আলোকপাত

বাংলা একাডেমী ও বইমেলা-২০১৩

এবার ২০১৩-এর বাংলা একাডেমীর বইমেলায় যেতে পারিনি। গতকালই এই মেলা শেষ হয়েছে। স্বাস্থ্যগত কারণেই এবার যাওয়া সম্ভব হল না। গতবার বইমেলার অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলার চিত্র তুলে ধরে দু’কলম লিখেছিলাম। উপসংহারে বলেছিলাম, ন্যায়-নীতির উপর ভিত্তি করে প্রশাসন যদি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে তবে এসব উত্কট ঝামেলা থেকে অবমুক্ত হতে পারে। প্রয়োজন শুধু দৃঢ় সংকল্প ও অনমনীয় মনোভাব। প্রশাসনের উপর সর্বদাই এক অসহনীয় চাপ থাকে। একে উপেক্ষা করা কঠিন, কোন কোন সময় অবস্থান এমনকি, জীবনও হুমকির সম্মুখীন হয়। এমন পরিস্থিতিতে নিয়ম-নীতি প্রণয়নে এবং তা পালনে অঙ্গীকারসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা একান্ত দরকার হয়। এবারের বইমেলা পরিচ্ছন্ন করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। বেশ পূর্ব থেকেই এ প্রস্তুতি গ্রহণ করায় এবার তেমন উটকো ঝামেলা হয়নি। পেশাদার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বাইরে কেউ স্টল বরাদ্দ পাননি। নীতিতে অটল এবং তা বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপের ফলে এবার এক পরিচ্ছন্ন ও সফল বইমেলা উপহার দেয়া সম্ভব হয়েছে। পত্রিকা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত বইমেলার দৃশ্য দেখে আমি সত্যি আনন্দিত ও পুলকিত হয়েছি। এ ব্যাপারে প্রশাসন, প্রকাশক এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়। এতে প্রমাণিত হয়েছে যে, সদিচ্ছা, দৃঢ় সংকল্প এবং আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলে সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে স্থির লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়। মেধা ও মননের প্রতীক বাংলা একাডেমীর গ্রন্থমেলা। এ হল সুধী, সজ্জন, জ্ঞানী-গুণী ও গবেষকদের স্বচ্ছন্দ বিচরণ ভূমি। এখানে ভাব ও চিন্তা বিকাশের এক অনুকূল পরিবেশই জাতি প্রত্যাশা করে। বর্তমানে নিয়ম-শৃঙ্খলা বোধের যে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে, তা অদূর ভবিষ্যতে আরো উত্কৃষ্ট মানে এগিয়ে নিয়ে যাবে এই প্রত্যাশা রইলো। মনে পড়ে স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭১-’৭২-এর কথা যে দিন ‘গ্রিকদর্শন: প্রজ্ঞা ও প্রসার’ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি নিয়ে সেদিনের কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক ড. মীর আবু সালেহের সাথে সাক্ষাত্ করি। তিনি পাণ্ডুলিপি একটু নেড়ে-চেড়ে দেখে আমায় অবহিত করেন যে, এটি বিশেষজ্ঞের নিকট যাবে-অনুকূল সাড়া পাওয়া গেলে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে। পরবর্তীতে বাংলা একাডেমীর তত্কালীন পরিচালক আব্দুল হক-এর সাথে সাক্ষাত্ করি। হক অত্যন্ত রাশভারী একজন ভদ্রলোক তার নিশ্চুপ অভিব্যক্তিতে প্রকাশ পেল যে, এতদিন পর পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করা সম্ভব হবে কিনা এ ব্যাপারে তিনি নিজেও সন্দিহান। শুধু বললেন, কোন কাগজপত্র আছে কি? বোর্ডের পত্রটি প্রদর্শন করলে তিনি মহাপরিচালকের সাথে আলাপ করতে হবে বলে সেথায় চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর মহা-পরিচালক ড. মাযহারুল ইসলামের কক্ষ থেকে বের হয়ে দু’খণ্ড চুক্তিনামা নিয়ে এসে বললেন, আপনি তো চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেননি-এই নিন স্বাক্ষর করেন। আমি আশ্বস্ত হই। ১৯৭৫ সনে আমার প্রথম পুস্তক ‘গ্রিকদর্শন প্রজ্ঞা ও প্রসার’ বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত হয়। সেই থেকে বাংলা একাডেমীর সাথে আমার গভীর সম্পৃক্ততা। একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে বইমেলা শুরু হয়েছিল হাতে গোণা কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা নিয়ে। ফলে পরিবেশ ছিল সুন্দর ছিমছাম। পরে এর বিস্তৃতি ও সম্প্রসারণ ঘটে। তবে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকে। কিন্তু এক পর্যায়ে এর ব্যাপকতা এত বৃদ্ধি পায় যে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সৃষ্টি হয় ঝুট-ঝামেলা। শেষ পর্যায়ে দলীয়করণ ও রাজনৈতিক প্রভাবে এ শুধু নিয়ন্ত্রণের বাইরেই চলে যায়নি- সে এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খলরূপ লাভ করে। সেদিক থেকে এবারের বইমেলা অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে এবং সবাইকে এক নিয়ম-নীতির আওতায় আনয়ন করা হয়েছে। এবার কয়েকটি স্টলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তবে একাডেমী কর্তৃপক্ষ ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়েছেন। যাহোক, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলা একাডেমীর সীমিত চত্বরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় তা সম্প্রসারণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল মাঠ বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থানান্তরের কথা অনেকেই বলছেন। এ ব্যাপারে ভেবে দেখা যেতে পারে। লেখক :সাবেক অধ্যক্ষ, এমসি কলেজ, সিলেট