[ রা জ নী তি ]
নেতা-নেতৃত্বকে হতে হবে
সবল, দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাবান
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৭
‘নেতা ও নেতৃত্ব’ এ বিষয়ে সব যুগে ও সব কালে ভিন্নমত এবং ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চোখে পড়ে। আমরা যখন এই আধুনিক যুগে বসবাস করছি তখন দেশে দেশে নেতা এবং নেতৃত্বের যে অবয়ব দেখতে পাচ্ছি তাতে করে এ বিষয়ে একটি সর্বজনগ্রাহ্য বা আদর্শস্থানীয় কোন কিছু খুঁজে পাওয়াই ভার! নেতৃত্ব বলতে যে কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই বোঝায় তা কিন্তু নয়। সমাজ জীবনের প্রতিটি স্তরেই আসলে মানুষের নেতৃত্বের প্রয়োজন। ব্যক্তিগত জীবনে নিজেকে পরিচালনার ক্ষেত্রে সুচিন্তা ও সুপরিকল্পনা এবং আত্মবিশ্বাস ও নিয়ম-শৃংখলা মেনে চলাটা জরুরি। এসব অনুশীলনের ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি যত কৃতকার্য সে ব্যক্তি জীবনে তত সফল। অর্থাত্, এসব গুণাবলী অর্জনের মধ্যদিয়ে ব্যক্তিচিত্তে নেতৃত্বেরই দক্ষতা সঞ্চারিত হয়। যা তাকে পারিবারিক জীবনেও সফলভাবে পরিবার পরিচালনার ক্ষমতা জোগায়। অন্যদিকে, সমাজের অন্য সকল স্তরেও ব্যক্তিমানুষের সফল ও যোগ্য নেতৃত্বের উপরই নির্ভর করে ঐ প্রতিষ্ঠানের সাফল্য। একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তির যদি নেতৃত্বের গুণাবলী না থাকে তাহলে সে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। নেতৃত্বের সাফল্য আসলে বহুলাংশেই তাই নেতার ব্যবস্থাপনা-দক্ষতার উপর নির্ভরশীল। দক্ষ ব্যবস্থাপনাই প্রকৃত প্রস্তাবে সকল সাফল্যের চাবিকাঠি। এম্নিভাবে সমাজে বা রাষ্ট্রে বিদ্যমান বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষদেরকে পরিচালনার ক্ষেত্রে যত দক্ষ, দূরদর্শী, প্রজ্ঞাবান ও ধীমান ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যাবে ততই মঙ্গল।
এ যুগের সবচাইতে বড় দাবি বুঝিবা সৃজনশীল ও দক্ষ নেতৃত্ব। বিশ্বের সর্বত্রই যেন এ ধরনের নেতার সন্ধান চলছে। এ কালের মানুষদের অনেকেই তাদের কৈশোর কিংবা তারুণ্য অতিবাহিত করেছে শিল্প-বিজ্ঞান-সাহিত্য এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জগদ্বিখ্যাত অতিবড় সব মনীষী ব্যক্তির চিন্তা-ভাবনার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে। ফ্রয়েড ও আইনস্টাইন, শ ও স্ত্রানিভস্কি, মাও ও গান্ধী, চার্চিল ও রুজভেল্ট, স্টালিন ও হিটলার-মুসোলিনির ভাবনা-চিন্তা আমাদেরকে অনেক দূর পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে। বিগত শতাব্দীর মধ্যকাল পর্যন্ত এদেরই জয়-জয়কার লক্ষণীয় হলেও কেউ কেউ আবার তাদের প্রভাব আরও কিছুকাল বজায় রাখতে পেরেছিলেন! যেমন- দ্য গল, নেহরু, কেনেডী, লুথার কিং প্রমুখ। মানুষের সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির উপরতো বটেই এমনকি রাজনৈতিক অঙ্গনে এদের সকলের ছিল সদম্ভ বিচরণ বা পদচারণা। আমরা যারা তাদের অনুসারী তারা এদেরকে ভালবেসেছি কিংবা এদের প্রতি বিরাগভাজন হয়েছি। আমরা অনেকেই এই ধরনের ব্যক্তিত্বের পক্ষে লড়েছি আবার অনেকেই তাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছি। এদের জন্য প্রাণপাত করেছি আবার এদের কাউকে কাউকে হত্যা করতেও কুণ্ঠিত হইনি। কিন্তু এতদসত্ত্বেও এদেরকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
ঐ শতাব্দীর চূড়ান্ত পর্বে নেতৃত্বের সঙ্গে জনগণের ‘জীবন-মৃত্যুর মত অবস্থান’ এক ধরনের ব্যক্তিত্ব পূজার বিকাশ ঘটিয়েছে। নেতারাও যেন সংস্কৃতি অঙ্গনের তারকা হয়ে উঠেছেন আর তাই তাদের ব্যক্তিজীবনের খুঁটি-নাটিও উঠে এসেছে দৈনিক কিংবা সাময়িকীর পাতায় পাতায়। তাদের নিদ্রা বা খাদ্যাভ্যাস, যৌন সম্পর্ক, কুকুর পালন বা অন্য কোন বিষয়ে সখ ইত্যাদি পত্রিকার বিশেষ খোরাক হয়ে উঠেছে। ব্যক্তিত্ব পূজাতো আসলে এমন এক ধরনের পূজা যা কিনা শয়তান ও বীর উভয়ের ক্ষেত্রেই করা হয়ে থাকে। আর এ ধরনের পূজা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় ক্ষেত্রেই চোখে পড়ে।
যাহোক, এ যুগে নেতৃত্বের প্রধান সংকট হচ্ছে এর গুণগত মানের মধ্যে। অর্থাত্, বর্তমান যুগে গুণগত মানসম্পন্ন নেতৃত্বই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কেমন যেন মধ্যমানের নেতৃত্বেরই সরব পদচারণা সব ক্ষেত্রে। বিশ্বের ক্ষমতাধর নর বা নারীদের মধ্যে এই মাঝারি মান এবং দায়িত্বহীনতা খুবই চোখে পড়ে।
নেতৃত্ব বা নেতাদের কাছ থেকে এসময় পরিপূর্ণভাবে যা দাবি করে এ সকল নেতা-নেত্রী তা খুব কমই পূরণ করতে সক্ষম। এই মধ্যমানতা আসলে বুদ্ধিবৃত্তিক দীনতাকেই অনেকটা প্রকট করে মেলে ধরে। আমরা আমাদের নেতাদের সম্পর্কে যত বেশি জানি বা ওয়াকিবহাল থাকি তার চেয়ে অনেক অনেক কম বুঝি বা জানি তার নেতৃত্বের দক্ষতার বিষয়ে। সত্যি বলতে, আজকের এই আধুনিক যুগের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ যে নেতৃত্ব সেই বিষয়ক মৌলিক ধারণাটাই আমাদের নেই। তাই কাকে বলে যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব কিংবা কি ধরনের নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত বা প্রত্যাখ্যান করা উচিত এ বিষয়ে কোন নির্দিষ্ট মান আমাদের জানা নেই। নেতৃত্ব আসলে কি? এ কি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন কোন কিছু উদ্ভাবনী ক্ষমতা? নেতৃত্ব কি অপরিহার্যভাবে প্রেরণাদায়ী কোন বিষয়? নাকি তা নেতার অনুসারীদের এক পতাকাতলে সমবেত করার সম্মোহনী শক্তি? নেতৃত্বের বা নেতার কাজ কি লক্ষ্য স্থির করা? নাকি লক্ষ্য অর্জন করা? একজন নেতা কি মূল্যবোধের সংজ্ঞা নির্ধারক? প্রয়োজন মেটাবার চাবিকাঠি? নেতাদের যদি অনুসারীদের প্রয়োজন হয় তাহলে কি এ প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে না যে, কে কাকে চালায়? নেতা অনুসারীদেরকে, না অনুসারীরা নেতাদেরকে? তাছাড়া, এই চালনার শুরু কোথায় এর শেষই বা কোথায়? অন্যদিকে, এ প্রশ্নটিও নিশ্চয়ই অসংগত নয় যে, অনুসারীদের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত বা পরিচালিত না হলে নেতাই বা কিভাবে তার অনুসারীদের পরিচালনা করার সামর্থ্য লাভ করেন? আসলে এ বিশ্বে নেতৃত্ব এমনই এক জিনিস যা প্রকটভাবে দৃশ্যমান হলেও এর গতি-প্রকৃতি বোঝা দায়!
অবশ্য ইতিহাসের সব পর্বেই বিষয়টি এমন ছিল না। কমপক্ষে দুই-দুইটি সহস াব্দ জুড়ে চিন্তাবিদরা শাসক ও শাসিতের মধ্যকার সম্পর্ক বিষয়ে বহু দার্শনিক তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। আজকের এই আধুনিক সমাজতত্ত্বের বহু বহু কাল আগেই গ্রীক দার্শনিক প্ল্যাটো শুধু দার্শনিক রাজার ধারণাই তুলে ধরেননি বরং এ জাতীয় রাজার মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাবের কথাও মেলে ধরেছেন। একইসঙ্গে প্রজাদের মানস গঠন ও রাজার ব্যাপারে তাদের ভাবনাও প্রাধান্য পেয়েছে প্ল্যাটোর বিশ্লেষণে। আজকের দিনে যে নৈতিক নেতৃত্বের কথা শোনা যায় তা কিন্তু সেই প্রাচীনকালেই চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস উচ্চারণ করেছিলেন। কনফুসিয়াসের অনুসারীরা নৈতিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে নেতৃত্বের বিকাশের ধারণাটিকে বেশ জোরে-শোরেই বলে গেছেন। গান্ধীর বহু পূর্বেই খ্রিস্টান চিন্তাবিদেরা অহিংস নীতি বা অহিংসার বাণী প্রচার করেছিলেন। আজকের দিনে জীবনী রচনার যে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায় তা কিন্তু প্রাচীন যুগে প্লুতার্কের হাতেই প্রথম রচিত হয়েছিল। তিনি সেই প্রাচীনকালের বেশকিছু গ্রীক ও রোমান শাসকের ও অরেটরের জীবন বৃত্তান্ত অসাধারণ দক্ষতায় রচনা করেছেন। এসব রচনার মাধ্যমে যে মতটি তিনি প্রকাশ করে গেছেন তা এই যে, দার্শনিকদের সর্বদাই উচিত ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা। একজন বৃদ্ধ ব্যক্তির ক্ষমতায় থাকা উচিত কিনা এ বিষয়টিও পু্লতার্কের ভাবনায় প্রাধান্য পেয়েছিল। সেক্সপিয়ারের বিখ্যাত নাটক ‘এ্যান্থনি এন্ড ক্লিওপেট্রা’ প্লুতার্কের ভাবনা-চিন্তা থেকেই উত্সারিত। শাসকের শাসনকার্য বা শাসন পদ্ধতি কি হবে তা নিয়ে মধ্যযুগে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলেছে। পরে শাসনকার্য ও নেতৃত্ব এই দুই বিষয়কে ঘিরে মানব সমাজকে এক প্রকার বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের আবর্তে নিক্ষিপ্ত হতে দেখা যায়। এর কারণ অবশ্য অনুসন্ধান করে দেখা প্রয়োজন।
একটি ধারণা হিসেবে ‘নেতৃত্ব’ শব্দটির আজ বহু অর্থ দাঁড়িয়ে গেছে। এযাবত্ এর ৩০ ধরনের সংজ্ঞা পাওয়া যায়। বিশ্বময় বিভিন্ন যুগের নেতাদের সম্পর্কে বর্তমানে হাজার হাজার বইপত্র পাওয়া যায়। এসব নেতার জীবনচর্চা, নেতৃত্বের কৌশল, সাফল্য-ব্যর্থতা, দর্শন, ভাবনা-চিন্তা ও সর্বোপরি কার্যকলাপ স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন ভিন্ন রকমের। ফলে নেতৃত্ব সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন ধারণার অবকাশ তৈরি হচ্ছে এসব নেতা বা শাসকের সামগ্রিক কার্যকলাপকে ঘিরে। একটি একক মানসম্মত সংজ্ঞায় নেতৃত্বকে তাই সংজ্ঞায়িত করার কোন উপায়ই থাকছে না আর। ‘রাজনৈতিক নেতৃত্ব’ এই শব্দটিও একই কারণে আজ বহু অর্থ বহন করে চলেছে। অভিধানে সেই চল্লিশ বছর আগের রাজনৈতিক নেতার যে চিত্র অংকিত হয়ে আছে তা ছাপিয়ে এই নেতৃত্ব ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে আজ। বুদ্ধিবৃত্তিকই বলুন আর ব্যবহারিক বা বাস্তবচিত্রই বলুন কোন ক্ষেত্রেই নেতৃত্বের কোন একটি বিশেষ স্কুল বলে কিছু নেই এখন। শিল্পকলা, শিক্ষা, বিজ্ঞান, রাজনীতি বা অন্য যে কোন পেশা যা—আমাদের জীবন পরিচালনার সহায়ক, সেসব ক্ষেত্রে মৌলিক জ্ঞান বা ধারণার অভাবজনিত কারণে নেতৃত্বকে দক্ষরূপে গড়ে তোলা বা প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে আমাদের আছে প্রচুর ঘাটতি। এর কারণ এই যে, একটি শক্তিশালী আধুনিক দার্শনিক ঐতিহ্য, ভাবনাগত চালিকাশক্তি আর সর্বোপরি বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকলেই এমনটা ঘটে। যখন এমন ঘাটতি থাকে তখন নেতৃত্বের ধরনের মধ্যে তফাত্ খুঁজে বের করাটা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। নেতা ও শাসকের মধ্যকার পার্থক্য বা ব্যবধান কিংবা ক্ষমতা দখলকারী ও স্বৈরাচারীর মধ্যকার ফারাক আমাদের চোখে আর ধরা দেয় না। হিটলারকে তাই নেতারূপে আমরা গ্রহণ করলেও পরিণামে তার মধ্য দিয়ে একজন অত্যাচারী শাসকই মূর্ত হয়ে ওঠে।
যাই হোক, এখন সময় এসেছে নেতা ও তার অনুসারী উভয়ের ধারণাকে একীভূত করার। এজন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাদি গ্রহণের প্রক্রিয়াগত কাঠামোকে এক সূত্রে গেঁথে দিতে হবে এই হচ্ছে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। নৈতিক নেতৃত্ব প্রথমত শাসক ও শাসিতদের মধ্যে শুধু ক্ষমতার ক্ষেত্রেই নয় বরং পারস্পরিক চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। বিকল্প নেতৃত্ব ও বিকল্প কর্মসূচির ব্যাপারে জনসাধারণের ধারণা ও জ্ঞান যতো পরিষ্কার হবে নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ভিত্ও ততো শক্তিশালী হবে। কেননা, তখন জনসাধারণ বিকল্প নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা অর্জন করবে বিধায় ক্ষমতাসীনরা তাদের উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করার দুর্মতি প্রদর্শন করবে না নিশ্চয়ই। অন্যদিকে নেতা বা শাসকরা দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক খাতে যেসব পরিবর্তন আনয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতা লাভ করেছেন তা বাস্তবায়নের ব্যাপারে দৃঢ়চেতা হবেন বৈকি! তাই নৈতিক নেতৃত্ব সর্বদাই জনগণের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদা এবং মূল্যবোধের মধ্য থেকে উত্সারিত হয় এবং বার বার সেখানেই ফিরে যায়।
কি উন্নয়নশীল দেশ, কি উন্নত দেশ উভয়ের ক্ষেত্রেই নানান কারণে নেতৃত্বের সংকট দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তবে যে বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার হওয়া উচিত তা এই যে, নেতৃত্বকে হতে হবে প্রজ্ঞাবান, দূরদর্শী, দেশের বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা ও সংকট সম্পর্কে প্রখর জ্ঞান ও তা নিরসনের উপায় জানা থাকতে হবে তার। আত্মশক্তি ও আত্মমর্যাদার উপর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত না হলে অন্যেরা সুযোগ গ্রহণ করবে এবং সে নেতৃত্বকে নতজানু করে তুলবে বৈ কি! সমস্যা মোকাবেলার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয়ী না হতে পারলে দেশে সংকট ঘনীভূত করে তোলাই হবে সার। সমস্যা সংকটতো থাকবেই, কিন্তু তা সমাধান করাইতো নেতৃত্বের সার্থকতা। যে কোন প্রতিষ্ঠানে বা যে কোন দেশে সমস্যা সমাধানকল্পে যখন নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা, কৌশল-পরিকল্পনা, সাহস-বিচক্ষণতা ইত্যাদির অভাব দেখা দেয় তখন বহি:শক্তি সেখানে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পায় এবং গোটা বিষয়টিকে আরও সংকটাপন্ন করে তোলে এমন নজির দূর ও নিকট অতীতে আছে বিস্তর।
মোদ্দাকথা, নেতাকে বিশ্লেষণী মনের অধিকারী হতে হবে, নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা প্রয়োগের সামর্থ্য থাকতে হবে, পরিস্থিতি সামলাবার মতো মনের জোর, সাহস ও প্রজ্ঞা এবং সর্বোপরি দৃঢ়চেতা হতে হবে। এই হচ্ছে একজন সার্থক বা সফল নেতা কিংবা নেতৃত্বের পরিচায়ক। গণতন্ত্র মানুষের এ যাবত্কালের সৃষ্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থাসমূহের মধ্যে উত্কৃষ্টতর বলে বিবেচিত। কিন্তু সেই গণতন্ত্রও আজ নানান রং ধারণ করেছে। লোভী-লালসাগ্রস্ত ও জনবিরোধী নেতৃত্বের হাতে পড়ে অনেক স্থানে উদারনৈতিক গণতন্ত্র আজ মুমূর্ষু রূপ লাভ করেছে। গণতন্ত্রের মোড়কে স্বৈরতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, গোষ্ঠীতন্ত্র ইত্যাদি নানান গণবিরোধী ব্যবস্থার গোড়াপত্তন ঘটতে দেখা যাচ্ছে। সাময়িক সুবিধা কিংবা ব্যক্তি, পরিবার ও গোষ্ঠীগত স্বার্থোদ্ধারের জন্য নীতি, আদর্শ, জনকল্যাণ ইত্যাদি মৌলিক বিষয়গুলিকে জলাঞ্জলি দিয়ে ও ভয় দেখিয়ে শাসন করার প্রবণতা উন্নয়নশীল দেশসমূহে ক্রমশই বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। মজার ব্যাপার এই যে, এইগুলি যারা করে তাদের সকলের গায়ে আবার থাকে গণতন্ত্রের নামাবলী। ভোট গণতন্ত্র নয়, গণতন্ত্র হচ্ছে শাসন ব্যবস্থাকে সুষ্ঠু ধারায় পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের শক্তি ও ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তা সুসংহতকরণ। কিন্তু এসব দেশে এর পরিবর্তে পরিস্থিতিকে বা সংকট সমস্যাকে অধিকতর জটিল করে তুলতে দেখা যায় নেতৃত্বকে। তারা সংকটকে এমন অবস্থায় পৌঁছে দেয় যার যেন আর কোন সমাধানই নেই। নেতৃত্বের যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষমতা না থাকে, প্রজ্ঞা ও সাহস না থাকে তাহলে সংকট ঐ পর্যায়ে যায় বৈ কি! নেতৃত্ব যদি অর্বাচীনের মতো কারও পাতা ফাঁদে পা দেয় তাহলে তো তার পরিণাম ভয়াবহ হতে বাধ্য। নেতা জনগণকে নেতৃত্ব দেবে নাকি জনগণের নির্দেশ মতো চলবে এ এক বিতর্কই বটে! তবে যা সত্য তা এই যে, নেতৃত্বকে জনকল্যাণমুখী, ত্যাগী, সাহসী, বিচক্ষণ এবং দূরদর্শী হতেই হবে। নচেত্ বিপদ পদে পদে ঘনীভূত হবে। এ সত্য ইতিহাসের পাতায় পাতায় বিধৃত আছে।
লেখক :সাংবাদিক