চলছে। বিচক্ষণ রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বে সবচেয়ে বড় অবদান যে, বর্তমানে একটি গণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। তাদের অনেক সফলতা আছে, আবার বেশকিছু ব্যর্থতাও আছে। এই মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকবে। আমাদের ভুললে চলবে না আমাদের সীমাবদ্ধতাও আছে। গণতন্ত্রে ভিন্নমত, পথ থাকবে। এই যে আমি স্বাধীনভাবে আমার মত প্রকাশ করছি, এসব লিখতে পারতাম না যদি গণতন্ত্র না থাকত। গণতান্ত্রিক ধারায় সবকিছুই ‘ফর দি পিপল, অফ দি পিপল, বাই দি পিপল’। ভিন্নমত বা পথের স্বীকৃতি দিয়েছে গণতন্ত্র। জনগণই নির্ধারণ করবেন কে বা কারা তাদের নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য শাসক হবেন। চারদলীয় ঐক্য জোটের শাসনের জবাব জনগণ দিয়েছেন। আর কয়েক মাস বাকি, তারপর আবার সেই জনগণই মহাজোটের কর্মকান্ডের জবাব নির্বাচনের মাধ্যমে দিবে। আমি বা আমরা দেখব সেই অপেক্ষায় আছি, যদি অশুভ কোন শক্তি অতিতের মত আবির্ভূত না হয়। মহাজোটের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম একটি ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা। জনগণের রায়েই এই সরকার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠন করেছেন। এই একক বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কিভাবে চারশ বছরের ঢাকাকে চার মিনিটে ভাগ করা হয়েছে। যদিও তাদের পক্ষের অনেক যুক্তি আছে। সেবার মান কিন্তু আমরা জানি। সে যাই হোক মূল কথায় আসি। যুদ্ধাপরাধীর বিচার মহাজোটের নির্বাচনী ইশতেহার। তারা সেটি করছেন। মহাজোট সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল করেছেন, বিচার প্রক্রিয়া চলছে। আদালতের প্রতি আস্থা রেখেই বিচারের অপেক্ষায় পুরো জাতি প্রতীক্ষায় আছে। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে অবিশ্বাসের। রাজনীতির যেমন শেষ কথা নেই সেই না থাকা শেষ কথায় অনেক সাধারণ মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস দানা বেঁধেছে। যা রাজনীতিবিদদের সবচেয়ে বড় পরাজয় বলে মনে করি। একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে মহাজোটের আমলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে না আমি বিশ্বাস করি না। আওয়ামী লীগ সরকার কি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃত খুনিদের বিচারের কার্য আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করেনি? কার্যকর করেনি? তাহলে এত অবিশ্বাস কেন? এখানেই হিত বা বিপরীত কিছু লুকিয়ে থাকতে পারে। আমি এও বিশ্বাস করি, যদি হয়ে যাওয়া সংশোধন বিল এরপরও আবারও সংশোধন প্রয়োজন হয় মহাজোট সরকার তা করবে। প্রজন্ম চত্বরে বিক্ষোভ-এর প্রয়োজন হতো না। আমি আমার পরিবার শাহবাগ চত্বরে গিয়েছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে একাধিকবার গিয়েছি। আমি নিজেও তরুণ। লাখো তরুণদের ন্যায় বিচার বিঘ্ন হচ্ছে ভেবে তাদের যে প্রতিবাদ, সেই প্রতিবাদকে স্বাগত জানাই আমার দেশ প্রেম থেকে, যা সর্বস্তরের মানুষ দেখিয়েছে। কারণ আমরা সংঘাতের দিকে যাচ্ছি। আমাদের অগ্রগতি, অগ্রযাত্রা ব্যাহত হতে পারে ভেবে, যদি কোন উপকারে আসে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষ সংক্ষুব্ধ হলে আন্দোলন বা আদালতেও যেতে পারে, গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু ঐ অধিকার কি কারো আছে, যার মধ্য দিয়ে প্রাণহানি বা গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি হতে পারে? তাহলে কি এর মধ্যেও কোন রাজনীতি আছে? জনগণ কিন্তু অত বেশি রাজনীতি বোঝে না। তাদের হিসাব সোজা—ভাল করব না ভোট দেব না। চারদলীয় ঐক্যজোটের ফলাফল কি শিক্ষা দেয় না? জাতীয় কবির একটি গান আছে, “নদীর এ কূল ভাংগে ও কুল গড়ে এইতো নদীর খেলা, সকাল বেলা আমীর যে ভাই ফকির সন্ধ্যা বেলা।” আমরা যদি আইন হাতে তুলে নেই, বাস্তবতা না ভেবে, বৈষয়িক চিন্তা না করে যদি সংঘাতের দিকে যাই, তার ফলাফল কি হতে পারে আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি।
পরিবার থেকেই তো রাষ্ট্রের জন্ম। পরিবার ছোট, রাষ্ট্র অনেক বড়। যে পরিবারে প্রায়শই ঝগড়া, মারামারি লেগে থাকে, যে পরিবারের পরিবার প্রধানকে অমান্য করা হয়, সেই পরিবার সমাজের কলংক। তারা একঘরে হয়ে যায়। তাদের উন্নতি হয় না। রাষ্ট্র তথা সরকার কোন ধরনের রাজনীতি না করে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকলের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নজির স্থাপন করবেন। সরকারের নিজের দলে কোন খোলস বদলানো যুদ্ধাপরাধী থাকলে তাকেও ধরবেন। জনগণের অবিশ্বাস কেটে যাবে। রাজনীতির বাইরে যুদ্ধাপরাধী থাকলে তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে ন্যায় বিচারের স্বার্থে। আদালতের রায় মানতে সবাই বাধ্য। এর বাইরে যারাই অবস্থান করবে তাদের প্রশ্রয় দেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। দিলেই বিপর্যয় নামবে, যা রোধ করা সম্ভব নাও হতে পারে। হাজারও মায়ের বুক খালি হবে। যে কজন মা তাদের সন্তান হারিয়েছেন, সেই মাকে তার সন্তান ফিরিয়ে দিক। তা যখন কেউ দিতে পারবে না তা হলে এখানে রাজনীতির কোন জায়গা নেই। রাজনীতি শুধু একটাই-ন্যায়বিচার। অপরাধীও যেন ন্যায়বিচার পায়। এ বিচার আমার মায়ের বিচার, ত্রিশ লক্ষ শহীদের বিচার, অনাহারে অপুষ্টিতে, বিনা চিকিত্সায় মরা শত লক্ষ অবুঝ শিশুর বিচার, দু’লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিচার, এটি জাতির কলংক মোচনের বিচার।
লেখক: তরুণ কবি
E-mail: obaidulhaqueakash@yahoo.com